মাধ্যমিক শিক্ষা যেভাবে সংস্কার করা দরকার

প্রথম আলো জিয়া হায়দার রহমান প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৬

বছর কয়েক আগের কথা। আমস্টারডামে গিয়েছি। শহরের বিমানবন্দরে নেমে ট্যাক্সিতে উঠলাম। চালককে বললাম, ‘দুঃখিত, আমি ডাচ্‌ ভাষা জানি না। আপনি কি ইংরেজি বলতে পারেন?’ চালক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমার দিকে যেভাবে তাকালেন তাতে বুঝলাম, তিনি আমার ওপর খুবই বিরক্ত হয়েছেন। সেদিন পরে বন্ধুদের কাছে ঘটনাটা বললে তারা চালকের ওই দৃষ্টির একটি মজার ব্যাখ্যা দিল। সেই ব্যাখ্যায় পরে আসছি।


শিক্ষা উপদেষ্টার গঠিত কমিশন যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেটি দেখে আমার আমস্টারডামের ঘটনাটির কথা মনে পড়ে গেল। এই ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি কাঠামো দিয়েছে। কাঠামোটির নাম ন্যাশনাল লার্নিং ইমপ্লিমেন্টেশন ফ্রেমওয়ার্ক (এনএলআইএফ)। একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি মাধ্যমিক শিক্ষা কেমন হতে পারে, তার একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছে।


এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এর মূল দর্শন। এখানে আলাদা আলাদা নীতির তালিকা দেওয়া হয়নি; বরং শিক্ষা পরিচালনার পুরো ব্যবস্থায় কোথায় ও কেন সমস্যা হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নতুন পাঠ্যক্রমের খুঁটিনাটি তালিকা না করে কমিটি দেখিয়েছে, কীভাবে ভুল প্রণোদনা ও ভুল সংকেতের কারণে শিক্ষাসংস্কার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কীভাবে ভালো সংস্কার করা যায় এবং কীভাবে সেই সংস্কার দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখা যায়—এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনাই মূলত প্রতিবেদনটির আসল শক্তি। তারা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সংকেত ও প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এ কথা বলেছেন।


কমিটির চিহ্নিত করা একটি বড় সমস্যা হলো, প্রকৃত দক্ষতা বা পারদর্শিতাকে (মাস্টারি) মূল লক্ষ্য না বানিয়ে কেবল পরীক্ষার ফলকে গুরুত্ব দেওয়া। স্বাধীনভাবে করা শিক্ষাগত মূল্যায়ন দেখিয়েছে, পরীক্ষার নম্বর আর শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতার মধ্যে ফারাক ক্রমেই বাড়ছে। ফলে নম্বর বা গ্রেড শিক্ষাব্যবস্থাকে ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং প্রকৃত অবস্থাটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে।


বাস্তবে দেখা গেছে, শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বশীলেরা প্রায়ই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, এই ভ্রান্ত ধারণা ধরে রাখতে মানদণ্ড নিচে নামিয়ে দেন। এতে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং সমস্যা আরও চাপা পড়ে। কিন্তু ভুল সংকেতের (সিগন্যালিং ডিস্টরশন) প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আদর্শভাবে পরীক্ষার ফল দেখে বোঝা যাওয়ার কথা—কোন শিক্ষক ভালো পড়াচ্ছেন আর কোথায় সমস্যা আছে। সেই তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষার মান উন্নত করা এবং শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়ার কথা।


কিন্তু বাস্তবে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে উল্টোটা হচ্ছে। পরীক্ষার ফল ঠিকভাবে শিক্ষকের আসল দক্ষতা দেখাচ্ছে না। তবু এই ভুল ফলাফলকেই ভিত্তি করে পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে যাঁরা ভালো পড়ান, তাঁরা আলাদা করে চিহ্নিত হচ্ছেন না, আর যাঁদের পড়ানোর পদ্ধতিতে সমস্যা আছে, সেটিও ধরা পড়ছে না। এতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটাই ভুল পথে চলতে থাকে। ভাষা ও গণিতের মতো মূল দক্ষতা আয়ত্ত করার বদলে, বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা এমন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা আসলে দক্ষতা আয়ত্তের জন্য ক্ষতিকর—যেমন রট–নির্ভর (না বুঝে) মুখস্থ করা। মানুষের ইতিহাসে কোনো সময়েই মুখস্থ করা কোনো দক্ষতা শেখার মাধ্যম ছিল না।


আসলে শিক্ষাসংস্কার সহজ হবে না। এটি কষ্টসাপেক্ষ হবে। কমিটি বলছে, কিছু সংস্কার ধাপে ধাপে করা যেতে পারে, কিন্তু কিছু সংস্কারের বিষয়ে আর দেরি করা চলবে না। পরীক্ষার মান বাড়াতেই হবে; এমনকি যদি রাতারাতি ফলাফল ভয়াবহভাবে খারাপ হয়ে যায়, তাহলেও। কারণ, পরীক্ষা যদি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই করে, তাহলে গ্রেড পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে কাজ করে। খারাপ ফলাফল মানে হলো পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি ও পাঠ্যবইয়ের জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।


এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার, পরীক্ষার মান বাড়ানো মানে শুধু ‘পরীক্ষা কঠিন করা’ নয়। পরীক্ষাকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, পাঠ্যক্রমকে পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মিলতে হবে আর সবকিছুকেই এমন একটি শিক্ষাগত লক্ষ্য ও দক্ষতার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত হতে হবে, যা অর্জন করাই শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য। শুরুতে স্বাভাবিকভাবেই ফলাফল মারাত্মকভাবে নেমে যাবে। এটা এমন নয় যে সমস্যার মূল কারণ শুধু শিক্ষকদের অসততা বা অদক্ষতা। অনেক সময় শিক্ষকেরা ইচ্ছা করে ভুল কিছু করছেন না। তাঁরা যেভাবে পড়াচ্ছেন, সেটা আসলে পুরো ব্যবস্থা তাঁদের যেভাবে চালনা করছে, তারই ফল। ব্যবস্থা শিক্ষককে যে বার্তা দেয়, শিক্ষক সেটারই জবাব দেন। এখানে পরীক্ষার ফলই হলো সেই বার্তা। পরীক্ষা যেভাবে নেওয়া হয়, শিক্ষকও সেভাবেই পড়ান। পরীক্ষা যদি মুখস্থ চায়, শিক্ষক মুখস্থ করান। কারণ, ব্যবস্থা তাঁকে সেটাই করতে বলে।


বহু মানুষের সমন্বয় ছাড়াই একের পর এক বিষয় যোগ করতে গিয়ে পাঠ্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে দক্ষতা অর্জনের মূল লক্ষ্যটাই হারিয়ে গেছে। তবে সমস্যাটা শুধু পাঠ্যক্রম বেশি বিস্তৃত হওয়া নয়। আসল সমস্যা হলো, প্রত্যাশিত শেখার ফলাফল, ক্লাসে পড়ানোর জন্য সময়, পাঠ্যক্রম ও বইয়ে ধরে নেওয়া শেখার গতি আর এমন মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে অমিল, যেখানে দক্ষতার চেয়ে বিষয় ‘শেষ করা’কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কমিটি যে ‘দক্ষতা আয়ত্তের’ ওপর এত জোর দিচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে শক্ত গবেষণালব্ধ প্রমাণ। মাধ্যমিক স্তরে বেশি বিষয় ছুঁয়ে যাওয়ার চেয়ে অল্প বিষয়ের গভীরে যাওয়া ও ভালোভাবে আয়ত্ত করাই যে কার্যকর, আধুনিক গবেষণা সেটাই বলছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিফলিত হতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও