ছবি সংগৃহীত
মনের কোনো বয়স নেই: কচি খন্দকার
আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৭, ১৫:৩৭
নীল রঙে তারুণ্যতায় কচি খন্দকার। ছবি: শামছুল হক রিপন. প্রিয়.কম
(প্রিয়.কম) জন্ম থেকে মৃত্যু। এই তো জীবন। খুব অল্প সময় হলেও জীবন কিন্তু সুন্দর। তবে তা মাঝে মাঝে নিষ্ঠুরও হয়। সেটা প্রকৃতির খেলা। সে খেলায় হার-জিত তো থাকবেই। তাই বলে কি জীবন থেমে থাকবে? না, থাকে না। জীবন তার গতিতেই চলবে। এই গতি ধরে রাখার জন্যই রয়েছে মন নামক এক কল্পপনার জগৎ। যে জগতের কোনো বয়স নেই। অজস্র বছর ধরে বেঁচে থাকে সে। শরীরের মৃত্যু হলেও মনের কোনো মৃত্যু নেই।
এই বয়সের খেলা বোঝাতেই বোধহয় তার নাম রাখা হয়েছে কচি। পুরো নাম কচি খন্দকার। নিজের মধ্যে এখনও তারুণ্য ধরে রেখেছেন। নাট্য নির্মাণ ও অভিনয় দুই দিকেই তিনি ব্যতিক্রম। বর্তমান সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ডিরেক্টর গিল্ডের সহ-সভাপতি হয়েছেন। তার ব্যতিক্রম কাজ ও ডিরেক্টর গিল্ডের পরিকল্পনা নিয়ে কথা হলো প্রিয়.কমের সঙ্গে।
প্রিয়.কম: কেমন আছেন আপনি?
কচি খন্দকার: ভালো আছি। আপনি কেমন?
প্রিয়.কম: ভালো আছি। অফিসে আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?
কচি খন্দকার: না সমস্যা হবে কেন? ঠিকঠাকই আসতে পেরেছি। কেন আপনার কী আমাকে বয়স্ক মনে হয়? (বলেই হাসি)
প্রিয়.কম: না ভাই। আপনার নামই তো কচি। মনের তো বয়স নেই। তাই না?
কচি খন্দকার: ঠিক বলেছেন। এতটা বয়স হলেও কিন্তু এখনও আমার নিজেকে তরুণ মনে হয়। আর তারুণ্যতা আমাকে ভালো টানে। নীল জামা পরে আসার ঘটনাটা কী আগে বলেন তো?
প্রিয়.কম: এমনিতেই, ভাই হিসেবে বলেছি। নীলের প্রেমে পড়েছি তো তাই। চলেন প্রশ্নে চলে যাই। মিডিয়াতে তো আপনার কাজ করে বেশ অভিজ্ঞতা হলো। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কী বলবেন?
কচি খন্দকার: বর্তমানে টেলিভিশনে এখন আসলে বেশ বড়সর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক চ্যানেল নতুন করে শুরু হয়েছে। কিন্তু পেশাগত জায়গা থেকে যে একটা কাঠামোগত অবস্থা তৈরির কথা সবাই বলছি, আসলে এখনও পেশাভিক্তিক অবস্থান তৈরি হয়ে ওঠেনি। যার ফলে এখনও আমরা গর্ব করে বলতে পারছি না যে আমরা একটি পেশাভিত্তিক কর্মে আছি। এটাই আমার কাছে মনে হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি।
প্রিয়.কম: তাহলে পেশাভিত্তিক পরিবেশ করতে হলে কী করণীয়?
কচি খন্দকার: পেশাভিত্তিক করতে গেলে প্রথমেই আসবে বাজেটের প্রশ্ন, যোগ্যতার প্রশ্ন, বৈধতার প্রশ্ন। এখন আমরা যারা কাজ করছি, তারা নির্ভরশীল হচ্ছি টেলিভিশন, পরিচালক ও প্রযোজকদের উপরে। এখন প্রত্যেকের সমন্বয়ের মাধ্যমেই তো আমরা পেশাভিত্তিক কাজের জায়গাটা তৈরি করব। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে, কেউ কারও সঙ্গে মিশে থাকতে পারি না আবার কোনো নিয়ম নীতিও মানি না। অভিনয়শিল্পীদের কাজের কতক্ষণ সময় থাকবে, পরিচালকের কতক্ষণ সময় থাকবে- এসবের কোনো বাস্তবতা নেই। যার ফলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই বিশৃঙ্খলা থেকে বের হতে গেলে এখনই কাজ শুরু করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা করে একটা নিয়মের মধ্যে আসতে হবে সকলকে। তাহলেই পেশাভিত্তিক কর্মক্ষেত্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রিয়.কম: সেই জায়গা থেকে ডিরেক্টর গিল্ড কী পরিকল্পনা করছে?
কচি খন্দকার: ডিরেক্টর গিল্ডের সঙ্গে বর্তমানে ৫০০ জন মানুষ সম্পর্কিত। যেহেতু ডিরেক্টর গিল্ডের কাজই হচ্ছে পরিচালকদের নিয়ে কাজ করা। এখন কাজের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনা করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বলতে গেলে ডিরেক্টর গিল্ড চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাথায় রাখতে হবে ডিরেক্টর গিল্ড অনেক দিনের হলেও নির্বাচন হয়েছে কয়েক মাস আগে। এখন আসলে বলা যেতে পারে আমাদের অস্তিত্ব আছে। এখন আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমাদের যে যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো সমাধানের জন্য। প্রথম যে সমস্যা ছিল, তা হলো আমরা যে পরিচালক তারই কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় ছিল না। আমরা এই কাজটি সফলভাবে শেষ করেছি। এখন আমাদের একটি পরিচয় আছে। ডিরেক্টর গিল্ড টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সঙ্গে বসেছে। আলোচনা করেছে কীভাবে নাটকের মান ও বাজেট বাড়ানো যায়। একটি বড় সমস্যা আছে আমাদের, সেটা হলো আমাদের নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। তাই একটি সুন্দর স্থান নির্বাচন করে পরিচালকরা এক সাথে হবো এবং পাশাপাশি পরিচালকদের মেধা ও মান উন্নয়েনর জন্য একটি কর্মশালা এবং আড্ডা দেওয়ার জন্যই স্থান নির্বাচন করা হচ্ছে। অচিরেই আমরা খুব ভালোভাবে মাঠে নামছি।

কচি খন্দকার। ছবি: শামছুল হক রিপন. প্রিয়.কম
প্রিয়.কম: এখন একটা কথা উঠেছে সেটা হলো, প্রথম পর্যায়ে আপনাদের কাজের যে জোয়ার ছিল, তা এখন ভাটায় রুপ নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে কী বলবেন?
কচি খন্দকার: না না না। এই ধরনের কোনো কিছুই মনে হবার কারণ নেই। আমাদের নির্বাচন খুব আলোচিত হয়েছে। আর আমাদের নিবার্চনের পরেই কিন্তু অভিনয়শিল্পী সংঘের নির্বাচন হয়েছে। সামনে কিন্তু আরও নির্বাচন আছে। তার মানে কী! আমাদের জোয়ার ঠিকই রয়েছে, ভাটা পড়ার কোনো কারণ নাই। আর নিবার্চন কিন্তু আরো রয়েছে। তাই আমি বলব আমাদের উত্তেজনা এখনও রয়েছে। আমরা সংঘবদ্ধভাবে সমস্যার মোকাবেলা করব।
প্রিয়.কম: নতুন যারা ডিরেক্টর গিল্ডের সদস্য হয়েছেন, তাদের থেকে কেমন সাড়া আসছে?
কচি খন্দকার: সাড়া ভালো ছিল। তারাই বেশি উত্তেজিত। তবে যারা সদস্য হয়েছেন, তাদের একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে। নিয়মটা হচ্ছে- কমপক্ষে তিনটি নাটক নির্মাণ করে তারপর সদস্যপদ পাবেন তারা। আর যারা করতে পারেনি তারাও সদস্য হবে- তবে সেটা প্রাথমিক সদস্য।
প্রিয়.কম: টেলিভিশন নাটক আপনার কাছে কী মনে হয় ব্যবসায়িক নাকি শৈল্পিক?
কচি খন্দকার: শিল্পী ও ব্যবসার মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখাতে গেলে তো কারও বেঁচে থাকা হবে না। কারণ আমি যদি একটা শৈল্পিক কাজ করে সেটা কাউকে দেখাতে না পারলাম, তাহলে আমার লাভ কী হলো! আমাকে তো আমার কাজের মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে। আমার চেতনা রয়েছে তার বাস্তবতাই হলো শিল্প। এখন এটা কী আমি প্রকাশ করব না? অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। আর প্রকাশ করার মাধ্যমই হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসার যোগফল। হ্যাঁ, এখন এটা বলা যেতে পারে যে টেলিভিশনে অনেক সমস্যা রয়েছে। টেলিভিশনে যা শিল্পসম্মত কাজের কথা বলা হচ্ছে সেটা অনেকাংশেই ব্যাহত। এক্ষেত্রে আমি বলব, টেলিভিশন নাটক নির্বাচনের সময় তারা সঠিক নাটকটি নির্বাচন করছেন না। এই হলো সমস্যা।
প্রিয়.কম: বর্তমান সময়ের যারা নিয়মিত নাটক নির্মাণ করছেন তাদের নাটকে কী শৈল্পিকতা রয়েছে নাকি ব্যবসায়িক ব্যাপার বেশি?
