স্পেনের লোকগল্প: মৌমাছির জন্ম হলো

স্পেনের লোকগল্প: মৌমাছির জন্ম হলো

তুহিন তালুকদার
অনুবাদক
প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৫৭
আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৫৭

অনেক অনেক কাল আগের কথা, পৃথিবীটা তখনও অনেক নবীন। এখন স্পেন বলতে আমরা যে দেশটাকে চিনি, তার দক্ষিণের অংশটা ছিল পর্বতে ঘেরা। তেমনই এক পর্বতের দুই পাশে ছিল দুই গ্রাম। দুই গ্রামের কেউই পর্বতের উপরে চড়েনি। এর অন্যপাশে কী আছে ভাবতেও যায়নি। তারা নিজেদের মতো থাকত। অনেক বছর পর্যন্ত তাদের কেউ জানতেই পারেনি, পর্বতের অন্যপাশে আরেকটা গ্রাম আছে।

একদিন এক জ্ঞানী লোক সেই পর্বতের পথে চলছিলেন। তার মধ্যে নতুন কিছু দেখার কৌতূহল ছিল। এবারও নতুন কিছু দেখবেন তেমনই আশা ছিল। তিনি যেহেতু জ্ঞানী ছিলেন, তাই জানতেন নতুন নতুন জায়গায় গেলে নতুন কিছু জানা যায়। তিনি আগে পর্বতের পূর্বপাশের গ্রামটায় গেলেন। সেখানে সবাই হলুদ রঙের পোশাক পরে ছিল- হলুদ প্যান্ট, হলুদ জামা, হলুদ টুপি, হলুদ জুতা, হলুদ ফিতা, সবই হলুদ। তাদের পতাকা হলুদ, বাগানে যে ফুলগুলো ফুটে আছে সেগুলোও হলুদ। ঘরবাড়ি, পাঠশালা, রাস্তাঘাট, থালা বাসন, পেয়ালা সবকিছুর রঙ হলুদ। তিনি দেখলেন, তারা হয় গান গাইছে নয়তো গানের সাথে কোনো বাদ্য বাজাচ্ছে, নয়তো নাচছে।

জ্ঞানী লোকটি গ্রামটায় কিছুদিন থাকলেন আর গ্রামের লোকদের খেয়াল করলেন। শিগগিরই তিনি বুঝতে পারলেন, এই গ্রামে প্রতিটা দিনই আসলে ছুটির দিন, প্রতিটা মুহূর্তই আসলে উৎসবের মুহূর্ত। সকাল থেকে শুরু করে সবাই গভীর রাত পর্যন্ত নাচগান করে। নেচে গেয়ে হেসে খেলে দিন পার করে দেয়। এক ফোঁটা কাজও কেউ করে না।

এভাবে অনেকদিন পার হয়ে যাওয়ার পর জ্ঞানী লোকটি তাদের সবাইকে ডাকলেন। জানতে চাইলেন, তারা সবাই সুখী কি না। ‘সুখী?’ তারা জিজ্ঞেস করল, ‘সেটা আবার কী জিনিস? আমরা সারাদিন নাচগানে ব্যস্ত থাকি। এসব নিয়ে ভাবার সময় পাই না।’

জ্ঞানী লোকটি তাদের কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি পর্বতের পশ্চিমের গ্রামটা ঘুরে দেখতে গেলেন। সেখানে দেখলেন, সবাই কালো পোশাক পরে আছে- কালো প্যান্ট, কালো জামা, কালো টুপি, কালো জুতা, কালো ফিতা, সবই কালো। তাদের পতাকা কালো, বাগানে কোনো ফুলও নেই। তাদের থালা বাসন, পেয়ালা, ঘরবাড়ি, পাঠশালা, রাস্তাঘাট এমনকি মাটিও কালো। সে গ্রামের লোকগুলো সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত। কেউ হাতুড়ি নিয়ে কাজ করছে তো কেউ কাঠ কাটছে; কেউ ঝাড়ু দিচ্ছে তো কেউ রান্না করছে।

জ্ঞানী লোকটি এই গ্রামটায় কিছুদিন থেকে গ্রামের লোকদের খেয়াল করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই গ্রামে আসলে প্রতিটা দিনই কাজের দিন। প্রতিটা মুহূর্তই তাদের কাছে কাজের সময়। সবাই সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত শুধু কাজই করে। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বা আনন্দ করার জন্য তারা একটুও থামে না। ছুটির দিন বলে তাদের কাছে কোনো দিন নেই।

এই গ্রামেও জ্ঞানী লোকটি অনেকদিন পার করলেন। তারপর একদিন তাদের সবাইকে ডাকলেন। জানতে চাইলেন, তারা সবাই সুখী কি না। ‘সুখী?’ তারাও বলল, ‘সেটা আবার কী জিনিস? আমরা সারাদিন কাজে কর্মে ব্যস্ত থাকি। এসব নিয়ে ভাবার সময় পাই না।’

জ্ঞানী লোকটি তাদেরও কোনো উত্তর দিলেন না। ভাবার জন্য তিনি পর্বতের উপরে গেলেন। অনেক ধরনের বিদ্যা জানা ছিল তার, জাদুমন্ত্রও জানা ছিল। তিনি চাইলেন, দুই গ্রামের মানুষই কাজ আর উৎসবের পাশাপাশি সুখী হতে শিখুক। বসে বসে তিনি অনেক ভাবলেন। তারপর একটা বুদ্ধি বের করলেন।

তিনি দ্রুত পশ্চিমের গ্রামটায় গেলেন।

‘সিনোর ও সেনিওরা’*, তিনি বললেন, ‘আগামীকাল সকালে আপনারা সবাই পর্বতটার উপরে চলে আসুন। সেখানে করার মতো অনেক কাজ পড়ে আছে।’

কাজের নাম শুনে সেই গ্রামের লোকজন আগ্রহী হয়ে উঠল। ‘কাজ? আমরা তাহলে সকাল সকাল সেখানে পৌঁছে যাবো।’

তারপর জ্ঞানী লোকটি পূর্বের গ্রামটিতে গেলেন; যেখানে সবাই হলুদ জামা পরে আর নাচে গানে ডুবে থাকে।

সেখানেও একইভাবে বললেন, ‘সিনোর ও সেনিওরা, আগামীকাল সকালে আপনারা সবাই ঐ পর্বতের উপরে চলে আসুন। সেখানে আমি একটা উৎসবের আয়োজন করেছি।’

উৎসবের কথা শুনে গ্রামের লোকজন আগ্রহী হয়ে উঠল। ‘উৎসব? আমরা তাহলে সকাল সকাল সেখানে পৌঁছে যাবো।’

পরদিন সকালে সূর্য উঠল। জ্ঞানী লোকটি পর্বতের উপরে বসে সবার আসার অপেক্ষা করছিলেন। শিগগিরই তিনি শুনলেন গাইতে গাইতে একদল লোক আসছে। তিনি পূর্বদিকে তাকালেন। দেখলেন, হলুদ পোশাক পরা লোকজন পর্বতের উপরে উঠে আসছে। পরের মুহূর্তেই তিনি শুনতে পেলেন ঝনঝন শব্দ তুলে একদল লোক এগিয়ে আসছে। তিনি পশ্চিমদিকে তাকালেন। দেখলেন, কালো পোশাক পরা লোকজন উঠে আসছে। তাদের সাথে ছিল কাজের যন্ত্রপাতি, ওগুলোর শব্দই শোনা যাচ্ছে।

পূর্বদিকের গ্রামের লোকেরা পর্বতের উপরে চলে এলো। পশ্চিমের গ্রামের কালো পোশাক পরা লোকেরাও পৌঁছে গেল। আর যেই না তাদের একদল আরেকদলকে দেখল, তারা চেঁচাতে শুরু করে দিল। হলুদ পোশাকের লোকেরা চিৎকার করে বলল, ‘আমরা নাচগান করতে চাই। তোমরা উৎসবটাই মাটি করে দেবে। ভাগো এখান থেকে।’

কালো পোশাকের লোকেরা হাতের মুঠি পাকিয়ে তেড়ে এলো। ‘অকর্মার দল!’ তারা চিৎকার করে উঠল, ‘তোমাদের গান বাজনা তোমাদের মতই অখাদ্য। আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি।’

দুই গ্রামের লোকেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। জ্ঞানী লোকটি কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর হাত তুলে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলেন। ‘সবাই শুনুন!’ বলেই তিনি তার সবচেয়ে শক্তিশালী জাদুমন্ত্রটি উচ্চারণ করলেন। মন্ত্রটি কী ছিল, আজ আর তা কেউ জানে না। এতদিন পরে লোকজন তা ভুলে গেছে। মন্ত্র উচ্চারণের সাথে সাথে হলুদ পোশাক পরা লোকগুলোর পোশাকের রঙ বদলে কালো আর হলুদের ডোরাকাটা হয়ে গেল। আর কালো পোশাক পরা লোকেদের পোশাকের রঙ বদলে হলুদ আর কালো ডোরায় পরিণত হল।

তারা সবাই যার যার গ্রামে ফিরে এলো। এরপর থেকে কেউ আর সারাদিন কাজ করতে চাইত না। কেউ আর দিনরাত নাচে গানে মেতে থাকতে চাইত না। তার বদলে, তারা একটা নিয়মের মধ্যে চলে এলো। যখন আকাশে সূর্য থাকে, তারা তাদের জমি চাষ করে, ক্ষেতে বাগানে কাজ করে, ঘরবাড়ি বানায়। ঘরদোর পরিষ্কার, রান্নাবান্নাও এই সময়ের মধ্যেই করে। আর যখন সূর্য ডুবে যায়, তখন তারা কাজ থামিয়ে দেয়। লণ্ঠনের আলো জ্বালিয়ে সবাই একসাথে জড়ো হয়ে নাচ গান করে, আনন্দ ফূর্তি করে।

‘তোমরা কি এখন সুখী?’ জ্ঞানী লোকটি দুই গ্রামের মানুষের কাছেই জানতে চাইলেন।

‘হ্যাঁ!’, তারা জবাব দিল। ‘আমরা আমাদের কাজকেও ভালোবাসি, আবার নাচ গানেও আনন্দ পাই।’

তারপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল। আর জাদুর শক্তিও কমে আসতে লাগল। আস্তে আস্তে লোকগুলো আকারে ছোট হয়ে যেতে থাকল। তারা আর গ্রামে থাকল না। পর্বতের গায়ে ছোট ছোট ঢিবি বানিয়ে তারমধ্যে থাকতে শুরু করলো। তারা ছোট ছোট প্রাণীতে পরিণত হল। এদেরকেই আমরা এখন মৌমাছি বলি।

জ্ঞানী লোকটি সেই জাদুমন্ত্র উচ্চারণ করার আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো মৌমাছি ছিল না। কিন্তু পর্বতের উপরে লোকগুলোকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে পৃথিবীতে মৌমাছির ঝাঁক দেখা গেল। মৌমাছিরাই হচ্ছে সেই হলুদ কালো ডোরাকাটা শরীরের প্রাণী, যারা কাজের সাথে আনন্দকে মিলিয়ে নিতে পারে।

----------------------------------------------------------------

* স্প্যানিশ ভাষায় - ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ

আরো পড়ুন