সর্বমিত্ররা কেমন করে সর্বশত্রুতে পরিণত হচ্ছেন?
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একের পর এক নিপীড়নমূলক ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কে বেশি নিপীড়ন করতে পারেন, এই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন তারা। কে কাকে ছাড়িয়ে যাবেন! আলোচনা-সমালোচনা—কোনো কিছুকেই পরোয়া করছেন না। কিছুদিন পর পরই একে ধরা, ওকে মারা, এর-ওর বিরুদ্ধে মব করা—সবই চলছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ সদস্যদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে।
ডাকসু, রাকসু ও চাকসুর প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষককে হেনস্তা, হুমকি, পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তবে এই সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে সর্বমিত্র চাকমার কাণ্ডকীর্তির সর্বশেষ ভিডিও। ডাকসু সদস্য এই সর্বমিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হকারদের মারধর করে আলোচনায় এসেছিলেন, এবার খেলার মাঠে শিশুদের নাক ধরে উঠবস করিয়ে আলোচনার তুঙ্গে আছেন। সর্বমিত্র চাকমা ছাত্র শিবিরের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, যারা আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে নিজেদের ব্যস্ত রাখছেন, তাদের বেশির ভাগই ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একেকটি সর্বমিত্র, এই সর্বমিত্রদের মধ্যে রাকসুর জিএস সালাহ উদ্দীন আম্মারের মতো দুয়েকজন ‘স্বতন্ত্র’ও আছেন, যাদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয়ের কারণ রয়েছে।
সর্বমিত্র চাকমা সর্বশেষ আলোচনায় আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে খেলতে আসা কয়েকজন শিশুকে কান ধরে উঠবস করানোর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর। নিজের ফেইসবুক পোস্টে সর্বশত্রুতে পরিণত হওয়া সর্বমিত্র তার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “কারো প্রতি অভিমানবশত বা প্ররোচিত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিইনি। কাজ করা যেখানে কঠিন, অসম্ভব, সেখানে পদ ধরে রাখার কোনো মানে নেই।”
নিজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পক্ষে ফিরিস্তি দিয়ে সর্বমিত্র বলেন, “আমার ভাবনা-চিন্তায় স্রেফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা। আমি বিভিন্ন জায়গায় হাত দিয়েছি, একা। চেষ্টা করেছি সমাধানের—নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও। কিন্তু যত যাই হোক, আইন তো আইনই। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইনের ঊর্ধ্বেও যেতে হয়েছে পরিস্থিতি মোকাবেলায়, নিরাপত্তা বিধানে—যা আমার ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক অবস্থা বিষিয়ে তুলেছে। আমার আর কন্টিনিউ করার সক্ষমতা নেই।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দেওয়া সর্বমিত্রের ওই পোস্ট বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সর্বমিত্র শিশুদের নির্যাতন করে যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন, তা নিয়ে কিন্তু ন্যূনতম অনুশোচনা করেননি। তবু তার পদত্যাগের ঘোষণা অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। কেউ কেউ আবার এই বলে যুক্তি দিয়েছেন যে, সর্বমিত্র ‘আদিবাসী’ ছেলে, বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর একটির সদস্য। তিনি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন। তাকে শিবির নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ব্যবহার করেছে। অনেকে আরও কিছুটা এগিয়ে মন খারাপ করে লিখেছেন, সর্বমিত্রের জন্য ‘আদিবাসী’দের ওপর অন্যদের খারাপ ধারণা তৈরি হতে পারে, হচ্ছে।
কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রথম থেকেই আরও অনেকের সঙ্গে সর্বমিত্রের এই ধরনের মাস্তানিতে সবাই বিরক্ত হয়েছেন, ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু কেন এবং কীভাবে সর্বমিত্র এই ধরনের কর্মকাণ্ড একের পর এক চালিয়ে যেতে পেরেছেন? সর্বমিত্রের এই ক্ষমতার উৎস কোথায়? তাকে কি কেউ বাধা দিয়েছে এইগুলো করতে? তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। সেটি ছাপিয়ে তিনি এখন ডাকসু এবং ছাত্র শিবিরের নেতাও। তার পেছনে কাজ করছে ছাত্র শিবিরের ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা বলেই তার আদেশ ভয়ংকর, তার লাঠি হকারদের পিঠে পড়েছে, শিশুরা তার ভয়ে হাঁটু কাঁপিয়ে কানে ধরে উঠবস করেছে।
