জুলাই সনদ নিয়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বেশ বড় গ্যাঁড়াকলে পড়েছে। সরকার তো ঘোষণা করেছে, আগামী পবিত্র রমজানের আগেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হবে। একটি সরকার নির্বাচন দিচ্ছে, তাতে সবারই মোটামুটি খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তার আগে কতগুলো সমস্যা রয়েছে, যেগুলো কেউ মুখ ফুটে বলছেন না। সেগুলো মূলত সংবিধান সংস্কারের সমস্যা। এসব সমস্যার সমাধান না করে ইলেকশনে গেলে ইলেকশনের পরও ঝামেলা সৃষ্টি হবে। স্মরণ রাখা দরকার, পাকিস্তান ভেঙে গেছে সাংবিধানিক সংকটের কারণে। আমার এ বক্তব্য অনেকের কাছে ধোঁয়াটে মনে হতে পারে। তবে আমি কিছুক্ষণ পর দেখাব, কেন সাংবিধানিক সংকটের কারণে পাকিস্তান ভেঙে গেছে।
অতবড় সমস্যা না হলেও সাংবিধানিক সংকট ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে দেখা গেছে। বর্তমানে ড. ইউনূসের যে সরকার, সেটি কোন ধরনের সরকার? সেটি কি সাংবিধানিক সরকার? নাকি বিপ্লবী সরকার? এসব প্রশ্ন এজন্য করতে হচ্ছে যে, এখন এ মুহূর্তে তো দেশে কোনো পার্লামেন্ট নেই। পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যে সংবিধানটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে, সেই সংবিধানে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদ বাতিল করা যেতে পারে। এখানে তো সেটির কোনো সুযোগ ছিল না। গত বছরের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনরোষের ভয়ে ভারতে পালিয়ে যান। বলা হয়, তিনি পদত্যাগ করেছেন।
দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করেছেন। মতিউর রহমান রাষ্ট্রপতিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্রটি কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন, সেটি তিনি জানেন না। তাকে আবারও প্রশ্ন করা হয়, এ পদত্যাগপত্রটি কি প্রধান উপদেষ্টার সচিবালয়ে আছে? আরও প্রশ্ন করা হয়, এটি কি কেবিনেট ডিভিশনে আছে? একই উত্তর, তিনি জানেন না। এরপর আর বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়া যায় না।
শেখ হাসিনাকে যেভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হলো, সেটি তো বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। কারণ, সংবিধান মোতাবেক সরকার অপসারণের মাত্র দুটি পথ আছে। একটি হলো নির্বাচন। অপরটি হলো জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো। এ দুটি পথের কোনো পথ ধরেই শেখ হাসিনাকে অপসারণ করা হয়নি। তাই বলে তার অপসারণ কি অবৈধ হয়েছে? অবশ্যই অবৈধ হয়নি।
যখন কোনো গণ-অভ্যুত্থান হয়, গণ-অভ্যুত্থানের কারণে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়, সেই সরকার চাইলেই প্রোক্লামেশন কিংবা রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করে নতুন সংবিধান জারি করতে পারেন। এ হিসাবে Doctrine of necessity-এর মার্শাল ল’র চেয়েও গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি অনেকগুণ বেশি। কিন্তু জনগণের অভ্যুত্থানের শক্তি সামরিক আইনের চেয়েও অনেক বেশি। এর কার্যকারিতা ঘটেছিল ফ্রান্সে। ৫ম রিপাবলিকের মাধ্যমে। এর কার্যকারিতা ঘটেছে আমেরিকায়। এর কার্যকারিতার সবেচেয়ে ভালো উদাহরণ হলো ফ্রান্সে। ফ্রান্সে প্রথম রিপাবলিক, দ্বিতীয় রিপাবলিক, তৃতীয় রিপাবলিক, চতুর্থ এবং পঞ্চম। এ ৫ম রিপাবলিকের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের ভিত্তিতে তারা তাদের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেছিল।
বাংলাদেশেও গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। অবশ্য সম্প্রতি মাননীয় হাইকোর্ট জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকে অভ্যুত্থান না বলে বিপ্লব বলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ মর্মে গেজেট নোটিফিকেশনের আদেশ দিয়েছেন। এ আদেশ তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন।