গণতান্ত্রিক বৈধতা ও বৈশ্বিক মর্যাদা
বর্তমানে দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি প্রচারণা তুঙ্গে থাকলেও বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোর মধ্যে এ নিয়ে প্রবল কূটনৈতিক তৎপরতা ও গভীর পর্যবেক্ষণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। নির্বাচনের বাইরে থাকা রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও এই নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলের এই বিশেষ নজরদারির মূল লক্ষ্য হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা বজায় রাখা। প্রচারণার শুরুর দিনগুলো তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ হওয়ায় পর্যবেক্ষক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক স্বস্তি বিরাজ করছে। মূলত একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে টেকসই উন্নয়ন এবং বিশ্বস্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এই সামগ্রিক তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে এক চূড়ান্ত 'লিটমাস টেস্ট'। এই নির্বাচন দেশের দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত যে নির্বাচনি উত্তাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা মূলত ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সাংগঠনিক সামর্থ্য এবং জনসমর্থন প্রমাণের জন্য যে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক অংশীজনদের জন্য বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝার অন্যতম মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে।
নির্বাচনি প্রচারণার প্রথম থেকেই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক ধরনের 'কৌশলগত সতর্কতা' দৃশ্যমান। দলগুলো তাদের জনপ্রিয় ইশতেহার ও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার গতানুগতিক ধারায় ফিরলেও, গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে এক প্রকার 'ডিপ্লোম্যাটিক হেজিং' বা কৌশলী নীরবতা পালন করছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত জনসভাগুলোতে মূলত তৃণমূলের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের কৌশল নিয়েছেন। ঢাকা-১৭ আসনের জনসভায় তার বক্তব্যে 'বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন' এবং উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকলেও, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাশিত 'রাষ্ট্র সংস্কার' বা 'গণভোটের' ইস্যুগুলো অনুপস্থিত ছিল। এটি মূলত বৈশ্বিক অংশীজনদের সন্তুষ্ট করার চেয়ে অভ্যন্তরীণ ভোটারদের আবেগ ও পপুলিস্ট অ্যাজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে।