বিসমিল্লায় গলদ: নতুন নিয়োগ কি পুরনো পথেই হাঁটছে?
যার যা কাজ সেটা তিনি করবেন, নিয়ম তো এমনটাই। ঘরে-বাইরে, সরকারি কাজকর্মে সর্বত্রই এই নিয়ম চলে আসছে। বিএনপি সরকারে এসেই এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করেছে। পরীক্ষার একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে একজন ব্যবসায়ীকে বসানো হলো। এর আগে যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন, তারা সবাই ছিলেন ভালো ব্যাংকার বা পেশাগত আমলা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজে কেউ ভালো করেছেন, কেউ তেমন ভালো করতে পারেননি। তবে তাদের কারো নিয়োগ নিয়ে এতটা বিস্ময় জাগেনি।
সদ্য নিয়োগ পাওয়া নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ছিলেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২৩তম সদস্য। ১ থেকে ২২তম সদস্যরা নিশ্চয় সবাই এখন উজ্জীবিত; কখন ডাক আসবে এর চেয়েও বড় পদের জন্য!
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫-এর জন্য মনোনীত হয়েও পুরস্কার পাননি কবি মোহন রায়হান। খবরে প্রকাশ, ৪১ বছর আগের লেখা এক কবিতার জন্য তাকে ‘অভিযুক্ত’ করে পুরস্কার দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। অথচ মাত্র এক বছর আগেও নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ঋণখেলাপি ছিলেন। সেটা তার গভর্নর পদে যেতে কোনো বাধা হয়নি। মোস্তাকুর রহমানের তৈরি পোশাক শিল্পটি এখন অন্যরা চালাবে। তিনি নিজে প্রধান থাকতে একটা কোম্পানি ভালো চালাতে পারেননি—সেটি ঋণখেলাপি হয়েছিল। ঋণ পুনঃতফসিল করতে হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, আইন মেনে এমন সুযোগ নেওয়া ব্যবসার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ। তবে এই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি: আইনি স্বচ্ছতা এবং খেলাপি সংস্কৃতির অবসান। পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কি নিশ্চিত করা হয়েছে? আমাদের তা জানা নেই। এখন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছেন, বলা চলে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান হয়েছেন। তার কোম্পানি অন্যরা চালাতে গিয়ে ঋণখেলাপি হলে তখন কী হবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পদ এখন খালি। বিএনপি সরকার হন্যে হয়ে লোক খুঁজছে। তারা যদি চাঁদপুর পাইলট কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক খয়রাত আলীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দেয়, তাতে কেউ কি আশ্চর্য হবেন? জনাব খয়রাত আলীরও অনেক বছর ধরে শিক্ষক, ছাত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সব সময় যে এমন নিরীক্ষা ভুল হয়, তা-ও নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ ভিসি করা হয়েছিল আবুল ফজলকে। ১৯৭৩ সালে তাকে যখন ভিসি করা হয়, তার বেশ কয়েক বছর আগে ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অবসর নিয়েছিলেন। কথা হলো সব অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক তো আবুল ফজল নন।
গণতান্ত্রিক পথে উত্তরণের জন্য আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রত্যয় দেখে আমরা সবাই আশান্বিত হয়েছিলাম। গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র শুধু মন্ত্রী-মিনিস্টার বানানো নয়। গণতন্ত্র হলো দেশের প্রতিটা প্রতিষ্ঠানকে সম্মানিত করে জনগণের সেবায় প্রতিষ্ঠিত করা। শেখ হাসিনা সরকারের সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছিল এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিএনপি সরকার কি সেই পথেই হাঁটবে?
যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্মান ও ধারাবাহিকতা নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক রদবদল কত সহজ ও সুস্থভাবে হচ্ছে তার ওপর। এখন দেখা যাচ্ছে, প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে পুরাতনেরা পেছনের দরজা দিয়ে লুকিয়ে যাচ্ছেন, নতুনেরা দম্ভভরে সদর দরজা দিয়ে ঢুকছেন। পুরাতনদের থেকে নতুনদের কাজ বুঝে নেওয়ার স্বাভাবিক সৌজন্য এখন আর নেই। সৌজন্য ছাড়াও কাজ বুঝে নেওয়া নতুনদের জন্য এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য যে একান্ত প্রয়োজন, সেইসব উপলব্ধিও এখন আর নেই।
যে কোনো সংস্থায় এই সৌজন্য ও রীতি-নীতি অক্ষুণ্ণ রাখা একান্তই প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকে তা কেন হলো না, কোথায় ছিল বাধা—তা আমরা বুঝতে পারলাম না। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে কেন এভাবে বিদায় দিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো? জবাবে অর্থমন্ত্রী তিনবার বলেন, ‘কিছুই বলার নেই।’ সেইদিনের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ‘মব’ করে প্রাক্তন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের একজন উপদেষ্টাকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। অথচ মন্ত্রী হয়েই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ’। সত্যি কি অর্থমন্ত্রীর কিছু বলার নেই?
ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণসহ দেশের মোট ছয়টি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ করেছে সরকার। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এমনটা জানানো হয়েছে। যাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, তাদের সবাই বিএনপির নেতা।
যে সরকার ক্ষমতায়, তারা যে কাউকে নিয়োগ দিতে পারেন; তাতে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে একই প্রশ্ন থেকে যাবে—সব জায়গায় সবকিছু কি দলীয়করণ করা হবে? এখন যে আইন আছে, তাতে সরকার চাইলে নির্দলীয় ভিত্তিতে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করতে পারত। এতে পরবর্তী সিটি করপোরেশনের ভোটও নিরপেক্ষভাবে হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।