বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অশ্লীল স্লোগান: দায় কার?

www.ajkerpatrika.com ড. এম আবদুল আলীম প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৫, ১২:১৯

সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় খুব আলোচিত হচ্ছে। সেটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং ‘ছাত্র-জনতা’র অশ্লীল স্লোগান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, চায়ের আড্ডায় এবং পত্রপত্রিকার পাতায় অনেককেই এ নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। আমি নিজেও আমার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। এককথায়, আমরা সমবেত স্বরে আওয়াজ তুলেছি, গেল গেল দেশটা রসাতলে গেল! কিন্তু দায় কার? দায় কি কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ক্ষোভে-জিঘাংসায় রাজপথে নেমে আসা একদল শিক্ষার্থী কিংবা ‘ছাত্র-জনতার’? নাকি আমাদের সবার? বাহ্যত বিষয়টি সরল মনে হলেও, বাস্তবে পাটিগণিতের সরল অঙ্কের মতো জটিল।


প্রথমেই ‘অশ্লীলতা’ শব্দটি সম্পর্কে পণ্ডিতদের শরণাপন্ন হওয়া যাক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বানান অভিধানে ‘অশ্লীল’ শব্দের অর্থ পাওয়া যায় কয়েকটি; যেমন—অশালীন, অশিষ্ট, কুরুচিপূর্ণ, কুৎসিত ও জঘন্য। অশ্লীল থেকেই এসেছে অশ্লীলতা শব্দটি, যার জুতসই ইংরেজি ‘ভালগারিজম’। এআই পণ্ডিতের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে, স্পষ্ট জানিয়ে দিল, ‘ভালগারিজম’ বা ‘ভালগারিটি’ ‘অশ্লীলতা’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা সমাজে সাধারণত আপত্তিকর, নোংরা বা অশ্লীল বলে বিবেচিত হয়। এটি সামাজিক রীতিনীতি বা শালীনতার পরিপন্থী যেকোনো বিষয়কে বোঝাতে পারে, যেমন আপত্তিকর ভাষা, অনুপযুক্ত আচরণ বা যৌনতাপূর্ণ বিষয়বস্তু।


এবার দেখা যাক, এ বিষয়ে ধর্মশাস্ত্র ও সমাজবিজ্ঞানীদের বক্তব্য কী। পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নূরের ১৯ নম্বর আয়াতে যা বলা হয়েছে, তার মর্মকথা হলো, যারা অশ্লীলতা ছড়ায়, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। এ ছাড়া অনেক সুরা ও হাদিসে অশ্লীলতা সম্পর্কে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। ভগবদ্‌গীতায় বলা হয়েছে, যদি তুমি অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করো, তাহলে তুমি সাধুও নয়, শিষ্য বা অনুসারী তৈরির যোগ্যও নয়। বাইবেলে অশ্লীলতাকে স্পষ্টভাবে নিন্দা করে একে নিষিদ্ধ, অনৈতিক ও পাপপূর্ণ কাজ বলে গণ্য করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা অশ্লীলতাকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, এর দ্বারা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সমাজের সুস্থ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্রীয় আইনেও অশ্লীলতা সম্পর্কে দণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯২-২৯৩ ধারায় বলা হয়েছে—অশ্লীল প্রকাশনা প্রকাশ, প্রচার, বিক্রি, আমদানি ইত্যাদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর শাস্তির মেয়াদ তিন মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ডও হতে পারে।


এবার আসা যাক, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের অশ্লীল স্লোগান সম্পর্কে। আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে স্লোগান নতুন কিছু নয়। সব কালে, সব দেশেই প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠে নতুন নতুন স্লোগান ব্যবহৃত হয়েছে। সেসব নিয়ে ‘স্লোগানে স্লোগানে রাজনীতি’ নামে বইও রচিত হয়েছে। সেসব স্লোগানে ধর্মীয় আদর্শ, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। স্লোগানের সূত্র ধরেই আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিপ্লবের আগুন স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের রূপ ধারণ করে এক মানুষ থেকে কোটি মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।


সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে অশ্লীল স্লোগান তুলছে। নানা সময় অশ্লীল স্লোগান শোনা গেলেও এটি আলোচনায় আসে ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে পাথর মেরে এক ব্যক্তিকে হত্যার পর। তখন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা স্লোগান তোলে - ‘এক দুই তিন চার, অমুকের ...।’ গত সোমবার একজন রাজনীতিবিদের বাসার সামনে কিছুসংখ্যক ‘ছাত্র-জনতার’ সঙ্গে এক যুবতী একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে আছে, তাতে লেখা আছে, ‘গাছের আগায় কাউয়া, অমুক ...।’ যুবতীটি কেবল এমন স্লোগানসংবলিত লিখিত প্ল্যাকার্ডই বহন করছে না, মাঝে মাঝে তা স্লোগানেও ব্যবহার করছে।


একটি গাছ যেমন এক দিনে ডালপালা গজিয়ে আকাশের বুকে শাখা-প্রশাখা মেলে দেয় না, একটি দেশেও তেমনি অবক্ষয়ের বিষবৃক্ষ এক দিনে মহিরুহে পরিণত হয় না। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অবক্ষয়ের বীজ বপন করে দীর্ঘ সময় ধরে লালনপালন ও পরিচর্যা করে তাকে মহিরুহে পরিণত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষার্থীরা পড়ে তারা কারা? তারা কি মাটি ফুঁড়ে হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় আবির্ভূত হয়েছে? নাকি কারও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এসেছে। না, তারা পরিবারে জন্মে, সমাজে বেড়ে ওঠে, অনেক শিক্ষায়তনের গণ্ডি পার হয়ে কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বৈতরণি পার হয়ে মেধার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখে তারপরই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন আসে, এই মেধাবী সন্তানদের মুখে অশ্লীল স্লোগান এল কী করে? এককথায় উত্তর, আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে তাদের মুখে এই স্লোগান তুলে দিয়েছি। তাই দায় কেবল তাদের নয়, আমাদের সবার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ওয়াজ মাহফিলে, মসজিদ-মন্দিরের ধর্মীয় আলোচনায়, ইউটিউব-ফেসবুকসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে, রেডিও-টেলিভিশনের টক শো, নাটক-সিনেমায়, সংবাদপত্রের পাতায়, সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডায়, সংসদ অধিবেশন থেকে বড় বড় জনসভা, সংবাদ সম্মেলন থেকে বিশ্ব মিডিয়ার সাক্ষাৎকার; সর্বত্র যে বিষবৃক্ষের বীজ আমরা বপন করেছি, তা অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমে ডালপালা ছড়িয়ে মহিরুহে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করতে যে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য, বিষোদ্গার ও অশ্লীলতা আমরা বছরের পর বছর ছড়িয়ে চলেছি, তা-ই নতুন প্রজন্মের মাঝে সঞ্চারিত হয়ে তাদের প্রতিবাদের ভাষায় অশ্লীল স্লোগান রূপে স্থান পেয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও