প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দোলাচলে সংসদ নির্বাচন
২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে গঠিত হয় ‘আপৎকালীন’ ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। ফলে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল এই সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। কিন্তু বহুল আলোচিত ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনে সরকার প্রথমে ব্যর্থ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অন্ততপক্ষে ন্যায়সংগত সময়ের ব্যবধানে নির্বাচনের তারিখ ও রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। তাতেও সরকারের গড়িমসি ছিল লক্ষণীয়, যা একধরনের অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশা তৈরি করে। অবশেষে অল্প সময়ের ব্যবধানে নির্বাচনের তারিখ ও তফসিল ঘোষণা করলেও নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত ‘নির্বাচন হবে কি হবে না’—এই রকম শত অনিশ্চয়তার মধ্যেও গতকাল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
বিএনপি ও জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে না গিয়ে দুই দলই আলাদাভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে। বিএনপি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একত্রে পুঁজি করে মূলত নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। বিপরীতে জামায়াত ধর্মীয় ইস্যুর সঙ্গে জুলাইকেই প্রাধান্য দিয়েছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল একচেটিয়া ও নিরুত্তাপ একটি নির্বাচন হবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণ হয়তো সফল হবে না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি ও এলডিপির যোগদান এই নির্বাচনের হিসাব ও সমীকরণকে বেশ জটিল করে তুলেছে। এই নতুন মেরুকরণের ফলে নির্বাচনী মাঠে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পরিলক্ষিত হতে দেখা গেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিএনপির একচেটিয়া আধিপত্য তথা দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ের যে ধারণা ছিল, তা অনেকটা পাল্টে গিয়ে এখন অন্তত মাঠের দৃশ্য অনুযায়ী উভয় জোটের মধ্যে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচন ক্ষণ এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে, বিএনপি এবং জামায়াত জোটের মধ্যে প্রতিহিংসার একটি নতুন মাত্রা তৈরি হয়, যা দুটি ভাইরাল স্মিয়ার দ্বারা সহজেই অনুমান করা গেছে। যেভাবে জামায়াত এবং বিএনপি একে অপরকে ‘মুনাফেকের দল’ কিংবা ‘চাঁদাবাজের দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে, এ কারণে একধরনের সামাজিক অস্থিরতা দেখা গেছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় একটি বিশেষত্ব হলো, গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দ্বিদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের একটা প্রচলন দেখি। সে বিবেচনায়, এত দিন পর্যন্ত বিএনপি-আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক এই দ্বিদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের একটা ধারা ও উত্তাপ নির্বাচনকালে অনুভূত হতো। সেই জায়গায় এ বছর ভোটের এযাবৎকালের যে হিসাব, সেই গড় ভোটের বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে যে এই সমীকরণ ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটের অধিকারী দুটি দল হিসেবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অনুপস্থিত আছে, যার ঐতিহাসিক, যৌক্তিক ও আইনি ভিত্তি আছে বলেই বেশির ভাগ বিশ্লেষকের মত। এই জন্যই ভাবা হয়েছিল, হয়তো দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন জমে উঠবে না। কেননা ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে জামায়াতের প্রাপ্ত গড় ভোট বিবেচনায় ছিল চতুর্থ অবস্থান। তৃতীয় অবস্থান ছিল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি।
কিন্তু জামায়াতের এই নির্বাচনী জোট, অন্ততপক্ষে নির্বাচনী প্রচারকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, যা বিএনপি-জামায়াতকেন্দ্রিক দ্বিদলীয় উত্তেজনা তৈরি করেছে বলেই সবার অনুমান। ভোটের সমীকরণেও একটা ধাক্কা খাবে এমন অনুমানও অনেকে করছেন, যা পুরো নির্বাচনী লড়াইকে খানিকটা হলেও অনিশ্চিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের ‘বিজয়’ এবং পরবর্তী সময়ে জামায়াতের পক্ষে তাদের প্রকাশ্য অবস্থান নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তথাকথিত ‘লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি’র বিরোধিতা করলেও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের সেই নির্বাচিত নেতৃস্থানীয়রা সরাসরি জামায়াতের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন, যা রাজনৈতিক মহলে তাদের কূটকৌশল বা ‘ডেলিভারেট প্ল্যান’ হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, জামায়াতের ‘লিবারেল ভ্যালু’ বা উদারনৈতিক মূল্যবোধের দিকে ঝোঁকার কৌশলটি সাময়িক সুবিধা দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ‘রাজনৈতিক দ্বিচারিতা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা তাদের জনআস্থা সংকটে ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে মিথ্যাচার, বিষোদ্গার এবং প্রাণঘাতী সংঘর্ষের মতো চিরচেনা নেতিবাচক রূপগুলো আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘বেহেশত লাভ’ বা ‘ইমানি পরীক্ষা’র মতো ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার এবং ভোট কেনা বা ব্যালট বাক্স ছাপানোর অভিযোগ, অন্যদিকে বিএনপির বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য ও সহিংসতার অভিযোগ ছিল চোখে পড়ার মতো। সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও গ্রাম ও শহরে এক দলের প্রতি অন্য দলের চরিত্রহনন এবং সংঘাতের যে চিত্র তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এক গভীর ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে—যা মূলত দেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাসকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আদর্শিক সৌন্দর্য বজায় রাখার চেয়ে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে প্রচারণার ক্ষেত্রে ধর্মীয় অবমাননার মতো গুরুতর বিষয়গুলোর সংশ্লিষ্টতা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেই অনুমান। দলটির বাস্তবতাবিবর্জিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক বেপরোয়াপনা এই নির্বাচনকে বিতর্কিত করে তুলতে পারে।
সার্বিক দিক বিবেচনায়, অন্যান্য নির্বাচনের মতোই এই নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনের পরেও সহিংসতা, ভোট ক্রয়, আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবরসহ নানা রকম অনিয়মের খবর চারদিক থেকে আমরা পাচ্ছিলাম। এই সবকিছু মিলিয়ে এই নির্বাচনটা আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এ রকম সাংঘর্ষিক কিংবা এ রকম উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ভয়ের মিশ্রণে হবে, এটা প্রথম দিকে কারোরই অনুমান ছিল না।