সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে

যুগান্তর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৮

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা জনসমর্থিত একটি রাজনৈতিক সরকার পেতে যাচ্ছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আসন্ন নির্বাচন অতীতের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক। এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আমরা কি বাংলাদেশকে একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার দিকে অগ্রসর হব, নাকি আবারও স্বৈরশাসনের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে দেশ। আমরা কি চব্বিশের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারব, নাকি আবারও বৈষম্য আর শোষণের কবলে পড়ে বাংলাদেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হবে। জনগণকে এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


নির্বাচনকে বানচাল করা সম্ভব না হলেও বিতর্কিত করার সব ধরনের চেষ্টা চলছে। তারপরও আমরা প্রত্যাশা করছি, সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে চলতি মাসে আমরা জনসমর্থিত রাজনৈতিক সরকার পেতে যাচ্ছি। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকবে অনেক বেশি। ২০০৮ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে এ দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। কাজেই তারা এবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাদের পছন্দনীয় প্রার্থীকে ভোট দেবেন। দেশের বিপুলসংখ্যক যুবশক্তি গত ১৯ বছরে অনুষ্ঠিত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। তারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এ নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাসীন হবে, তাদের নানা জটিল সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। যদিও এসব সমস্যার বেশির ভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। এসব সমস্যার কিছু আছে, যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আর কিছু সমস্যা আছে, যা সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।


নবনির্বাচিত সরকারকে প্রথমেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃষ্টি দিতে হবে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। সাধারণত কোনো গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সহসাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তা উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিগত সরকার আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যাপক দলীয়করণের মাধ্যমে আজ্ঞাবাহী দলীয় ক্যাডারে পরিণত করা হয়েছিল। অধিকাংশ থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা জনতার ভয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তারা ভয়ে দূরবর্তী এলাকায় দায়িত্ব পালনে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম-খুনের অভিযোগ থাকায় তারা পালিয়ে গেছেন। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যারা বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অনেকেই বিগত সরকারের প্রতি দলীয় আনুগত্যের কারণে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। এমনকি কারও কারও বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিব্রত করার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত পুরো পুলিশ বাহিনী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে না বলেই মনে হচ্ছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশ বাহিনীর ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি না হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।


আগামী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অর্র্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে, বিগত প্রায় ৪ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে এনে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা শুরু হয়। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) অন্যান্য কৌশলের পাশাপাশি একাধিকবার পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, যদিও এতে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা নেমে আসার শঙ্কা ছিল। ফেডের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাংলাদেশসহ অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক না করায় এ পদক্ষেপ উলটো ফল দেয়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত ব্যাংকঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৯ শতাংশে ফিক্সড করে রাখা হয়েছিল।


বিগত সরকার আমলে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সরকারসমর্থক উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকে তুলনামূলক কম সুদের ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির সুযোগ করে দেওয়ার কারণেই মূলত এ কাজটি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারসমর্থক উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। এমনকি বিদেশে পাচার করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আগের মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। নির্বাচনের আগে বাজারে অর্থ প্রবাহ বেড়ে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ বড়ই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি বাড়ছে না। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাজারে তৎপর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং পরিবহণ সেক্টরে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে বন্ধ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কমবে না।


উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে পলিসি রেট বাড়ানো হয়েছে অনেকদিন হলো। এভাবে পলিসি রেট দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রায় থাকলে তা ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিখাতে নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। এ খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমে গেছে। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা বিরাজ করছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন, তারা জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ক্ষমতা পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে পারছেন না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আগের মতো বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আসছেন না। তারা নতুন সরকারের জন্য অপেক্ষা করছেন। অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। নতুন সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়লে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গতিশীল হবে না। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করছে দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা।


নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তার প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। অর্থের জোগান নিশ্চিত করার জন্য রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এজন্য রাজস্ব আহরণের বর্তমান ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নতুন সরকারকে কঠোর হতে হবে। রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর সরকারকে নির্ভর করতে হবে। কিন্তু এখন চাইলেই আগের মতো সহজে বিদেশি ঋণ পাওয়া যাবে না। এ বছর বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হলে স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে যেসব সুবিধা ভোগ করছিল, তা প্রত্যাহৃত হবে। সেই সময় বিদেশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক হারে সুদ প্রদান করতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও