ইরানি বিপ্লবের শিক্ষা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুলহাসান বনি-সদর তার মৃত্যুর আড়াই বছর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ২০২১ সালের শুরুর দিকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠ ভার্সাইতে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদরকে খুব বিষণ্ণ দেখায়। ওই বছরই তিনি মারা যান। ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদরের বর্ণনায় উঠে আসে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতা দখলের পর কীভাবে বিপ্লবের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। বনি-সদর মনে করেন, নির্বাসিত জীবন শেষে বিদেশ থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে তেহরানে ফিরে আনা হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে তিনি যে ধোঁকা দিয়েছেন, তা বিপ্লবীদের মাঝে ‘খুব কটু’ স্বাদ রেখে গেছে।
বিপ্লবের আগে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ও বনি-সদর দুজনই প্যারিসে নির্বাসনে ছিলেন। শাহ রাজবংশের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি খোমেনি ইরান ত্যাগ করেন। প্রথমে তুরস্কে যান; সেখান থেকে ইরাক। শেষ পর্যন্ত তিনি প্যারিসের বাইরের একটি গ্রামের সাধারণ বাড়িতে স্থায়ী হন। সেখান থেকেই তিনি ইরানের ইসলামপন্থী বিপ্লবের ভিত্তি গড়েন। ইরানের তৎকালীন একজন শিয়া ধর্মগুরুর ছেলে বনি-সদর তখন প্যারিসে অর্থনীতির ছাত্র। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের কারণে বনি-সদর খোমেনিকে কেবল ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে সহযোগিতাই করেননি, পরবর্তীকালে তিনি খোমেনির একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ও সহকর্মী হয়ে ওঠেন।
প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপমন্ত্রী, পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বনি-সদর। এরপর ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে খোমেনির আশীর্বাদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় খোমেনিই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। রয়টার্সের সঙ্গে ওই সাক্ষাৎকারে বনি-সদর বলেন, “ফ্রান্সে অবস্থানকালে খোমেনি সবসময় মুক্ত গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের কাছে খোমেনি এমন একটি আধুনিক ইসলামের ব্যাখ্যা সমর্থন করছেন বলে মনে হচ্ছিল, যেখানে ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা রাখা হয়।” কিন্তু বিমান থেকে ইরানে নামার পরপরই খোমেনি বদলে যান। হাজার বছরের ঐতিহ্যে গড়া সেক্যুলার ইরানে জেঁকে বসে মোল্লাতন্ত্র।
বাংলাদেশ কি একই ধরনের ঐতিহাসিক পরিণতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে? ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ মনে করে—ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হলে তাদের ভাগ্যে জুটবে ঘোর অমানিশা। জামায়াত নেতৃত্বাধীন কোনো জোট যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ একটি ইসলামপন্থী শক্তির নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত কি না—সে প্রশ্ন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এমন নেতৃত্ব শরিয়াহ আইন প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে, যেখানে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে বাধ্য।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামী রীতিমতন ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জামায়াত দ্রুত নিজেকে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদি ঘটনাচক্রে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়ে যায়, তবে এটি হবে দলটির জন্য নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, যে দলটি বাংলাদেশের জন্মের কেবল বিরোধিতাই করেনি, ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সঙ্গী হয়েছে।
অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ওই চারটি নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল ৩০.০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৭.৪৪ শতাংশ, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০.১৩ শতাংশ ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভোট পায় ৩০.৮১ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৩৩.৬১ শতাংশ, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪০.৯৭ শতাংশ আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৩.২০ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ভোট পেয়েছিল ১২.১৩ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৮.৬১ শতাংশ, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৪.২৮ শতাংশ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৪.৬০ শতাংশ। এ যাবৎ অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনে জামায়াত কখনোই ১৮টির বেশি সংসদীয় আসনে জয়ী হতে পারেনি।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী দলটি যেন নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি জনসমর্থনের নতুন জোয়ার তৈরি করছে, যা মধ্যপন্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট’ (IRI)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির জনসমর্থন যেখানে ৩৩ শতাংশ, সেখানে জামায়াত ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। অন্য একটি জরিপেও একই ধরনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে; সেখানে ৩৪.৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপি শীর্ষে থাকলেও জামায়াতের অবস্থান ছিল ৩৩.৬ শতাংশে।