বাংলাদেশে প্রকৌশল শিক্ষায় স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে, এমন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের পক্ষ থেকে নামের আগে বা পরে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দ ব্যবহার-সংক্রান্ত আন্দোলনকে ঘিরে আমার এই লেখার অবতারণা। আন্দোলনে আরও দাবি থাকলেও এটিই মুখ্য বলে মনে হচ্ছে।
লেখার শুরুতে নিজের দায় স্বীকার করে নিই–১৯৯১ সালে বর্তমানের রাজশাহী ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (রুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পরে ১৯৯২ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত বেসমারিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চাকুরি করেছি। পরে ২০১২ সাল থেকে কানাডায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি একটি ডিজাইন ফার্মে প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছি।
কানাডা এবং বাংলাদেশের প্রকৌশল পেশার তুলনামূলক আলোচনা এই লেখার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়, সেটা আগেই বলে রাখা ভালো। দুটো দেশের বাস্তবতা আলাদা। তবে, এই লেখায় বাংলাদেশে প্রকৌশল পেশার বর্তমান হাল এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী ধরণের প্রস্তুতি থাকা দরকার, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এই আলোচনা থেকে বর্তমানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যদি কিছু গ্রহণ করতে পারেন, তবে লেখাটিকে সার্থক বলে মনে করব।
প্রকৌশল পেশার মূল দায়টি সহজ ও সরল—প্রকৌশল সংক্রান্ত ডিজাইনের কারণে মানুষ অথবা প্রকৃতির ক্ষতি না করা। বিশ্বের যে দেশেই হোক না কেন, ডিজাইনের ফলে মানুষের প্রাণহানি বা পরিবেশের বিপর্যয় কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেজন্য প্রকৌশল পেশা বিশ্বব্যাপী একটি বিধিবদ্ধ পেশা হিসেবে স্বীকৃত। আইনজীবী কিংবা চিকিৎসক যেভাবে পেশাগত নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সের মাধ্যমে কাজ করেন, প্রকৌশলীকেও একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হয়। এই দায়ের সঙ্গে দরদের সম্পর্ক নেই—এটি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার বিষয়।
সত্য হলেও দুঃখজনক যে, বাংলাদেশে আইনজীবী ও চিকিৎসকদের জন্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রকৌশল পেশাকে সেভাবে বিধিবদ্ধ করা হয়নি। এমনকি, বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সনদ বাধ্যতামূলক হলেও, অবকাঠামো নির্মাণের নকশা বা সিস্টেম ডিজাইনের জন্য তেমন কোনও বাধ্যতামূলক প্রকৌশল সনদ বা রেজিস্ট্রেশন নেই। ফলস্বরূপ, প্রকৌশল কাজের দায় কার—তা অনেকক্ষেত্রেই অনির্ধারিত থেকে যায়।
বাংলাদেশে প্রকৌশল ডিজাইন ও বাস্তবায়নের কাজটি ঐতিহাসিকভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই হয়ে এসেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ওয়াপদার মাধ্যমে যে কাঠামোর শুরু, তা পরবর্তীকালে গণপূর্ত, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্ট ইত্যাদি নামে ভাগ হয়ে বিস্তৃত হয়। কিন্তু এই বিবর্তনের মধ্য দিয়েও তারা আমলাতান্ত্রিক ধাঁচের বাইরে যেতে পারেনি।
প্রকৌশল পেশা বাংলাদেশে হয়ে উঠেছে ফাইলনির্ভর এবং প্রশাসনিক আনুগত্যে পরিচালিত একটি চাকরি, যেখানে পেশাগত দায় ও নকশাগত স্বায়ত্তশাসনের স্পষ্ট অনুপস্থিতি রয়েছে।
এই পটভূমিতে যখন একজন স্নাতক শিক্ষার্থী ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দ ব্যবহারের দাবিতে আন্দোলনে নামে, তখন তা শুধুই মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নয়, বরং একটি অর্ধসত্য ধারণারও প্রতিফলন। কারণ প্রকৌশল শুধু একটি ডিগ্রি নয়, এটি একটি বিধিবদ্ধ পেশা, যেখানে লাইসেন্স, অভিজ্ঞতা, নীতিমালা ও দায়িত্ববোধ একসঙ্গে মিলেই প্রকৌশলীর পরিচয় গড়ে তোলে।
কানাডা বা আমেরিকায় নামের পাশে ‘P.Eng.’ লিখতে হলে কেবল ডিগ্রি থাকলেই চলে না, নির্দিষ্ট সময়ের অভিজ্ঞতা, একটি প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং বোর্ডের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং একটি রেগুলেটরি কাঠামোর আওতায় কাজ করার স্বীকৃতি থাকতে হয়। সেই লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রকৌশলী যে কোনো ডিজাইনের জন্য আইনত দায়বদ্ধ—ডিজাইনে ভুল থাকলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যন্ত নেওয়া যায়।