মাদুরো অপহরণ: অজুহাত মাদক, লক্ষ্য তেল সম্পদ দখল
কারাকাসের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন নিকোলাস মাদুরো। তার বাবা ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী। বাবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই সমাজ বদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তীকালে বেছে নেন সাধারণ শ্রমিকের জীবন। একজন বাসচালক হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতায় এলে মাদুরো তার বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন। ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। হুগো শাভেজের প্রয়াণের পর ২০১৩ সালে তিনি প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন
হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অনড় অবস্থানের কারণে শাভেজ যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক আগ্রাসনের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং ইরানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরো পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি ওয়াশিংটন মাদুরোকে দেশটির বৈধ সরকারপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করে।
যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মাদক পাচার ও সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, ভেনেজুয়েলা তাদের তেলের নৌযানের মাধ্যমে গোপনে মাদক পাচার করছে; যদিও এর সপক্ষে তারা কখনোই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারেনি।
ভেনেজুয়েলার এই কথিত মাদকচক্র দমন ও অবৈধ অভিবাসী ঠেকানোর অজুহাতে ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’ শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এই অভিযানের নামে ভেনেজুয়েলার উপকূলে প্রতিদিন ছোট ছোট নৌযানে হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা করা হচ্ছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এই বর্বরোচিত আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিড়ম্বনার বিষয় হলো, নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও নৌযান ধ্বংস করলেও অভিযানে সামান্য মাদকও উদ্ধার করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এর বিপরীতে ভেনেজুয়েলা সরকার নিজস্ব তৎপরতায় ৬৪ টন মাদক জব্দ করে তাদের মাদকবিরোধী অবস্থানের প্রমাণ দিয়েছে।
মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) ‘২০২৫ ন্যাশনাল ড্রাগ থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’-এ ভেনেজুয়েলাকে কোকেন উৎপাদক দেশ হিসেবে দেখানো হয়নি। অথচ মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামক একটি কাল্পনিক গোষ্ঠীকে ‘বৈদেশিক সন্ত্রাসী সংগঠন’ (এফটিও) হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছে—যা নাকি প্রেসিডেন্ট মাদুরো পরিচালনা করছেন। কিন্তু বাস্তবে এই কথিত সংগঠনের সঙ্গে মাদুরোর কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি খোদ ডিইএ-এর নথিতেও এই সংগঠনের কোনো নাম নেই; কারণ বাস্তবে এমন কোনো সংগঠনের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের অবৈধ মাদকের সবচেয়ে বড় ভোক্তা এবং সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের প্রধান কেন্দ্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ খোদ যুক্তরাষ্ট্র; অথচ তারাই এখন ভেনেজুয়েলাকে এ নিয়ে অভিযুক্ত করছে! জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় কোনো মাদক উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান নেই। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈশ্বিক মাদক উৎস মূল্যায়নেও ভেনেজুয়েলার নাম পাওয়া যায়নি।
কথিত মাদকচক্র দমনের নামে যুক্তরাষ্ট্র কারাকাস উপকূলের কাছে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজসহ মোট ১০টি জাহাজ এবং ১৫ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছিল। মূলত যেকোনো সময় দেশটিতে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর উদ্দেশ্যেই কয়েক মাস আগে থেকে এই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণের আশঙ্কায় ওই অঞ্চলের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার সতর্কতা জারির পাশাপাশি দেশটির গোয়েন্দা ও সামরিক বিভাগকে সেখানে গোপন অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছিল।
ন্যাশনাল লয়ার্স গিল্ডের ‘মিলিটারি ল’ টাস্ক ফোর্স’ এই ঘটনাকে গুরুতর ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, সামুদ্রিক ও সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এমনকি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’—যারা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের বহিঃআক্রমণ বা নৃশংসতা নিয়ে খুব একটা সোচ্চার নয়—তারাও স্বীকার করেছে যে, মাদক নিয়ন্ত্রণ ছিল ওয়াশিংটনের জন্য একটি অজুহাত মাত্র; তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য অন্য কিছু।
এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলায় একাধিক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। রাজধানী কারাকাস একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে। হামলার কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র আগেই মাদুরোকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে তার মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করেছিল।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার প্রতিবাদে ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা (পার্তিদো সোশালিস্তা উনিদো দে ভেনেজুয়েলা, যা সংক্ষেপে পিএসইউভি বলে পরিচিত) কারাকাসের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তা নিশ্চিত করেছে। হামলাগুলো মূলত সামরিক স্থাপনা—ফোর্ট টিউনা ঘাঁটি ও লা গুয়াইরা বন্দর—লক্ষ্য করে করা হয় এবং মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা রাজ্য আক্রান্ত হয়। হামলার আগে এফএএ ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় মার্কিন বিমানের চলাচল নিষিদ্ধ করে।