পানির জন্য হাহাকার এক কৃষকের। ছবি: ম্যাগনিফিক
‘এল নিনো’: মহাসাগরে রেকর্ড তাপমাত্রা, আবহাওয়া ওলটপালট ও খাদ্য সংকটের শঙ্কা
আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৬
বিশ্বের মহাসাগরগুলো এ যাবৎকালের “উষ্ণতম জুন” মাস পার করেছে। একই সঙ্গে ক্রান্তীয় বা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে “এল নিনো” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি দ্রুত আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার পূর্বাভাস রয়েছে। এল নিনো ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের জোড়া ধাক্কায় বিশ্বের অনেক অংশে তীব্র দাবদাহ (হিটওয়েভ), খরা, ভারী বর্ষণ এবং চরম খাদ্য সংকটের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা একযোগে চরম সতর্কতা জারি করেছে।
মহাসাগরে রেকর্ড উত্তাপ: ‘অজানা ভবিষ্যতের’ পথে পৃথিবী
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোপারনিকাস মেরিন সার্ভিসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ২১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৬৯.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট), যা ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের একই মাসের আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
ইইউ-এর সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং মহাসাগরগুলোর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সামুদ্রিক দাবদাহের (মেরিন হিটওয়েভ) ব্যাপকতা লক্ষ্য করা গেছে। কোপারনিকাস মেরিন সার্ভিসের প্রধান সমুদ্রবিজ্ঞানী সাইমন ভ্যান গেনিপ বলেন, “এই পুরো সময়জুড়ে সামুদ্রিক দাবদাহ ক্রমশ প্রসারিত হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মহাসাগরের প্রায় ৮২ শতাংশ এলাকাজুড়ে প্রভাব ফেলেছে।”
ভ্যান গেনিপ আরও জানান, ভূমধ্যসাগর, উত্তর আটলান্টিকের মধ্যাঞ্চল এবং নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগর—এই সবগুলোই এখন উচ্চ তাপমাত্রার কেন্দ্র (হটস্পট) হয়ে উঠেছে। এসব অঞ্চলের পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, মহাসাগরগুলো এখন লাগাতার তাপীয় চাপের (থার্মাল স্ট্রেস) মধ্যে রয়েছে।
গত মাসে জাতিসংঘের একটি প্রধান বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে, বিশ্বের মহাসাগরগুলো “ক্রমবর্ধমান সংকটের” মধ্যে রয়েছে। কারণ সমুদ্রের পানি দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে এবং পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ঠিক সেই সতর্কবার্তার পরপরই কোপারনিকাসের এই প্রতিবেদনটি সামনে এলো। পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে মহাসাগরগুলো প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে মানবসৃষ্ট যে অতিরিক্ত তাপের সৃষ্টি হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশই মহাসাগর শুষে নেয়। কিন্তু সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হলে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা বেড়ে যায়, যা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় এবং ধ্বংসাত্মক বৃষ্টিপাত ঘটাতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এছাড়া পানি গরম হলে তা প্রসারিত হয়, যা সরাসরি সমুদ্রের পানির স্তর বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রবালপ্রাচীরগুলো (কোরাল রিফ) ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী সামুদ্রিক দাবদাহের কারণে প্রবালের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে (কোরাল ব্লিচিং) শেষ পর্যন্ত সেগুলো মারা যায়।

মহাসাগরে তাপমাত্রার রেকর্ড ছাড়িয়েছে চলতি বছরের জুন মাসে। গ্রাফিক্স এআইয়ের সাহায্যে তৈরি
সর্বশেষ এল নিনোর শেষ পর্যায়ে এসে ২০২৪ সালে স্থল ও সমুদ্রের তাপমাত্রা সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এবার নতুন করে এল নিনো শুরু হওয়ায় কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো একটি নতুন পর্যায়ের শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আমাদেরকে আবারও এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মহাসাগরের তাপমাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং সামনে যেহেতু এল নিনো শঙ্কা রয়েছে, তাই আগামী মাসগুলোতে আমরা আরও অনেক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙতে দেখতে পারি।”
দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো: ডব্লিউএমও-র সতর্কতা
৩ জুলাই এক সতর্ক বার্তায় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই এল নিনো পরিস্থিতি দ্রুত একটি শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন মডেলের যৌথ বিশ্লেষণ বলছে, মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে এবং উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রধান পর্যবেক্ষণ অঞ্চলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
উত্তর গোলার্ধে শরৎকালেও এল নিনো ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকবে এবং এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সময়ে নিরক্ষীয় আটলান্টিক অববাহিকার তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে।
ডব্লিউএমও-র সেক্রেটারি-জেনারেল সেলেস্টে সাউলো বলেন, “এল নিনো পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং এটি দ্রুত একটি শক্তিশালী ইভেন্টে রূপ নিতে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে জমিতে খরা ও তীব্র দাবদাহ এবং সমুদ্রে সামুদ্রিক দাবদাহের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।”
সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ডব্লিউএমও-র আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সমন্বয়, জলবায়ু তথ্য সেবা এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার পরিধি বাড়াচ্ছেন। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন দেশের সরকার, মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে (যেমন- কৃষি ও স্বাস্থ্য) পূর্বপ্রস্তুতি নিতে সহায়তা করা।
সেলেস্টে সাউলো আরও যোগ করেন, “উন্নত মৌসুমী পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কবার্তা মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং আমাদের অর্থনীতি ও সম্প্রদায়ের ওপর আঘাতের তীব্রতা কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
কোথায় কেমন প্রভাব: ভারতীয় উপমহাদেশে খরার শঙ্কা
এল নিনোর কারণে বিশ্বের সব অঞ্চলে সমান প্রভাব পড়ে না। ডব্লিউএমও-র বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পূর্বাভাসে অঞ্চলভিত্তিক কিছু সুনির্দিষ্ট চিত্র উঠে এসেছে।
তাপমাত্রার পূর্বাভাস: ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ থেকে ৬০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যকার প্রায় সব স্থলভাগেই—যা মেরু অঞ্চল বাদে বিশ্বের প্রায় সব জনবহুল এলাকাকে কভার করে, স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ভারত মহাসাগর এবং ক্রান্তীয় আটলান্টিকের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে।
কম বৃষ্টিপাত: ক্রান্তীয় ভারত মহাসাগর, ভারতীয় উপমহাদেশ (বাংলাদেশ ও ভারতসহ) এবং অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত বা খরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এদিকে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত ৭ বছরের মধ্যে চলতি বছরের জুনে সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। ফলে উষ্ণতাও বেড়েছে।
বেশি বৃষ্টিপাত: মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আফ্রিকায় গিনি উপসাগরের উত্তরের স্থলভাগ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপের দক্ষিণে বেশি এবং উত্তরে কম বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও সেখানে পূর্বাভাসের নির্ভুলতার হার কিছুটা কম।

এল নিনোর প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। গ্রাফিক্সটি এআইয়ের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।
কৃষিজমি ও চারণভূমিতে আঘাত: খাদ্য সংকটের অশনিসংকেত
বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক চরম সংকটময় মুহূর্তে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। বিশ্ব যখন রেকর্ড তাপমাত্রার মুখে, ঠিক তখনই এর আবির্ভাব ঘটছে। একইসঙ্গে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলে কৃষকরা যখন বীজ বপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে সারের বাজারও চরম অস্থির।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এল নিনো-সৃষ্ট খরা কোথায় কৃষিজমি ও চারণভূমিগুলোতে সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত হানবে, কিছু ক্ষেত্রে তা বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। “কৃষিজ খরা” (যখন মাটির আর্দ্রতা ফসল বা গবাদি পশু টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয় স্তরের নিচে নেমে যায়) হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে সাহেল অঞ্চল, সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য আমেরিকার “ড্রাই করিডোর” ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে। আগামী মাসগুলোতে এসব এলাকার কোনো কোনো জায়গায় খরা হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশেরও বেশি।
এমনিতেই অনেক এলাকার কৃষকরা অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, তীব্র দাবদাহ, অনুর্বর মাটি, সংঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধার কারণে খাদের কিনারায় রয়েছেন। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও সারের দাম, জাতীয় বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক সহায়তা হ্রাসের কারণে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কয়েকটি অঞ্চল যেহেতু চাল ও অন্যান্য প্রধান খাদ্যশস্যের বড় জোগানদাতা, তাই ওই সব অঞ্চলের স্থানীয় খরা বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইতিহাস ঘাঁটলে এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফিলিপাইনে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোর কারণে চাল উৎপাদন ২৭ শতাংশ এবং ভুট্টা উৎপাদন ৪৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় সেখানে প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার টন ফসলের ক্ষতি হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল ৩২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বিশ্বব্যাপী একই চক্রের কারণে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ চরম সংকটে পড়েছিল এবং ২৩টি দেশে ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।
তবে এফওএ বলছে, ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের গাছপালার ওপর আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের তথ্য এবং উচ্চ-রেজ্যুলেশনের জিওস্প্যাশিয়াল ম্যাপিংয়ের সাহায্যে এখন সহজেই বোঝা সম্ভব কোথায় ফসলের ক্ষতি শুরু হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। এই আগাম সতর্কবার্তার অর্থ হলো-কৃষকরা চাইলে বীজ বপনে দেরি করতে পারবেন, দুষ্প্রাপ্য বীজ জমিয়ে রাখতে পারবেন, খরা-সহনশীল ফসলের জাত বেছে নিতে পারবেন অথবা সংকট শুরুর আগেই গবাদি পশু চলাচলের রুটে পানির উৎসগুলো সুরক্ষিত করতে পারবেন। পাশাপাশি সরকার ও উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো চারদিকে অল্প করে সম্পদ না ছড়িয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সেচ ও অর্থ সহায়তা কেন্দ্রীভূত করতে পারবে।
এল নিনো কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে
