
বড় ঝুঁকিতে পোশাক খাতের সফট সিকিউরিটি
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা স্টেট সিকিউরিটি নিয়ে যখন আমরা চিন্তা করি, তখন আমাদের মনের অজান্তেই ভেসে ওঠে বড়সড় সামরিক ট্যাংক, মিসাইল, যুদ্ধজাহাজ কিংবা অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো কোনো নির্ভীক মুখের প্রতিচ্ছবি। আধুনিক যুগে হার্ড সিকিউরিটির কঠোর-কঠিন অবয়বের বাইরেও সফট সিকিউরিটির একটি কোমল চিত্র রয়েছে, যার নেপথ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়।
প্রতিদিনকার সীমান্তপাহারা, যুদ্ধকালীন বা জরুরি পরিস্থিতির উদ্ভবে হার্ড সিকিউরিটির প্রয়োজন হয়। মিডিয়াগুলো বড় করে সেসব ঘটনাপ্রবাহ কভার করে। যার কারণে মানুষ এসব বিষয়ে আরও বেশি সচেতন হন এবং বিভিন্ন স্কেলে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন।
কিন্তু সফট সিকিউরিটি মানুষের প্রতিদিনকার বিষয়। কথায় আছে, যেটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে যায়, সেসব বিষয় খুব সহজেই নজর এড়িয়ে যায়। যার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কিংবা জনগণ দেশের সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি হত্যা কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের কোনো এক মন্তব্য বা বাহাস নিয়ে যতটা বেশি শোরগোল ফেলে, সফট সিকিউরিটি প্রশ্নগুলোতে ততটা সরব নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ইতিবাচক-নেতিবাচক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, দোষারোপ, দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, ভুলনীতি, নীতির অস্থায়িত্ব কিংবা ভুল সিস্টেমের মতো অভিযোগ-অনুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা যদি চিন্তা করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন মোটাদাগে তিনটি খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রথমত, তৈরি পোশাক খাত যা রপ্তানি আয়ের বৃহৎ অংশের জোগানদাতা। দ্বিতীয়ত, কৃষি খাত যেখানে মোট জনশক্তির প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ মানুষ নিয়োজিত। এর বাইরে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা; যাঁরা সৌদি আরব, আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে থেকে আয় করে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠান।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সার্ভিস, আইসিটি, শিল্প ও নির্মাণ খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই খাতগুলোর যতটা প্রসার হওয়ার কথা ছিল, আমরা সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি।
তৈরি পোশাক আমাদের রপ্তানি আয়ের বড় একটি খাত হলেও আমাদের বাজার মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যদিও আমরা জাপান, অস্ট্রেলিয়া বা লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশের বাজারও ধরতে চেষ্টা করছি।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কত দিন এই সেক্টরের ওপর নির্ভর করে এগোতে পারব? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা ব্লকচেইন প্রযুক্তির এই যুগে নিত্যনতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা ইউরোপের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ যেহেতু অনেক কম দামে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক নিয়ে অনেক বেশি লাভ করতে পারে, তাই তারা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে হলেও বাংলাদেশে আসছে।
কিন্তু যদি তারা প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের দেশে কিংবা তাদের কাছাকাছি কোনো দেশে এমন পণ্য পায়, লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় যদি লাভের অংশ একই থাকে, তাহলে কি তারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য নেবে? সম্ভবত নেবে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ট্রাম্প ট্যারিফ যুদ্ধ শুরু করেছেন, তাতে স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই সেক্টর নিয়ে আমাদের বিস্তৃতভাবে ভাবার ও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করার বিষয়ে সতর্ক ও মনোযোগী হতে হবে।
এখানে ভিয়েতনাম, চীন, ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী আছে। সে কারণে এই খাতকে আরও বেশি অটোমেশন করে প্রোডাকটিভিটি বাড়ানো, নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করা, পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- পোশাক খাত
- নিরাপত্তা ঝুঁকি