ভয়ঙ্কর তাপ এড়িয়ে কীভাবে সূর্যের কাছে যাবে এই মহাকাশযান

আবু আজাদ
সহ-সম্পাদক
ভয়ঙ্কর তাপ এড়িয়ে কীভাবে সূর্যের কাছে যাবে এই মহাকাশযান

গ্রাফিক্সে সূর্যের কাছাকাছি মহাকাশ যান পার্কার সোলার প্রোব। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) সূর্যের রহস্যভেদের এক মিশন নিয়ে পার্কার সোলার প্রোব নামে একটি উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা।

১২ আগস্ট, রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ‘প্রোব’ কে উৎক্ষেপণ করা হয়।

বিবিসি বাংলার খবরে জানানো হয়, রকেটটি উৎক্ষেপণ করার কথা ছিল ১১ আগস্ট, শনিবার সকালে। কিন্তু শেষ মুহূ্র্তে বাড়তি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তা ১৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়।

উপগ্রহটি সূর্যের ৬০ লাখ কিলোমিটারের মধ্যে গিয়ে পৌঁছাবে এবং সূর্যের এত কাছাকাছি এর আগে কোনো যানই যেতে পারেনি।

সূর্যের যে উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার অংশটি সূর্যগ্রহণের সময় দেখা যায়, যাকে বলে ‘করোনা’, এই যানটি তার ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে। বলা হচ্ছে, এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপ সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে প্রোবের।

অবিশ্বাস্য গতির নভোযান

সাত বছর ধরে সূর্যের চারদিকে ২৪ বার প্রদক্ষিণ করবে এই স্যাটেলাইট। সে সময় রকেটটির গতি হবে ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬ লাখ ৭০ হাজার কিলোমিটার। ৬০ লাখ কিলোমিটার দূর থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকবে।

এই প্রকল্পের অন্যতম বিজ্ঞানী ড. নিকি ফক্স বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, ৬০ লাখ কিলোমিটার দূরত্বকে কখনোই নিকট দূরত্ব বলে মনে হবে না। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া হয় ভূপৃষ্ঠ এবং সূর্যের দূরত্ব এক মিটার, তাহলে প্রোব সূর্য থেকে মাত্র ৪ সেন্টিমিটার দূরে থাকবে।’

প্রোব যে গতিতে চলবে তা নজিরবিহীন। ড. ফক্স বলেন, ‘এত দ্রুতগতির কোনো কিছু আগে তৈরি হয়নি। সূর্যের চারদিকে এটি প্রতি ঘণ্টায় ৬ লাখ ৯০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে ঘুরবে। অর্থাৎ, এই গতিতে নিউইয়র্ক থেকে টোকিও যেতে লাগবে এক মিনিটেরও কম সময়।’

বলা হচ্ছে, মনুষ্যবিহীন এই নভোযান, যা একটি স্যাটেলাইটের মতো কাজ করবে, এটি সূর্যের যতটা কাছে যাবে, এর আগে মানুষের তৈরি কোনো যান এত কাছে যায়নি।

সূর্যের চারদিকে উজ্জ্বল আভাযুক্ত যে এলাকা, যেটি ‘করোনা’ নামে পরিচিত, সরাসরি সেখানে গিয়ে ঢুকবে এই স্যাটেলাইট। তারপর সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করতে করতে বোঝার চেষ্টা করবে এই নক্ষত্রের আচরণ।

কেন এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ?

সূর্য কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে সাহায্য করবে পার্কার নামের এই উপগ্রহ।

সূর্য তার বৈদ্যুতিক বিভিন্ন কণা ও চৌম্বক শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে সবসময় প্রভাবিত করছে। এই ‘সোলার উইন্ড’ বা সূর্য থেকে নিঃসরিত বাতাসের প্রভাবে উত্তর মেরুর আকাশে তৈরি হয় অদ্ভুত সুন্দর রংচঙে আলোর খেলা।

রবিবার সকালে মহাকাশ যানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
রবিবার সকালে মহাকাশ যানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। ছবি: বিবিসি

কিন্তু সূর্যের কিছু প্রবাহ পৃথিবীর চৌম্বক শক্তির ভারসাম্য বিঘ্নিত করে ফেলতে পারে। সে ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে, মহাকাশে স্যাটেলাইটগুলো কক্ষচ্যুত হতে পারে, এমনকি বৈদ্যুতিক গ্রিড বিকল হয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা সেই সব বিপদ আগে থেকে বোঝার চেষ্টা করছেন। পার্কার আগাম তথ্য দিয়ে এ কাজে দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে।

কেন সূর্যের এত কাছাকাছি যাওয়া দরকার?

করোনা বা সূর্যের চারদিকের উজ্জ্বল আভাযুক্ত যে এলাকা, সেটির অদ্ভুত আচরণ বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য।

সূর্যপৃষ্ঠের চেয়ে করোনার তাপমাত্রা বেশি। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেখানে ৬ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো, করোনা অঞ্চলের তাপমাত্রা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি হতে পারে।

কেন এই ফারাক, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। এ ছাড়া, সূর্য থেকে নিঃসরিত বাতাস যখন করোনায় প্রবেশ করে, তখন তার গতি হঠাৎ তীব্রভাবে বেড়ে যায়। এই গরম বাতাস তখন প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ কিলোমিটার বেগে সোলার সিস্টেমের ভেতর দিয়ে ধেয়ে চলে।

পার্কার করেনার বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রের বিভিন্ন তথ্য পাঠাতে সক্ষম হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

কীভাবে টিকে থাকবে পার্কার

প্রায় ৬০ বছর আগে প্রথম সূর্যের কাছাকাছি নভোযান পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সূর্যের কাছে পাঠানোর জন্য যে ধরনের নভোযান তৈরির প্রয়োজন, সেই প্রযুক্তি এতদিন পরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পেরেছেন।

সৌরচালিত এই নভোযানের যন্ত্রপাতি থাকবে ৪.৫ ইঞ্চি পুরু কম্পোজিট কার্বনের আবরণে দিয়ে মোড়া। ফলে ভেতরের তাপমাত্রা সবসময় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভেতরে থাকবে। রক্ষা পাবে ভেতরের যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটার।

প্রিয় সংবাদ/আজহার