এল নিনো হলো প্রাকৃতিকভাবে ঘটে চলা “এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন” বা (এনসো) নামক জলবায়ু চক্রের একটি উষ্ণ দশা। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওঠা-নামা এবং এর ওপরের বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এল নিনোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো- এ সময় মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ তাপমাত্রা মানেই এল নিনো পরিস্থিতি; আর এমনটা তখন ঘটে, যখন পুবালি আয়ন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণত একটি এল নিনো দশা ১৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এই নামটির উৎপত্তি মূলত পেরুর জেলে ও নাবিকদের কাছ থেকে। তারা প্রশান্ত মহাসাগরের এই উষ্ণ স্রোত লক্ষ্য করেছিলেন, যার প্রভাবে মাছের দেখাও কম মিলত। এই উষ্ণ স্রোতটি সাধারণত বড়দিনের (ক্রিসমাস) সময় বেশি নজরে আসত বলে তারা এর নাম দিয়েছিলেন “এল নিনো” (স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ “যিশু শিশু” বা দ্য ক্রাইস্ট চাইল্ড)।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর এই দশাটির পরিবর্তন হয়। এল নিনো মূলত মার্চ থেকে জুনের মধ্যে তৈরি হতে শুরু করে এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়।
প্রতিটি এল নিনোর প্রভাব নির্ভর করে এর তীব্রতা, স্থায়িত্ব, বছরের কোন সময়ে এটি তৈরি হচ্ছে এবং অন্যান্য জলবায়ু নিয়ামকের (যেমন- ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল) সাথে এটি কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে তার ওপর। এর প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলে সমানভাবে পড়ে না; এমনকি একই অঞ্চলের ভেতরেও প্রভাবের ভিন্নতা থাকতে পারে।
যেকোনো এল নিনো ইভেন্টের “তীব্রতা” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি কি দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী, নাকি অতি-শক্তিশালী। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে কখনোই “সুপার এল নিনো” শব্দটি ব্যবহার করে না।
বর্তমানে উন্নত আবহাওয়া মডেলের সাহায্যে এক থেকে ছয় মাস আগেই এল নিনো ও জলবায়ুর ধরন সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। ভারী বৃষ্টিপাত (যা বন্যার কারণ হতে পারে) ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে এই পূর্বাভাসগুলো কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোতে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে। একইসাথে, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি জরুরি প্রটোকল চালু করতে এবং মানবিক সহায়তা আগাম মজুত রাখতেও এটি ভূমিকা রাখে।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ২০২৩-২০২৪ সালে একটি শক্তিশালী এল নিনো দশা দেখা দিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত ডব্লিউএমও-র “গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট” নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়: সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, যা ২০২৬ সালের জুন-জুলাই-আগস্টের মধ্যেই আবারও এল নিনো দশা ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
১৯৮০-এর দশক থেকে এল নিনো পরিমাপ ও শনাক্তকরণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে “ওশেনিক নিনো ইনডেক্স”-এর ব্যবহার হয়ে আসছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের “নিনো ৩.৪” নামক একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার বিচ্যুতি হিসাব করেন। তিন মাসের গড় হিসাব করে এই ইনডেক্স তৈরি হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে “রিলেটিভ ওশেনিক নিনো ইনডেক্স” নামে নতুন আরেকটি পরিমাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি কেবল পরম উষ্ণতা নয়, বরং আপেক্ষিক উষ্ণতা মাপে। এর ফলে মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিটি আসলেই এল নিনোর কারণে নাকি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ঘটছে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সুবিধা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
জলবায়ু ও আবহাওয়ার ধরন নির্ধারণে “এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন” বা (এনসো) একটি বড় কারণ। ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের শুরু পর্যন্ত পর পর কয়েক বছর লা নিনা স্থায়ী হয়েছিল। এরপর ২০২৩-২০২৪ সালে দেখা দেয় শক্তিশালী এল নিনো। এর সবচেয়ে তীব্র প্রভাব দেখা যায় এটি তৈরি হওয়ার পরের বছরটিতে। মূলত ২০২৩-২০২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনো এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।
এল নিনোর প্রভাবে যেমন দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ, পূর্ব আফ্রিকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দেয়; তেমনি মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা কমে যাওয়ায় পূর্ব ও উত্তর অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে দেখা দেয় তীব্র খরা। সময় ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। যেমন—এল নিনোর কারণে পূর্ব আফ্রিকায় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে “শর্ট রেইন” বা স্বল্পস্থায়ী বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বৃষ্টিপাত হয়। আবার একই এল নিনোর কারণে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অঞ্চলের উত্তরাংশে (সুদান, দক্ষিণ সুদান, ইথিওপিয়া এবং পশ্চিম কেনিয়া) বৃষ্টিপাত বাধাপ্রাপ্ত হয় বা খরা দেখা দেয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনো বারবার ফিরে আসছে বা এর তীব্রতা বাড়ছে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল এমনিতেই উষ্ণ হয়ে থাকায় এল নিনোর ধ্বংসাত্মক প্রভাব এখন বহুগুণে বেড়ে গেছে। ফলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া যেমন- তীব্র দাবদাহ, খরা ও ভারী বর্ষণের শঙ্কা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে পৃথিবীকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, বিবিসি, রয়টার্স, আল-জাজিরা, গার্ডিয়ান