এই ক্ষমতার পেছনে আছে মতাদর্শিক আছর। ছাত্র শিবিরের মুরুব্বি দল জামায়াতে ইসলামী কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে, সেখানকার নারী শিক্ষার্থীদের দেখে—তার বড়সড় নমুনা আমরা সাম্প্রতিক সময়ে আরও জানতে পেরেছি। বরগুনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সুলতান আহমেদের নির্বাচনি জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদকে ‘মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা’ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ বিষয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পরে যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল, সেটা ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে।’ এখন তাহলে খুব সহজ প্রশ্ন—যারা এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখে, তারা তো সেটি ‘পাল্টাতে’ লাঠিয়াল হয়েই উঠবে। কারণ মাসখানেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বিকেল পাঁচটার পর নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বমিত্ররা শুধু মাত্র তো এখন শিশুদেরই কান ধরে উঠবস করতে বলেছে, বিকেল পাঁচটার পর নারী শিক্ষার্থীরা গেলে তাদের হয়তো এমন উঠবস করতে হতো! কারণ জামায়াত নেতার এই ধরনের বক্তব্যের পরে তো মনে হয়, তাদের পরিকল্পনা এমনই। আস্তে আস্তে সবই বাস্তবায়িত হবে সর্বমিত্রদের মাধ্যমে। তাই কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ভাষণ কিংবা নিছক ঘটনা নয়। একটি আরেকটির সঙ্গে খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আরও কারণ এর পেছনে খুঁটি হয়ে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বমিত্র কিংবা জুবায়ের এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে সর্বমিত্ররা ডাকসুকে প্রশাসনের অংশ ভাবা শুরু করেছেন এবং বলতেই হবে যে, এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আসকারা ছিল, সমর্থন ছিল। সর্বমিত্র ও জুবায়েরদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে তাদের অনেক কর্মকাণ্ডকে এক ধরনের ‘চাপ’ বলে অনেক কিছু পাশ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সর্বমিত্র তার ফেইসবুক পোস্টে তার এই ধরনের কৃতকর্মের জন্য কোনো ধরনের ক্ষমা চাননি। বরং তিনি এসব কাজের সমালোচনাকে নিতে পারছেন না। আমি সর্বমিত্রকে শিবিরের ‘ব্যবহৃত’ ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চাই না, কিংবা ‘আদিবাসী’ ছেলে না বুঝেই ফাঁদে পা দিয়েছেন—এই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকে মুক্তি দিতে চাই না। সর্বমিত্র যা করেছেন, তা একটি ইসলামী মতাদর্শিক দলের ক্ষমতার লাঠিয়াল হয়েই করেছেন, কারণ তিনি লাঠিয়াল হতে চেয়েছেন। সর্বমিত্র যখন ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী হন, তখনও অনেক সমালোচনা, অবাক-বিস্ময়কে পাশ কাটিয়ে সর্বমিত্র প্রার্থী হয়েছেন শিবিরের প্যানেল থেকেই এবং জয়লাভও করেছেন। সুতরাং তাকেও ‘বলির পাঁঠা’ ভাবলে ভুল হবে।
আরেকটি বিষয় এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, এটিও ভাববার কোনো কারণ নেই যে একজন সর্বমিত্র পদত্যাগ করলেই বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি বরগুনার জামায়াত নেতার বক্তব্যে দেখা গেছে তা পাল্টে যাবে। এখানেও জামায়াতের বরগুনার নেতা ও শিবির থেকে নির্বাচিত ডাকসু সদস্যরা আলাদা সত্তা নন।
সর্বমিত্র একা নন। তার মতো আরও কয়েকজন বিভিন্ন ক্যাম্পাসে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছেন এবং আরও ঘটাবেন হয়তো। তারা তাদের মনের মতো বিশ্ববিদ্যালয় চান। তাই সর্বমিত্রের এই পোস্টে খুব বেশি আহ্লাদিত হওয়ার সুযোগ নেই।
বরগুনার ওই জামায়াত নেতা তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে এই দুঃখ প্রকাশ যে রাজনৈতিক, তা বুঝতে খুব বেশি সময় নিতে হয় না। এর আগেও ইসলামী দলগুলো থেকে জনপরিসরে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীদের ‘বেশ্যা’ বলে গালিগালাজ করা হয়েছিল। সেই সময়ও এ নিয়ে ‘চুপচাপ’ থাকার রাজনীতিই দেখা গেছে। তাই মগজে সব সময় এটিই রয়েছে বলে বারবার মুখ থেকে বের হয়ে যায়, আর পরে রাজনৈতিক দুঃখপ্রকাশ করা হয়। কিন্তু সবাই জেনে যায় আসল রাজনীতি।
সর্বমিত্রের পোস্টে অনুশোচনা নেই, আছে ক্ষোভের প্রকাশ। যা চাচ্ছেন, তা পুরোদমে করতে পারছেন না বলে অসহায় বোধ করছেন তিনি। কিন্তু দেখুন, তার সঙ্গে অন্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দৌরাত্ম্য করে বেড়াচ্ছেন, তাদের মিলের জায়গা হলো—তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে একইভাবে দেখতে চান এবং সেটির বাস্তবায়নের জন্য তাদের সর্বমিত্রদের মতো আরও বেশি আগ্রাসী লাঠিয়াল দরকার।