ছবি সংগৃহীত
বিনা অভিজ্ঞতায় উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা ভুল সিদ্ধান্ত: দিদারুল আলম সানি
আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০১৭, ১৯:৩৮
দিদারুল আলম সানি। ছবি: সংগৃহীত
(প্রিয়.কম) বাংলাদেশের প্রথম সারির ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এসো.কমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দিদারুল আলম সানি। তরুণ এই উদ্যোক্তা বর্তমানে বালাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর ডিজিটাল মার্কেটিং ও কমার্স বিভাগের স্থায়ী কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মজীবনে টেলিকম প্রতিষ্ঠান ওয়ারিদ ও বাংলালিংকে কাজ করেছেন। এসিআই গ্রুপের সবচেয়ে বড় প্রকল্পের একটি স্বপ্ন যাত্রার শুরুর সময় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন তিনি। নিজের কর্মজীবনের গল্প ও অর্জনগুলো নিয়ে প্রিয়.কম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন দিদারুল আলম সানি।
প্রিয়.কম: আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প জানতে চাই।
দিদারুল আলম সানি: স্নাতক শেষ করার পর ২০০৬ সালে ওয়ারিদ টেলিকমে টেকনিক্যাল টিম সাপোর্টিং ও অপারেশনে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমি আমার কর্পোরেট ক্যারিয়ার শুরু করি। তারপর কাজ শুরু করি এসিআই লিমিটেডের ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পে। এখানে আমি কৌশলগত পরিকল্পনাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এ প্রকল্পে সম্পূর্ণ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন, মার্কেটরিসার্চ, কনজুমার রিসার্চ, নতুন নতুন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পর্যন্ত সম্পূর্ণ কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করি। এরপর ২০০৯ সালে বাংলালিংক আইকন ম্যানেজমেন্টে গ্রুপ আইকন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। বরাবরই ইচ্ছা ছিল আমার ভালোবাসার জায়গা থেকে নিজের উদ্যোক্তা জীবন শুরু করা, রিটেল-এ অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি অনলাইন ই-কমার্সের মাধ্যমে আমার উদ্যোক্তা জীবনের যাত্ৰা শুরু করি। আমি বিশ্বাস করতাম যদি স্বপ্ন, আগোরা বছরে ১২শত কোটি টাকা আয় করতে পারে, তাহলে ই-কমার্সও পারবে। এই সব থেকে আসলে আমি অনুপ্রাণিত হই।
প্রিয়.কম: কোন ভাবনা থেকে আপনাদের এই ই-কমার্স প্রকল্প শুরু করেন? প্রথমে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
দিদারুল আলম সানি: বরাবরই আমার চেষ্টা ছিল নতুন কিছু করার। যে চেষ্টায় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কল্যাণ সম্ভব। সে লক্ষ্যেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি ই-কমার্স ব্যবসা চালু করার চিন্তা-ভাবনা মাথায় আনি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এসো.কম অনলাইন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠা করি। যাতে করে মানুষ একটা প্লাটফর্মে এসে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কেনাকাটাগুলো খুব সহজেই করতে পারে। প্রথম দিকে তখনকার বাজার অবস্থা বোঝা, অনলাইনে কেনাকাটার প্রতি আস্থা তৈরি, লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন তৈরি করতে কিছু সমস্যা তো ছিলই।
প্রিয়.কম: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কী কী সমস্যা বাংলাদেশে রয়েছে? আপনি কীভাবে সেগুলো সমাধান করলেন?
দিদারুল আলম সানি: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা এবং আইডেশনের ওপরে ভিত্তি করে এক্সেকিউশন মডেল দাঁড় করানো। ব্যাংকগুলো নতুনদের ঋণ প্রদানে অনীহা, স্টার্টআপ ইকো সিস্টেমে সঠিক ফ্যাসিলেশনের অভাব এবং ঋণ গ্রহণে জটিলতার কারণে অনেক মেধাবী উদ্যোক্তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।
প্রিয়.কম: আপনি কাজের জন্য এই সেক্টরটিকেই কেন বেছে নিলেন?
