আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী অধ্যায় যুক্ত করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি একটি আলাদা ব্যালটে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট-জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি জনগণের সম্মতি নেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা মূলত দলীয় টেবিল বা সংলাপের ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল। সে বাস্তবতায় গণভোটের মাধ্যমে জনগণকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক গণতান্ত্রিক অগ্রগতি।
জুলাই জাতীয় সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। শুরু থেকেই এগুলোকে দুটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। ৪৭টি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হিসাবে চিহ্নিত হয় এবং বাকি ৩৭টি প্রস্তাব আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করার কথা বলা হয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের আওতায় সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিষয় একটিতে বাড়িয়ে মোট ৪৮টি করা হয়। গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই ৪৮টি বিষয় নিয়েই।
এ কাঠামোর মধ্যে কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে আলাদা বিভাগ করা নিয়ে যে আলোচনা শোনা যাচ্ছে, তা জুলাই সনদের ৬৮ নম্বর দফায় থাকলেও সেটি সংবিধান সংশোধনের তালিকাভুক্ত নয়। এটি আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব হিসাবে চিহ্নিত। ফলে গণভোটের ব্যালটে যে চারটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, তার কোনোটিতেই কুমিল্লা বা ফরিদপুরকে বিভাগ করার প্রসঙ্গ নেই। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা একাধিকবার এ অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তাদের ভাষায়, গণভোট হচ্ছে শুধু সেই সংস্কারগুলোর বিষয়ে, যেগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য।
তবু যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এর একটি কারণ হলো প্রশ্নের কাঠামো। পৃথক পৃথকভাবে প্রশ্ন না করে একটি সমন্বিত কাঠামোর ভেতরে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যালটে ভোটারকে শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বেছে নিতে হবে। এতে সেই ভোটারের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে, যিনি চারটি প্রস্তাবের মধ্যে এক বা দুটিতে একমত, কিন্তু অন্যগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। এ সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা বলেছেন, বাস্তব ও রাজনৈতিক কারণে প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা গণভোট আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
এ বাস্তবতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক দরকষাকষি ও সমঝোতার ইতিহাস। জুলাই জাতীয় সনদে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও বাস্তবে সব বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্য ছিল না। সনদে সই করার সময়ই বিভিন্ন দল নোট অব ডিসেন্ট রেখেছে। কেউ কেউ বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, কেউ আবার নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে এগোনোর সুপারিশ দেয়, তখনো রাজনৈতিক বিতর্ক থামেনি। বিএনপি শুরুতে নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষার অভিযোগ তুললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলটির অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
এ পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অবস্থান। তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হ্যাঁ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার প্রশ্নে যে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ ছিল, সেখানে একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এ অবস্থান গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে গণভোটকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসাবে না দেখে একটি রাজনৈতিক সুযোগ হিসাবে দেখার অবকাশ রয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোনোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর ওপর একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে। জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা যে কোনো সরকারের জন্য সহজ হবে না। এই দিক থেকে গণভোট জুলাই জাতীয় সনদের সব প্রস্তাব একদিনে বাস্তবায়নের গ্যারান্টি না দিলেও সংস্কার প্রক্রিয়াকে একটি দৃঢ় ভিত্তি দিতে পারে।