ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞানকে জয়ের লড়াইয়ে হাজারো শিক্ষার্থী

techadmin
লেখক
প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০১২, ০৫:৫০
আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০১২, ০৫:৫০

(প্রিয় টেক) শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তিনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়তে বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে 'বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০১২' থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিজ্ঞানকে ভালোবাসা আর ভয়কে জয় করার শক্তি সঞ্চয় করেছে। গতকাল দেশের ১৪টি স্থানে একসঙ্গে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আগামী দিনের কুদরাত-ই-খুদা, সত্যেন বোস, জগদীশ চন্দ্র বসুকে খুঁজে পাওয়ার লড়াইয়ে নামে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতের জটিল সব সমস্যার সমাধান প্রশ্নোত্তরে খুঁজে বের করেছে বিজ্ঞানের তরুণ তুর্কিরা। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালেই সমাবেশ, জাতীয় সঙ্গীত এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে ১৪টি ভেন্যুতে একযোগে অলিম্পিয়াডের সূচনা হয়।

প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও হাজার হাজার বিজ্ঞান অনুরাগী কিশোর-কিশোরী দূর-দূরান্ত থেকে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে জড়ো হয়। শেষ পর্যন্ত মেধা আর যোগ্যতারই জয় হয়েছে। ১৪টি স্থানে পাঁচ শতাধিক বিজয়ীকে নিয়ে আগামী ২৭ জানুয়ারি ঢাকার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় পর্বের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। বিজ্ঞান একাডেমী ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে স্কুল-কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থী। তাদের ভাষায় নিজেকে বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তোলা, নিজের বিজ্ঞানজ্ঞান যাচাই করে নেওয়া এবং বড় হয়ে একজন বিজ্ঞানী হওয়ার ক্ষেত্রে এমন আয়োজনে অংশগ্রহণ বিশেষ প্রেরণাদায়ক। নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি দূর হবে বলেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা। সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড, প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক-ইউসিবির সহযোগিতায় এ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ, মাতামুহুরী ডিগ্রি কলেজ, খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, বিএসএমআর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিগরাজ ডিগ্রি কলেজে একযোগে গতকাল এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। দুটি পর্যায়ে এ প্রতিযোগিতা হচ্ছে। একটি এসএসসি পর্যায়ে, অন্যটি এইচএসসি পর্যায়ে। নটরডেম কলেজ: ঢাকার নটর ডেম কলেজে বেলুন উড়িয়ে যৌথভাবে অলিম্পিয়াডের উদ্বোধন করেন কলেজ অধ্যক্ষ ফাদার বকুল এস রোজারিও, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মেজবাহউদ্দিন খান, সমকালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, নটর ডেম বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি সুশান্ত কুমার সরকার। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেজবাহউদ্দিন খান বলেন, শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বিজ্ঞানকে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। বিজ্ঞান আমাদের মেধা বিকাশ, সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। গত কয়েক বছরে বিজ্ঞানের প্রতি তরুণদের আগ্রহ ব্যাপকভাবে কমছে। এটা আতঙ্কিত হওয়ার বিষয়। শুভেচ্ছা বক্তব্যে আবু সাঈদ খান বলেন, বিজ্ঞানের পুঁথিগত শিক্ষায় আবদ্ধ না থেকে এর মধ্যে প্রাণের যোগ করতে হবে। তিনি বলেন, এ অলিম্পিয়াডের মধ্যে দিয়ে সারাদেশে বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে। তরুণদের মধ্য থেকেই উঠে আসবে আগামী দিনের সত্যেন বোস, জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানী। ফাদার বকুল এস গোমেজ স্বাগত বক্তব্যে বলেন, পৃথিবীতে যে উত্থান ঘটেছে তার পেছনে আছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের প্রসারের মাধ্যমে যুক্তিনির্ভর ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ইম্পিরিয়াল কলেজ: ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজে সাড়ে পাঁচ'শ প্রতিযোগীর বিশেষ জ্ঞানের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে ৫০ জনের। এদের ১২ জনকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়। সকালে জমজমাট আয়োজনের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর সেক্রেটারি অধ্যাপক ড. নঈম চৌধুরী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সমকালের যুগ্ম সম্পাদক রাশীদ উন নবী এবং একাডেমীর পরিচালক অধ্যাপক ড. এমএ মাজেদ। আরও বক্তব্য রাখেন ইম্পেরিয়াল কলেজের সহকারী অধ্যাপক অনিল চন্দ্র নাথ। সভাপতিত্ব করেন কলেজের বিভাগীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড-২০১২ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মৃধা। উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য সচিব ও কলেজের প্রভাষক নাদির হোসেন, সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদসহ কলেজের শিক্ষকরা। অধ্যাপক নঈম চৌধুরী ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে বলেন, এখান থেকেই একদিন বড় বিজ্ঞানী তৈরি হবে। দেশের সত্যিকার উন্নয়নের জন্যই বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, প্রতি জেলায় বিজ্ঞান একাডেমীর শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেখানে নিয়মিত বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হবে। সমকালের যুগ্ম সম্পাদক রাশীদ উন নবী বলেন, দেশের সত্যিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এখন থেকেই স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান মনস্কতার দিকে ধাবিত করতে হবে। সামগ্রিকভাবে এ প্রয়াস আরও জোরদার করতে হবে। দেশের ৬৪ জেলায় এ ধরনের কর্মসূচি পালনে সমকালের সুহৃদ সমাবেশ সব সময় বিজ্ঞান একডেমীর পাশে থাকবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞান মনস্কতা সৃষ্টিতে বিজ্ঞান একাডেমীর পাশে থেকে সমকাল সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে মাত্র। তিনি বলেন, শুধু রিপোর্ট আর লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে একটি পত্রিকার দায়িত্ব শেষ হয় না, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি পত্রিকার আরও কিছু কাজ করার থাকে। সমকাল সে দায়িত্বই পালন করছে। অধ্যাপক এমএ মাজেদ বলেন, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মূল লক্ষ্য। বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়: এখানে অংশ নেয় ১২টি স্কুল ও ৭টি কলেজের শিক্ষার্থীরা। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান ও সমকালের সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত। উদ্বোধনী পর্বে আরও উপস্থিত ছিলেন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আজাহার উদ্দিন আহমেদ, শিক্ষক এমারত হোসেন মিয়া, নিউ গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষক আলমগীর হোসেন প্রমুখ। অধ্যাপক হাসিনা খান বলেন, বিজ্ঞানকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মধ্যে। অলিম্পিয়াড আয়োজন এক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি ছাড়া দেশের অগ্রগতি খুব কঠিন। উদ্বোধনী পর্বের আগে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আজাহার উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। তবেই তারা জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের জানার আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করি। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ: এখানে ৪৪৫ শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতার লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে স্কুল শাখার ৩৭ ও কলেজ শাখার ৯ জন শিক্ষার্থী বিজয়ী হয়েছে। এদের মধ্য থেকে ১০ শিক্ষার্থীকে মেডেল দেওয়া হয়। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. খসরু মিয়ার উপস্থাপানায় বিজয়ীদের মেডেল প্রদান করেন সমকালের বিজ্ঞানভিত্তিক পাতা 'কালস্রোত'র বিভাগীয় সম্পাদক আসিফ। এর আগে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মী সোহেল সামাদের উপস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ সময় শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন বিজ্ঞান বক্তা আসিফ। গতকাল পরীক্ষা শুরুর আগে সকাল ৯টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপদেশমূলক বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর ফেলো অধ্যাপক মেজবাউদ্দ��ন আহমদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক্স ও তড়িৎ কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল মান্নান, সমকালের সহযোগী সম্পাদক কবি নাসির আহমেদ, কেন্দ্রের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. খসরু মিয়া প্রমুখ। সৌজন্যে সমকাল