‘এখন তো এটাই জীবন’
আমার থেকে ২৪ বছরের ছোট, বা বলা ভালো ৩৮ বছরের এক যুবক, যিনি গত পাঁচ বছর জেলে আছেন, তিনি বলছেন, অব ইয়হি হ্যায় জিন্দগি, এখন তো এটাই জীবন। হ্যাঁ, আমি উমর খালিদের কথা বলছি, আমি শারজিল ইমামেরও কথা বলছি। তাদের সঙ্গে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তারা জামিন পেয়েছেন-গুলফিসা ফাতিমা, মীরান হায়দার, শিফাউর রহমান, মহম্মদ শাকিল খান, শাদাব আহমেদ জামিন পেয়েছেন। হ্যাঁ, পাঁচ বছর পর তারা মুক্ত নন, কিন্তু জামিন তো পেলেন। জামিন পাননি উমর খালিদ, শরজিল ইমাম। উমর খালিদ বলেছেন, অব ইয়হি হ্যায় জিন্দগি। এই তরুণ-যুবকেরা কতটা খতরনাক? কতটা সাংঘাতিক অপরাধী? নিজের আশ্রমে ড্রাগ-কোকেন বিক্রি করত? নিজের আশ্রমে যুবতী মেয়েদের ধর্ষণ করত? একে-ফর্টি সেভেন পাওয়া গেছে এদের ঘর থেকে, গাড়ির ডিকি থেকে? ট্রেনে বোমা রেখে এসেছিল? একটা মহল্লা ঘিরে ধরে আগুন লাগিয়ে শিশু-বৃদ্ধ-নারীদের পুড়িয়ে মেরেছিল? ব্যাংকের টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিল? বা এদেশেই বসে আছে দিব্য মেজাজে? ঘুস দিয়ে সরকারি বরাত পেয়েছিল? অ্যাট লিস্ট, ‘গোলি মারো শালোকো’ বলে স্লোগান দিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছিল?
না, দেশ যখন সিএএ-এনআরসির বিরুদ্ধে রাস্তায়, তখন তারাও ছিলেন সেই আন্দোলনে, আরও অজস্র মানুষের সঙ্গে-দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, কলকাতা, গৌহাটি, তিরুবনন্তপুরম, অমৃতসর-কোথায় নয়? সেই প্রথম আমরা দেখেছিলাম মোদি-শাহের চোখে-মুখে ভয়; কারণ দেশজোড়া এ আন্দোলনে এই তরুণদের হাতে ছিল সংবিধান, তারা বলছিলেন গান্ধী, নেহেরুর কথা; বলছিলেন, আমাদের জেলে পুরুন, মারুন, আটকে রাখুন, আমরা রাস্তা ছাড়ব না। সরকার থতমত খেয়ে একবার একথা, একবার সেকথা বলা শুরু করেছিল। একজন ক্রোনোলজি বোঝাচ্ছিল; অন্যজন বলছিল, আমরা এনআরসি লাগু করার কথা ভাবছিই না, ওসব লাগু করা হবে না।
স্বাধীনতার পর নকশালবাড়ির ঘটনার পর গণআন্দোলনের ইতিহাসে সিএএ-এনআরসিবিরোধী আন্দোলন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সংবিধান বাঁচানোর লড়াই। হ্যাঁ, ব্যাকফুটে থাকা সেই
সরকারকে বাঁচিয়েছিল করোনা। সেদিন করোনা না এলে এই সরকারের গদি উলটে যেত সে সময়েই। হ্যাঁ, একটু দম ফেলার সুযোগ পেয়েই দিল্লিতে রায়ট বাঁধানো হলো; অনুরাগ ঠাকুর, কপিল মিশ্রাদের মিছিলে স্লোগান উঠলো-‘দেশ কে গদ্দারোঁ কো, গোলি মারো শালো কো।’ তারা মন্ত্রী হলেন আর হঠাৎই উজ্জীবিত সরকার গ্রেফতার করল এই যুবক-যুবতীদের। হ্যাঁ, গ্রেফতারিতেও চক্রান্ত ছিল। খেয়াল করে দেখুন কাদের গ্রেফতার করা হলো, কাদের ওপর ইউএপিএ (আইনবিরোধী তৎপরতা প্রতিরোধ আইন) চাপানো হলো? প্রত্যেকে মুসলমান। মানে? মানে বুঝিয়ে দেওয়া যে, সিএএ আর এনআরসির বিরোধিতা তো করেছে কেবল মুসলমানরা, এবং তারপরই তারা দেশদ্রোহী, তারা দেশের মধ্যে অরাজকতা ছড়ানোর জন্যই এসব করেছে, তারা দেশের জমিতে দাঁড়িয়ে বিদেশিদের হয়ে কাজ করছে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমরা দেখেছি সেদিন সিএএ’র বিরুদ্ধে স্বরা ভাস্কর ছিলেন রাস্তায়, ছিলেন প্রকাশ রাজ, রাস্তায় ছিলেন যোগেন্দ্র যাদব, রাস্তায় ছিলেন কানহাইয়া কুমার, রাস্তায় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমান বসু, এম কে স্তালিন, পিনারাই ভিজয়ন, সীতারাম ইয়েচুরি, অখিলেশ যাদব, নেহা রাঠোর, আরও কত কত মানুষ। সেদিনের আন্দোলনে একজন মানুষও কি মারা গেছে? না। কিন্তু ইউএপিএ চাপানো হলো যাদের ওপরে, যারা পাঁচ বছর জেলে কাটালেন, যারা এখনো বেল পেলেন না, তারা সব্বাই মুসলমান। যারা সামান্য খবর রাখেন থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সান্ত্রী, আমলাদের প্রত্যেকে জানেন কেন এরা জেলে; জানেন খুব ভালো করে কেন কেবল এদেরকেই জেলে পোরা হয়েছে। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নেতারা জানেন আসলে কী হয়েছিল, কেন এরা জেলে। বিচারকরা জানেন না? না, বিচার হয়নি; তাদের অপরাধের তালিকা তৈরি হয়েছে, তারা সেই অপরাধ করেছেন কিনা, তার বিচার হয়নি। কিন্তু তারা পাঁচ বছর জেলে কাটালেন, এখনো দুজন থেকেই গেলেন জেলে। তাদের একজন বলেছেন, অব তো ইয়হি হ্যায় জিন্দগি, এখন তো এটাই জীবন। হতাশ? মেনে নিচ্ছেন এই জেলজীবন? একেবারেই না, জানিয়েছেন লড়ে যাবেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সরকারবিরোধী আন্দোলন