ছবি সংগৃহীত
পবিত্র কোরআনের শানে নুজুল কী এবং তা জানা প্রয়োজন কেন!
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০১৫, ০২:৫০
কোরআনুল কারিমের আয়াত দুই ধরনের। একশ্রেণির আয়াতকে আল্লাহ তাআলা নিজের পক্ষ থেকে নাজিল করেছেন, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা কিংবা কোনো প্রশ্নের জবাবকে তার নাজিল হওয়ার কারণ বানাননি। আর কিছু কিছু আয়াত এমন আছে যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে অথবা কারো প্রশ্নের জবাবে নাজিল হয়েছে। যার কারণে ওই আয়াতগুলোর অবতরণ প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা জরুরি। মুফাসসিরিনে কেরামের পরিভাষায় ওই প্রেক্ষাপটকে 'সববে নুজুল' বা 'শানে নুজুল' বলা হয়। যেমন সুরা বাকারার আয়াত 'মুশরিক নারীরা যতক্ষণ পর্যন্ত ইমান না আনে ততক্ষণ তাদের বিবাহ করো না। নিশ্চয়ই একজন মুমিন দাসী যেকোনো মুশরিক নারী অপেক্ষা শ্রেয়, যদিও সেই মুশরিক নারীকে তোমাদের পছন্দ হয়।' (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২১) উল্লিখিত আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট ঘটনা প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছিল। জাহেলি যুগে হজরত মুরছিদ বিন আবি মুরছিদ গনউই (রা.)-এর এন্নাক নামক এক মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মদিনায় চলে আসেন আর ওই মহিলা মক্কায় রয়ে গেল। একবার কোনো কাজে হজরত মুরছিদ (রা.) মক্কায় তাশরিফ নেন। তখন এন্নাক তাঁকে গুনাহের কাজের দিকে আহ্বান করেন। হজরত মুরছিদ (রা.) পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ইসলাম তোমার-আমার মাঝে দেয়াল হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি যদি চাও, তবে আমি রাসুল (সা.)-এর অনুমতিক্রমে তোমাকে বিয়ে করতে পারি। মদিনায় ফিরে হজরত মুরছিদ রাসুল (সা.)-এর কাছে বিয়ের অনুমতি প্রার্থনা করেন এবং নিজের পছন্দের কথা প্রকাশ করেন। তখন এ প্রসঙ্গে উল্লিখিত আয়াত নাজিল হয় এবং তিনি তাঁকে বিয়ে করতে অসম্মতি জানিয়ে দেন। (আসবাবুন নুজুল, ওয়াহেদি, পৃ: ৩৮) শানে নুজুলের গুরুত্ব : কিছু লোক শানে নুজুলের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে থাকে। তারা বলে, কোরআনুল কারিম স্বতন্ত্রভাবে এমন স্পষ্ট যে তার ব্যাখ্যার জন্য শানেনুজুল জানার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। শানেনুজুলের জ্ঞানার্জন তাফসিরে কোরআনের জন্য একটি আবশ্যকীয় শর্ত এবং এর বিশেষত্বও অনেক, যার মধ্য থেকে কিছু এখানে উল্লেখ করা হলো : আল্লামা জারকাশি (রহ.) বলেন, আসবাবে নুজুল জানার প্রথম উপকারিতা এই-এর দ্বারা আহকামের হিকমতগুলো বোঝা যায় এবং এটাও জানা যায় যে এই হুকুম আল্লাহ তাআলা কোন পরিপ্রেক্ষিতে এবং কেন নাজিল করেছেন। যেমন : সুরা নিসার মধ্যে ইরশাদ হচ্ছে, 'হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নেশাগ্রস্ত থাক, তখন সালাতের কাছেও যেও না।' (সুরা নিসা, আয়াত : ৪৩) যদি শানে নুজুলের বর্ণনাগুলো সামনে না রাখা হয়, তাহলে সাধারণত এ প্রশ্ন সৃষ্টি হয়ে থাকে যে, যখন মদ ও নেশাদ্রব্য কোরআনের নির্দেশে হারাম, তাহলে এ কথা বলার কী প্রয়োজন যে তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ পড়তে এসো না। এ প্রশ্নের জবাব কেবল শানেনুজুলের জ্ঞান থাকলেই পাওয়া যাবে। (আল বুরহান : ১/২২) যেমন এর শানে নুজুল হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে-মদ হারাম হওয়ার আগে একদা হজরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কিছুসংখ্যক সাহাবায়ে কেরামকে দাওয়াত দিলেন। সেখানে খাওয়ার পর মদের ব্যবস্থা ছিল। এমতাবস্থায় নামাজের সময় হয়ে গেলে একজন সাহাবির ইমামতিতে সবাই জামাতে নামাজ আদায় করেন। এতে নেশাগ্রস্ততার কারণে নামাজে কোরআন তেলাওয়াতে ভুল হয়ে যায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয়। (তাফসিরে ইবনে কাছির : ১/৫০০)। শানে নুজুলের আয়াত সব সময় একই ঘটনার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনো কখনো এটি আরো অনেক বিধানকেও শামিল করে। আবার কোনো কোনো আয়াত তার শানেনুজুলের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ ছাড়া কখনো কখনো শানেনুজুলের বর্ণনার মধ্যে ভিন্নতাও পাওয়া যায়। যার সমাধানে মুফাসসিরিনে কেরাম কিছু মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন, যা উসুলে তাফসিরের কিতাবগুলোয় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : মাওলানা মিরাজ রহমান