কচি খন্দকার: আমি আসলে ব্যবসায়িক কথাটাই বলতে চাইছি না। কারণ এখন একটু কমেডি নাটক হচ্ছে যা শৈল্পিকতার বাইরে। কিন্তু দর্শক তো দেখছে। এই কারণে এখন আমি তো দর্শকের দোষ দিতে পারছি না। দর্শক তো ভালো গল্পের নাটকগুলো দেখবেই। অনেক সময় ভালো গল্পের নাটকগুলো রেখে বাজে গল্পের নাটকগুলো নির্বাচিত করছে। যার ফলে একটা প্রভাব পড়েছে দর্শকের উপর। এই রীতিটাই আমি মানতে চাই না বা মানি না। যেমন অনেক গল্পই রয়েছে যা টিআরপিতে আসেনি। কিন্তু জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং দর্শক মনে রেখেছে। আপনার নিশ্চয়ই ক্যারাম, ভূগোল, বাই সাইকেল, ফুটবলসহ আরও অনেক নাটক রয়েছে যা আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও শুনতে পেয়েছি নাটকগুলোর প্রশংসা।
প্রিয়.কম: কমেডি নাটকও কী আপনার কাছে শৈল্পিক মনে হয়?
কচি খন্দকার: অবশ্যই। এখন কমেডির নামে যদি ভাড়ামো না হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই শৈল্পিক। শেক্সপিয়রের অনেক নাটকই কমেডি ধাঁচের। তারপর চার্লি চ্যাপলিনের যে ইতিহাস রয়েছে সেগুলোতে কমেডি। এখন এদের কাজকে আমি কী শৈল্পিক বলব না? যদি ভালো গল্পে কমেডি থাকে তা অবশ্যই শৈল্পিক।
প্রিয়.কম: আপনি তো নির্মাণ ও অভিনয় দুটোই একসঙ্গে করছেন। আপনার নির্মাণে সবসময় ঐতিহাসিক কাজ দেখতে পাওয়া যায়। এটার কারণ কী?
কচি খন্দকার: আমি খুবই সচেতনভাবে চিন্তা করি। প্রথম কথা আমার গল্পটা। যে গল্পটি আমি তৈরি করতে চাইছি সেই গল্পটি যেন গতানুগতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে না থাকে এই চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে আমাকে প্রতিটি গল্পে নাটক নির্মাণের আগে গবেষণা করতে হয়। ধরুন- ক্যারাম গল্পটি যখন আমার মাথায় আসে তখন আমি চিন্তা করেছিলাম এই যে, ক্যারাম খেলায় রেড ফেলতে গিয়ে যে কাপুঁনি ওঠে শরীরে, কারণ রেডটা বড়, এর মার্কসটা বেশি। এটা আমাদের মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা। আমরা একটা বড় কাজ করতে যাই তখনই আমাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। এটা সবার ক্ষেত্রেই ঘটে আর সবাই ব্যাপারটি জানে। কিন্তু কারও মাথায় আসে নাই যে এটা নিয়ে গল্প হতে পারে। আমি লিখে ফেললাম। হয়ে গেল গতানুগতিকের বাইরের গল্প। নাটক প্রচার হলো এবং দর্শকের পছন্দ হলো। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে আমি তাদেরই ভাবনাতে ঢুকে গল্প নিয়ে কাজ করেছি।

কচি খন্দকার। ছবি: শামছুল হক রিপন. প্রিয়.কম
প্রিয়.কম: আপনি তো এখন প্রবাদ বাক্য নিয়ে নাটক নির্মাণ করছেন। কতদূর কী করলেন?
কচি খন্দকার: আমি অনেক আশাবাদী প্রবাদ বাক্যের এই সিরিজটি নিয়ে। কারণ, চিরন্তন সত্য কথাই হচ্ছে প্রবাদ বাক্য। যা হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে আছে। যেমন ধরুন ‘চোরের মার বড় গলা’। এই কথাটি কিন্তু এমনি এমনি আকাশ থেকে পড়ে নাই। নিশ্চয়ই কথাটি সত্য এবং এর প্রমাণও আছে। ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’ এটাও প্রমাণিত বলেই মানুষের মুখে মুখে আজও রয়ে গেছে। তাই প্রতিটি প্রবাদ বাক্যেরই একটা করে পেছনের গল্প আছে যা আমি পর্দায় দেখাবো। আমার এই গল্পটি দেখার পর কিন্তু মানুষ আবার বলবে- ‘আরে আসলেই তো ঘটনা সত্য!’ এখন প্রায় বেশ কিছু পর্ব নির্মাণ করে ফেলেছি। খুব শিগগিরই চ্যানেল আইতে প্রচার শুরু হবে এই ধারাবাহিক নাটকটি।
প্রিয়.কম: বর্তমান সময়ে আর কী নিয়ে ব্যস্ততা রয়েছে?
কচি খন্দকার: ব্যস্ততা বলতে আমার আরও একটি ধারাবাহিক নাটক ‘সিনেমাহল’ এর নির্মাণও আমাকে করতে হচ্ছে। আমাদের যে সিনেমা হলগুলো রয়েছে তার গল্প নিয়েই এই নাটকটি। প্রচার শুরু হবে খুব শিগগিরই। এছাড়াও অভিনয় তো রয়েছেই।
প্রিয়.কম: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, সময় দেওয়ার জন্য।
কচি খন্দকার: আপনাকে ও প্রিয়.কমকেও অনেক ধন্যবাদ।
সম্পাদনা: শামীমা সীমা / ফারজানা রিংকী