খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে...
‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে...’ কাজী নজরুল ইসলামের একটি খুব পরিচিত গান। এই গানে তিনি ঈশ্বরকে কল্পনা করেছেন এক ‘বিরাট শিশু’ হিসেবে। সেই শিশু পুরো বিশ্বকে নিজের খেলনার মতো ধরে নিয়েছে। সে খেলতে খেলতে কখনো সৃষ্টি করছে, কখনো ধ্বংস করছে। সে উদাসীন, তার খেলায় কার কী হচ্ছে, সে বিষয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
আজকের বাস্তবতায় ঈশ্বরের বাইরে আমরা যেন আরেক ‘বিরাট শিশু’কে দেখতে পাচ্ছি। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রভাবশালী নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে সেই ভূমিকায় বসিয়েছেন। তাঁর সিদ্ধান্তে, তাঁর খেয়ালখুশিতে গোটা বিশ্ব প্রভাবিত হচ্ছে। এই বিরাট শিশুর যেন কোনো দায় নেই— এমনভাবে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে খেলছেন। আমরা অনেক সময় শুধু অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারি না।
শক্তির দম্ভে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য একটি রাষ্ট্র পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিচ্ছে—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ম, ন্যায়বিচার বা সার্বভৌমত্বের কথা বললেও বাস্তবে সেগুলোর খুব একটা মূল্য নেই। সেখানে আসল ব্যাপার হলো শক্তি ও ক্ষমতা। যে শক্তিশালী, সে-ই পারে সবকিছু। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তারা আর আন্তর্জাতিক নিয়ম মানার প্রয়োজন মনে করে না। তারাই আইন ঠিক করে, তারাই বিচার করে, তারাই শাস্তি দেয়। যাকে ইচ্ছা ধরে আনে, যাকে ইচ্ছা অপমান করে, যাকে ইচ্ছা রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যায়। এই শক্তির সামনে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা মানবাধিকারের কথা প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়ে। সবকিছু চাপা পড়ে যায় শক্তি ও স্বার্থের দাপটে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কার্যত এক ব্যক্তির খেয়ালখুশির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিষ্ঠিত কূটনীতি, বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্ত কিংবা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা তিনি করেন না। ক্ষমতায় এসেই তিনি ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করেন, যদিও সেটি জাতিসংঘ-সমর্থিত ছিল এবং ইউরোপের বড় শক্তিগুলো এতে যুক্ত ছিল। এরপর ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলায়মানিকে হত্যা করা হয়—কোনো যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই, কোনো আন্তর্জাতিক অনুমোদন ছাড়াই। এই ঘটনায় গোটা মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে অস্থির হয়ে ওঠে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প আরও আগ্রাসী ভূমিকা নেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অবৈধ ঘোষণা করে তিনি বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেন। একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কিউবার সঙ্গে ওবামার আমলে শুরু হওয়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া বন্ধ করে আবার কঠোর অবরোধ আরোপ করা হয়। ফিলিস্তিন ইস্যুতে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেওয়া হয়, যা জাতিসংঘের বহু প্রস্তাবের সরাসরি লঙ্ঘন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে কখনো যুদ্ধের হুমকি, কখনো বন্ধুত্বপূর্ণ চিঠি—এই দোলাচল দেখিয়ে দেয় ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কতটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অনিশ্চিত ছিল। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করে শুল্ক বাড়ানো হয়, যার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। যদিও শেষ পর্যন্ত চীনের প্রতি নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। ন্যাটো মিত্রদের প্রকাশ্যে অপমান করে বলা হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা। এমনকি জলবায়ু সংকটের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতেও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্তে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো ধারাবাহিক নীতি নেই, আছে শুধু শক্তি প্রদর্শন আর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
এই প্রেক্ষাপটেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা শক্তির রাজনীতির সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণে পরিণত হয়। ২ জানুয়ারি মার্কিন বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স একটি সার্বভৌম দেশ ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে অনেকের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই এর মূল লক্ষ্য।
নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে রাতের আঁধারে সামরিক অভিযান চালিয়ে আটক করার ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সাফল্য ও গোয়েন্দা দক্ষতার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এটা কি আইনসম্মত? ন্যায়সংগত? এই সভ্য সমাজে একটি দেশ কি পারে আরেকটি দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে ধরে নিতে?
অপছন্দের কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করিয়ে তাঁকে ধরে আনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্র পানামায় হামলা চালায় তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে অপসারণের জন্য। এর আগে ১৯৮৮ সালেই তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করা হয়। পানামায় হামলার পর নরিয়েগা প্রাণ বাঁচাতে পানামা সিটির ভ্যাটিকান কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয় নেন। সেখানে সরাসরি ঢুকতে না পেরে মার্কিন বাহিনী দিনরাত উচ্চ শব্দে রক মিউজিক বাজিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অবশেষে তিনি বেরিয়ে এলে ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করে মায়ামিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাঁকে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।