স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া ৬ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক

ভোটের বদলে ৬ সিটিতে রাজনৈতিক প্রশাসক: সেবার অজুহাত নাকি মাঠ দখলের কৌশল?

এস এম রিয়াদ রহমান
প্রিয় নিউজ
প্রকাশিত: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৮
আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৮

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনপ্রতিনিধিশূন্য সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচনের বদলে এবার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বলছে, আমলাদের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই নাগরিকদের ভালো সেবা দিতে পারবেন। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, আইনি জটিলতার অজুহাতে নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে মূলত দলীয় নেতাদের মাধ্যমে ভোটের মাঠ গোছানোর কৌশল নিয়েছে সরকার।

এদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রামসহ দেশের সিটি করপোরেশনগুলোতে কবে ভোট হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ এখনও দিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয় প্রতীকে হবে—সেই আইনি সুরাহার জন্য আগামী ১২ তারিখের সংসদ অধিবেশনের দিকে তাকিয়ে আছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।

রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি অবস্থান

জাতীয় নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা থাকলেও গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর-দক্ষিণসহ ৬টি সিটি করপোরেশনে সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপি নেতাদের ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, “দলীয় পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং এটি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।”

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, “দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক ভোগান্তি চরমে। আইনি বাধ্যবাধকতার সময়ও পার হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় দ্রুত নির্বাচন দরকার।”

দলটির অভিযোগ, সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে ক্ষমতাসীনদের ভোটের অবস্থান সংহত করতেই এই বিলম্ব এবং প্রশাসক নিয়োগের কৌশল নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের ইঙ্গিতও দিয়েছে দলটি।

তবে বিরোধীদের এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “রাজনৈতিক প্রশাসকরা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে সেবা নিশ্চিত করতে পারেন। সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে তারা জনদুর্ভোগ লাঘবে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলেই তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে এবং যেটির মেয়াদ আগে শেষ হয়েছে, সেখানে আগে নির্বাচন হবে।

প্রেক্ষাপট ও নাগরিক ভোগান্তি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকার-ব্যবস্থায় বড় ধরনের রদবদল হয়। ১৯ আগস্ট ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানে বসানো হয় সরকারি কর্মকর্তাদের।

প্রথমে অতিরিক্ত সচিব ও বিভাগীয় কমিশনারদের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকায় আগে যেখানে ওয়ার্ড কাউন্সিলররা স্থানীয় বিবাদ মীমাংসা বা সনদ দিতেন, সেখানে মাত্র ২০ জন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঢাকার ১২৬টি ওয়ার্ড সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন থেকে শুরু করে ওয়ারিশ সনদ পেতে নাগরিকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। 

নিয়োগ পাওয়া ৬ প্রশাসক

আইনি জটিলতা ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিটি করপোরেশন

আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের (২০২৫) ১ জুন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২ জুন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা। আইনের ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতাও লঙ্ঘিত হচ্ছে। দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে।’’

এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার আইন করেছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ সংশোধন করে তা নির্দলীয় করার পথ তৈরি করে। এখন বর্তমান সরকার কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। পাশাপাশি সীমানা জটিলতা বা মামলার কারণে আটকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাও হালনাগাদ করা হচ্ছে।

কী বলছে নির্বাচন কমিশন?

গত ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো আলাদা চিঠিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটিতে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারাউল ইসলাম বলেন, “আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। কিছু আইন-কানুন ও প্রতীকের বিষয় আছে। সব মিলিয়ে কাজগুলো গুছিয়ে আনতে হবে।”

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ প্রিয় নিউজকে বলেন, “শীঘ্রই আমরা স্থানীয় সরকারের শূন্য আসনগুলোতে নির্বাচন করব ইনশাআল্লাহ। আগামী ১২ তারিখে সংসদ অধিবেশন বসবে, এরপরই আমরা এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। আইনটি চূড়ান্ত হওয়ার পর আমরা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করব।”

দলীয় ব্যক্তিকে প্রশাসক নিয়োগ এবং নির্বাচনে পক্ষপাতের আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে এই কমিশনার বলেন, “কাকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে, তা সরকারের নিজস্ব এখতিয়ার। যিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, তা সময় হলেই দেখা যাবে। তবে নির্বাচনের সময় সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন।”

প্রয়োজনে পরিস্থিতি বুঝে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।