ছবি সংগৃহীত

শেষ হলো ‘কিরণমালা’র সম্প্রচার

শামীমা সীমা
সহ সম্পাদক
প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০১৬, ১৬:০২
আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৬, ১৬:০২

স্টার জলসার ধারাবাহিক নাটক ‘কিরণমালা’ নারী সমাজে বেশ জনপ্রিয়। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক দর্শক আছেন যাদের পছন্দের টিভি অনুষ্ঠানের তালিকায় আছে ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলোর নাটক। যা এদেশে বেশ দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে যাচ্ছে বেশ কয়েকবছর ধরে। বিশেষ করে জি বাংলা ও স্টার জলসার ধারাবাহিক নাটকগুলো এদেশের নারী সমাজে বেশ জনপ্রিয়। তেমন একটি টিভি সিরিয়ালের সমাপ্তি হলো, যা বাংলাদেশে ব্যাপক বিতর্কিত। কথা হচ্ছে স্টার জলসায় প্রচারিত ‘কিরণমালা’র।

সিরিয়ালটি যদি শুধুমাত্র বিনোদন গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে ব্যাপারটি সহনীয় হতো কিন্তু বাস্তব চিত্র তা নয়। ভারতীয় বাংলা ধারাবাহিক এই নাটকটির আসক্তি এদেশের মানুষের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নেয়। টানা ২ বছর ৩ মাস প্রচারিত এই ‘কিরণমালা’ সিরিয়াল দেখা নিয়ে কথা কাটাকাটি থেকে শুরু হয়ে পরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনার নজির রয়েছে বাংলাদেশে।

ভারতীয় টিভি চ্যানেল স্টার জলসায় প্রতি সোম থেকে রবিবার রাত ৮টায় কিরণমালা সিরিয়ালটি প্রচারিত হতো। ‘ঠাকুর মা’র ঝুলি থেকে নেওয়া সিরিয়ালটির কাহিনী মূলত ‘কিরণমালা’ চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে। এই সিরিয়ালের কারণে এদেশে বিভিন্ন সময়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

প্রথম ঘটনা গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর বড়দাপ সরকারপাড়া গ্রামে। এদিন কিরণমালা সিরিয়ালটি দেখতে গিয়ে ১৬টি পরিবার নিঃস্ব হয়। জানা যায়, ওইদিন রাত ৮টা ৪০ মিনিটে বাড়িতে সবাই ‘কিরণমালা’ সিরিয়াল দেখতে বসে। ওদিকে নাটক দেখার সময় চুলার আগুন থেকে রান্নাঘরে আগুন লাগে। এই ঘটনায় বসতবাড়ি-জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর তা আশেপাশের বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও মালামাল কিছুই রক্ষা করা যায়নি। পরে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ৩২০ কেজি চাল ও ঢেউটিন প্রদান করা।

এছাড়াও কিরণমালার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে গত শনিবার সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। ওই দিন সকাল ৯টায় উপজেলার বাদুড়িয়া গ্রামের সবুর মোল্লার পরিবারের সবাই একত্রে দেখছিলেন কিরণমালা। একই সময় পুকুর পাড়ে খেলা করছিলেন তার ছয় বছরের ছেলে আসাদুর রহমান ও তার চার বছরের চাচাতো বোন মনিরা খাতুন। একপর্যায়ে সবার অগোচরে শিশু দুটি পুকুরে পড়ে যায়। যখন সিরিয়াল শেষ হয় ততক্ষণে পানিতে ডুবে মারা যায় শিশু দু’টি। পরিবারের দুই শিশু হারিয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো বাড়িতে।

এবার গত বছরের ঘটনা। কিরণমালা দেখা নিয়ে ২০১৫ সালের নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বোড়াবাড়ি এলাকায় চিত্তরঞ্জন সাহার দুই মেয়ের মধ্যে ঝগড়া হয়। এটা এতোটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে এক পর্যায়ে বড় বোন সঞ্জিতা সাহা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।

মর্মান্তিক ঘটনার উদাহরণ এখানেই শেষ নয়। গত শুক্রবার রাত ৮টায় আরেক দুর্ঘটনা ঘটে কুষ্টিয়ার খোকসায়। উপজেলার চকহরিপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের স্ত্রী শোকেলা খাতুন বাড়ির পাশের দোকানে দলবেঁধে কিরণমালা দেখতে যান। স্টার জলসার এই সিরিয়ালের প্রতি এতোটাই নেশা ছিল তার যে দুই শিশু কন্যাকে ঘরে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেন তিনি। এরই মাঝে ঘটে দুর্ঘটনা। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরে তা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। কিরণমালায় মগ্ন থাকা মা খবর পেয়ে যখন বাড়িতে পৌছান, সে সময় ১০ বছরের সায়মা ঘরের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসলেও আগুনে পুড়ে মারা যায় সাত বছরের ছোট মেয়ে ঋতু। প্রতিবেশীরা গুরুতর দগ্ধ সায়মাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

তবে নাটকের এমন আসক্তির ঘটনা নতুন নয়। এর আগে, একই চ্যানেল স্টার জলসায় ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’ সিরিয়ালের পাখি চরিত্রের পোশাক ‘পাখি ড্রেস’কে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। এই পোশাক না পেয়ে আত্মহত্যা থেকে শুরু করে স্বামী-স্ত্রী হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে নতুন ক্রেজ ছিল ‘কিরণমালা’। সিরিয়ালটি শেষ হওয়ার খবর পেয়ে হয়তো এ দেশের অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন আজ!

সম্পাদনায়: নাজমুল হাসান শান্ত