দিদারুল আলম সানি: পণ্যের গুণগত মান ঠিক থাকলে পণ্য বিশ্বব্যাপী পৌঁছানো সম্ভব। তা ছাড়া বর্তমানে ই-কমার্সের ব্যাপ্তি অনেক বড়। এখানে একেবারে গ্রামে যেমন পণ্য সরবরাহ সম্ভব, তেমনি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ভোক্তার সন্তুষ্টি, চাহিদা এবং আস্থা অর্জন করতে পারলে এর পরিধি আমাদের দেশে অনেক বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। এই উপলব্ধি থেকেই আসলে আমি ই-কমার্স ব্যাবসা প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহিত হয়েছি।
প্রিয়.কম: আশানুরূপ সাড়া পেয়েছেন কী? সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
দিদারুল আলম সানি: বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ছয় কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইন্টারনেট ব্যাবহার করছে এবং আমরা রিসার্চ করে দেখেছি, অনলাইন ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৬০% থেকে ৭০% মানুষের অনলাইনে ক্রয় করার ক্ষমতা রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে একটি সম্ভাবনাময় মার্কেট তৈরি করা সম্ভব। আমি মনে করি, যদি আমরা এই ইন্ডাস্ট্রিকে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে দেই, তাহলে এটি ২০২৫ সালের মাঝে ৬-৭ হাজার কোটি টাকার মার্কেট হবে; যেখানে ১ কোটির বেশি লোকের কর্মসংস্থান হবে।
প্রিয়.কম: আপনাদের এখন পর্যন্ত কি ধরনের সফলতা এসেছে?
দিদারুল আলম সানি: বাংলাদেশের বৃহত্তম ও জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট এসো.কম প্রতিষ্ঠা করেছি। তা ছাড়া দেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থার একটি অন্যতম নাম অ্যাডঅন কমিউনিকেশনস-এর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং-এ কাজ করছি এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) ডিজিটাল মার্কেটিং ও কমার্সের স্থায়ী কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি।
প্রিয়.কম: আপনার অনুপ্রেরণা কে বা কারা?
দিদারুল আলম সানি: অনুপ্রেরণার কথা যদি বলি, সবার আগে যার নাম নিতে চাই তিনি হচ্ছেন সাব্বির হাসান নাসির। যার হাত ধরে ‘স্বপ্ন’ প্রকল্প আজ এতো বড় সফলতার মুখ দেখেছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ রিটেলের ল্যান্ডস্ক্যাপ পরিবর্তনে ওনার অবদান অসামান্য। এ ছাড়া অনুপ্রেরণার কথা বললে আমি জুনাইদ আহমেদ পলকের কথা বলব। বাংলাদেশের অজানা একটি সেক্টর আইসিটিকে তিনি দেশের সবার কাছে পৌঁছে দিয়ে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভীত স্থাপনে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
প্রিয়.কম: মূলধনের বিষয়ে কীভাবে সহায়তা পেয়েছেন, আপনার মার্কেটিং পলিসিই বা কেমন ছিল?
দিদারুল আলম সানি: আমি বিশ্বাস করি, একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনাই একটি উদ্যোগকে সাফল্য অর্জনে সহায়তা করে। আমরা যখন পরিকল্পনা করি, তখন আমরা যথাযথ গবেষণা, মার্কেটিং পলিসি, মার্কেট উন্নয়ন ইত্যাদি ধারণা নিয়ে আমাদের দেশের বিনিয়গকারীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করি এবং তারা আমাদের পরিকল্পনায় আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন। গ্রাহককে গুণগত মান অটুট রেখে সময় উপযোগী পণ্যের সেবা প্রদান করাই আসলে আমাদের মার্কেটিং পলিসি ছিল।
প্রিয়.কম: নতুন উদ্যোক্তাদের ভুলগুলো কোথায় হয়, আপনার কোনো পরামর্শ আছে তাদের জন্য?
দিদারুল আলম সানি: নতুন উদ্যোক্তারা সাধারণত যে ভুল করে থাকেন, তা হচ্ছে বিনা অভিজ্ঞতায় উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা। উদ্যোক্তা হওয়ার আগে কয়েক বছর মার্কেটে কাজ করে অভিজ্ঞতা নেওয়া ভালো এবং অবশ্যই বিশ্বাস রাখতে হবে। আমি যা স্বপ্ন দেখি, বাস্তবে তা রূপান্তরিত করা সম্ভব এবং এই রূপান্তরের অনুসাঙ্গিক সব বিষয়ের ওপরে নিজের কন্ট্রোল আছে। এ জন্য স্বপ্ন বাস্তবায়নের অনুকূলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে।
প্রিয় সংবাদ/শান্ত