সংস্কার বিরোধী অপশক্তি ও আলো-আঁধারি খেলা

জাগো নিউজ ২৪ ড. মো. ফখরুল ইসলাম প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৯

সম্প্রতি দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, ইতোমধ্যে শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হলেও এর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদের মূল চেতনা উপেক্ষিত রয়েছে … ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মৌলিক দিকগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে … সংস্কারের নামে তৈরি এই আইনি কাঠামো কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।’


এই মতামতগুলোকে আরো গভীরে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারকে কেন্দ্র করে নতুন যে আইনি ও নীতিগত প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও ভেতরে ভেতরে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা মার্জনার সুযোগ রাখার প্রস্তাবকে টিআইবি ‘দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়ার ফাঁদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এই বক্তব্য একটি নাগরিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া এবং এটি রাষ্ট্রীয় সংস্কারের নামে সম্ভাব্য আত্মসমর্পণের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।


দুদক প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও আইনি দুর্বলতার কারণে দুদক তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এমন বাস্তবতায় ‘সংস্কার’ শব্দটি জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি দুর্নীতিকে বৈধতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তা হবে সংস্কার বিরোধী অপশক্তির কাছে নীতিগত আত্মসমর্পণ।


টিআইবি যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছে, তা হলো, দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সাজা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ। এই ধারণাটি শুনতে অনেকটা ‘প্লি বার্গেইনিং’-এর মতো মনে হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি দেশে যেখানে দুর্নীতির বড় অংশ সংঘটিত হয় ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী ও বিত্তশালীদের মাধ্যমে, সেখানে অর্থের বিনিময়ে সাজা মওকুফের সুযোগ মানে কার্যত: ধনীদের জন্য আলাদা নিয়ম ও আইন চালু করার শামিল।


টিআইবি যথার্থভাবেই প্রশ্ন তুলেছে যে, যদি কেউ কোটি কোটি টাকা লুট করে, আর পরে তার একটি অংশ ফেরত দিয়ে বা জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যায়, তবে দুর্নীতির প্রকৃত শাস্তি কোথায়? এটি তো অপরাধের নিরুৎসাহন নয়, বরং উৎসাহ দেওয়ার নামান্তর। বার্তা স্পষ্ট: চুরি করো, ধরা পড়লে টাকা দিয়ে মিটিয়ে নাও। এই দর্শন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।


সংস্কারের ইতিবাচক দিকও অবশ্য পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। মামলার জট কমানো, তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত করা, কিছু প্রশাসনিক স্বাধীনতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এত করে এই ইতিবাচক দিকগুলো কি নেতিবাচক দিকের ভারে চাপা পড়ে যাচ্ছে না? টিআইবি মনে করে, দুর্নীতির শাস্তি লঘু করার সুযোগ রাখলে দুদকের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান কার্যকর হতে পারে না।


আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ধরনের প্রস্তাব সংস্কার বিরোধী অপশক্তিকে আরও সাহসী করে তুলবে। যারা বরাবরই চায় দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাকে দুর্বল রাখতে, তারা এখন আইনের ছাতার নিচে নিরাপদ বোধ করবে। টিআইবি একে স্রেফ নীতিগত ত্রুটি না ভেবে বরং একটি কাঠামোগত ফাঁদ হিসেবে দেখছে। যেখানে আইন নিজেই দুর্নীতিবাজদের ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।


বাংলাদেশের মতো দেশে দুর্নীতি একটি আর্থিক অপরাধ। পাশাপাশি এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। দুর্নীতির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, সবখানেই সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়। সেখানে দুর্নীতির শাস্তি লঘু করার অর্থ হচ্ছে সেই বঞ্চনাকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। টিআইবি তাই জোর দিয়ে বলছে, দুদক সংস্কার হতে হবে কঠোরতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে, আপসের ভিত্তিতে নয়।


কারণ, সত্যিকারের সংস্কার মানে হলো, দুদকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের সুযোগ দেওয়া, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা। অর্থের বিনিময়ে শাস্তি মওকুফ না করে দৃষ্টান্তমূলক সাজাই হওয়া উচিত দুর্নীতি দমনের মূল হাতিয়ার। তা না হলে সংস্কার শব্দটি কেবল একটি মোড়ক হয়ে থাকবে, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকবে পুরোনো সুবিধাভোগী ব্যবস্থারই পুনরুৎপাদন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও