ছবি সংগৃহীত
ক্রোমিয়াম সম্পর্কে জেনে রাখা ভাল
আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪, ০৪:২৭
কথায় আছে “Health is the source of all happiness” অর্থাৎ স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। শরীর ভাল থাকলে মন যেমন ভাল থাকে, কাজ কর্মেও তেমনি উদ্দীপনা পাওয়া যায়। আর শরীর সুস্থ রাখার জন্য যেমন পরিমিত সুষম খাদ্যের প্রয়োজন হয়, তেমনি সেই খাদ্যগুলোও কেমিক্যাল বিষমুক্ত থাকা আবশ্যকীয়। মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম (এবং ফরমালিন উভয়ই) হচ্ছে এক ধরনের নীরব ঘাতক, যা তাৎক্ষণিকভাবে শারীরিক ক্ষতিসাধন করে না, তবে দীর্ঘদিন এসব কেমিক্যালসের প্রভাব ক্যান্সারসহ শরীরে নানাবিধ রোগের সৃষ্টি করে থাকে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি হাঁস-মুরগীর খাবারে মাত্রাতিরিক্ত পরিমানে ক্রোমিয়াম পাওয়া গিয়েছে বলে ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে যে রিপোর্টগুলো প্রকাশিত হয়েছে, তা উদ্বেগের কারণ বৈ কি। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ক্রোমিয়াম সমৃদ্ধ পোল্ট্রি খাবারগুলো তৈরি করছেন মূলত ট্যানারির পরিত্যাজ্য ঝুট চামড়া দিয়ে। ঝুট চামড়ার মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম থাকে। এগুলো আবার হাঁস-মুরগীকে খাওয়ানো হচ্ছে দ্রুত মোটা তাজা করার উদ্ধেশে। হাঁসমুরগির শরীরের বিভিন্ন অর্গানে জমে থাকা মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম শেষ পর্যন্ত ভোক্তাগণের শরীরেই চলে আসছে। ফলশ্রুতিতে নানাবিধ রোগে ভোক্তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যে রয়েছে তা অনস্বীকার্য। তাই আজকে আমার এই লেখার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ক্রোমিয়াম, এর প্রাকৃতিক উৎস এবং ক্ষতিকারক দিকগুলিকে জানা। রসায়নের ভাষায় ক্রোমিয়ামকে ট্রানজিসন মেটাল (ধাতু) বলা হয়। পর্যায় সারণি বা মেনডেলিফের পিরিয়ডিক টেবিলের গ্রুপ ৬ এর একটি Element এর নাম হচ্ছে ক্রোমিয়াম। এর প্রোটন ও ইলেকট্রন উভয়ই হচ্ছে ২৪, নিউট্রন ২৮ এবং এটমিক ভর হচ্ছে ৫২। বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা সাধারণত দুই ধরনের Stable ক্রোমিয়াম কমপাউনড (যৌগ) পেয়ে থাকি। ট্রাইভেলেনট ক্রোমিয়াম (Cr III বা Cr +3) যৌগ যেমন ক্রোমিয়াম ট্রাইক্লোরাইড, ক্রোমিয়াম পিকোলিনেট এবং হেক্সাভেলেনট ক্রোমিয়াম (Cr VI বা Cr +6) যৌগ যেমন পটাশিয়াম টেট্রাক্রোমেট, ক্রোমিক এসিড, লেড ক্রোমেট ইত্যাদি। শুধুমাত্র ক্রোমিয়াম (Cr III) অতি সামান্য পরিমানেই (Trace amounts) আমাদের শরীরের জন্য উপকারে লেগে থাকে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড এবং ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) প্রকাশিত একাধিক গবেষণার তথ্যমতে, বয়সভেদে (শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত) যে পরিমাণ ক্রোমিয়াম(Cr III) শরীরের জন্য “সেফ লিমিট বা নিরাপদ সীমা” হতে পারে- তা তারা অনুসন্ধানী গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন। যেমন, ০.২ এমসিজি (৬ মাস বয়স পর্যন্ত), ৫.৫ এমসিজি (৭-১২ মাস), ১১ এমসিজি (১-৩ বছর), ১৫ এমসিজি (৪-৮ বছর), ২৫ এমসিজি (৯-১৩ বছরের বালক), ২১ এমসিজি (৯-১৩ বছরের বালিকা), ৩৫ এমসিজি (১৪-১৮ বছরের বালক), ২৪ এমসিজি (১৪-১৮ বছরের বালিকা), ৩৫ এমসিজি (১৯-৫০ বছরের পুরুষ), ২৫ এমসিজি (১৯-৫০ বছরের স্ত্রীলোক), ৩০ এমসিজি (৫১ বা তাঁর বেশি বয়সের পুরুষ), ২০ এমসিজি (৫০ বা তাঁর অধিক বয়সের স্ত্রীলোক), ৩০ এমসিজি (১৯ বা তাঁর অধিক বয়সের গর্ভবতী স্ত্রীলোক অথবা যে মা-রা বাচ্চাদের দুধ দিয়ে থাকেন)। বয়স যখন ৫০ এর বেশি হয়, তখন শরীরে কম পরিমানে ক্রোমিয়াম এবজরভ হয়।(এমসিজি = মাইক্রোগ্রাম, ক্রোমিয়াম পরিমাপের ইউনিট)। উপরোক্ত এই অতি সামান্য পরিমাণ ক্রোমিয়াম যা শরীরের জন্য আবশ্যকীয় তা মূলত প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমেই আমরা পেয়ে থাকি। ক্রোমিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের প্রাকৃতিক উৎসগুলো হচ্ছেঃ যেমন brewer’s yeast, চর্বিহীন গরুর মাংস, পোল্ট্রি মিট, টার্কি ব্রেসট মিট, ডিম, নাট, চিজ, হোল গ্রেন রুটি, ঝোলাগুড়, বিভিন্ন ফ্রুটস যেমন কলা, চামরাসহ আপেল, অথবা কমলা ও আঙ্গুরের জুস, বিভিন্ন তাজা শাকসবজি যেমন ব্রকলি, গ্রীন বিন, পালংশাক, রোমেইন লেটুস, পাকা টমেটো, ম্যাশ পটেটো, মাশরুম ইত্যাদি। অন্যদিকে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম বলতে বুঝায় হেক্সাভেলেনট ক্রোমিয়াম (Cr VI)যৌগকে এবং এটাই মূলত শরীরের নানাবিধ ক্ষতিসাধন করে থাকে। ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সি ক্রোমিয়াম (Cr VI) যৌগকে হিউম্যান কার্সিনোজেন (যা ক্যান্সার সৃষ্টি করতে সক্ষম)হিসাবে সনাক্ত করেছেন। গবেষণার মাধ্যমে তারা দেখিয়েছেন যে, শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম (Cr VI) যৌগ ফুসফুস, ন্যাসাল ও সাইনাস ক্যান্সার সৃষ্টি করে। এছাড়াও খাবার বা শ্বাস প্রশ্বাস উভয় পন্থায় মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম (Cr VI) যৌগ নানাবিধ নন-ক্যান্সারাস রোগও সৃষ্টি করে থাকে যেমন, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, এজমা, আলসার, কাশি ও হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস ত্যাগ করা, উপরন্ত কিডনি ফেইলিউর সহ লিভার, পাকস্থলী ও ত্বকের ক্ষতিসাধন করে। শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণায় আরো দেখানো হয়েছে যে, ডিএনএ ড্যামেজ, জিন মিউটেশন ও এবরশনের উপরেও প্রভাব ফেলে মাত্রারিক্ত ক্রোমিয়াম (Cr VI) যৌগ। তাই আতঙ্ক নয়, বরং আন্তরিকতার সহিত গণমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে জন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারী প্রশাসনের পরিকল্পিত ও চৌকস সহায়তার মাধ্যমে বিষাক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত পোল্ট্রি খাবারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব নয় বলেই এই অধমের ধারণা। (এই পোস্টটি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে)