ছবি সংগৃহীত

কোরান-হাদিসের আলোকে মুসলিম নারীর পর্দা: প্রবন্ধ : ১৩ : মুখমন্ডল খোলা রাখার মতাবলম্বীদের কতিপয় যুক্তি এবং জবাব

মিরাজ রহমান
সাংবাদিক ও লেখক
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০১৪, ০৬:০২
আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০১৪, ০৬:০২

মুখমন্ডল খোলা রাখার মতাবলম্বীদের কতিপয় যুক্তি এবং যুক্তির জবাব নারীর হাত ও মুখমন্ডলকে ইসলামি পর্দা বহিভূর্ত মনে করে এবং তা অনাবৃত রাখা এবং তার প্রতি পরপুরুষের দৃষ্টিপাত করা জায়েয বলে মত পোষণ করে, কোরান ও সুন্নাহ থেকে নিম্নোক্ত প্রমাণাদি পেশ করা হয়। (১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا আর তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। (সূরা নূর: ৩১) কারণ, সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) ‌‍‍‌মা জাহারা মিনহা (যা সাধারণত: প্রকাশ হয়ে পড়ে) আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এখানে নারীর হাত, আংটি এবং মুখমন্ডল বুঝানো হয়েছে। (কেননা কোনো নারী প্রয়োজন বশত: বাইরে যেতে বাধ্য হলে চলা ফেরা ও লেন-দেনের সময় মুখমন্ডল ও হাত আবৃত রাখা খুবই কষ্টকর হয়)। এ তাফসীর ইমাম আমাশ সাঈদ বিন যুবাইরের মধ্যস্থতায় আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন। আর সাহাবির তাফসীর শরিয়তের বিধান সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দলীল হিসাবে গৃহীত। (২) ইমাম আবু দাউদ তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সুনানে আবু দাউদ-এ উম্মত জননী আয়েশা (রা.) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, একদা আবু-বকর (রা.) তনয়া আসমা (রা.) পাতলা কাপড় পরিধান করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমীপে উপস্থিত হলে নবিজি চেহারা মুবারক অপর দিকে ফিরিয়ে হাত ও মুখমন্ডলের প্রতি ইংগিত করে আসমাকে বললেন, হে আসমা! মেয়ে মানুষের প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর তার মুখমন্ডল ও হাত ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অংশই দৃষ্টি গোচর হওয়া উচিত নয়। (৩) বুখারি শরীফে উদ্ধৃত হয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, বিদায় হজের সময় তার ভ্রাতা ফজল বিন আব্বাস (রা.) রাসূলের সাথে সওয়ারীর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন, ইতিমধ্যে খুসআম গোত্রের জনৈকা মহিলা রাসূলের সমীপে উপস্থিত হলে ফজল মহিলার প্রতি তাকাচ্ছিলেন এবং মহিলাও ফজলের প্রতি দৃষ্টি প্রদান করছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজল ইবনে আব্বাসের চেহারা অন্য দিকে ফিরিয়ে দেন। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, মহিলাটির মূখমন্ডল খোলা ছিল। (৪) সহিহ বুখারি ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে জাবের (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক লোকদের নিয়ে ঈদের নামাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষ করে লোকদেরকে আখেরাত সংক্রান্ত উপদেশ প্রদান করে বললেন, মহিলাদের কাছে গিয়ে হৃদয়গ্রাহী কিছু উপদেশ পেশ করেন আর বলেন: হে নারী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর পথে তারই সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে দান-দক্ষিণা কর, কেননা তোমরা অধিক হারে জাহান্নামের জ্বালানী হবে। তখন তাদের কালো বর্ণের চেহারা বিশিষ্ট জনৈকা মহিলা দাঁড়িয়ে বললেন,.....( আল হাদিস) এতে বুঝা গেল, মহিলাটির চেহারা খোলা ছিল, আবৃত ছিল না। নতুবা জাবের (রা.) কিভাবে জানতে পারলেন যে, মহিলাটির চেহারা কালো বর্ণের ছিল। এই আয়াত ও হাদিস কয়টিই মহিলাদের জন্যে পরপুরুষের সামনে চেহারা বা মুখমণ্ডল এবং হাত খোলা রাখার বৈধতার দলীল হিসেবে পেশ করা হয়। উল্লেখিত দলীলগুলোর জওয়াব নারীর হাত ও মুখমন্ডল খোলা রাখার বৈধতা প্রমাণকারী এই দলীল চতুষ্টয় পূর্বে বর্ণিত হাত ও মুখমন্ডল পর্দার অন্তর্ভুক্ত করে তা আবৃত রাখা অপরিহার্যতার প্রমাণপঞ্জীর পরিপন্থী নয়, আর তা দুই কারণে, (ক) নারীর চেহারা আবৃত রাখার প্রমাণাদিতে একটি স্বতন্ত্র ও নতুন নির্দেশ নিহিত আছে পক্ষান্তরে চেহারা অনাবৃত রাখার দলীল পেশ করার মৌলিক নির্দেশ রয়েছে, তা হচ্ছে পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেকার ব্যাপক প্রচলন। উসূল শাস্ত্রবিদগণের প্রসিদ্ধ মূলনীতি হচ্ছে, সাধারণ অবস্থার বিপরীত নতুন দলীলকে প্রাধান্য দেয়া। কেননা, দলীল না পেলে তা বহাল রাখা যাবে। আর যখন সাধারণ অবস্থার অতিরিক্ত কোনো নতুন নির্দেশের দলীল উপস্থিত হবে, তখনই সাধারণ অবস্থাকে বহাল না রেখে নতুন নির্দেশের মাধ্যমে হুকুম পরিবর্তন করা হবে। যেহেতু প্রত্যেক বস্তু তার স্বস্থানে বহাল থাকাকে আসল বলা হয়, সেহেতু যখনই আসলের পরিবর্তনকারী কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখনই প্রতীয়মান হবে যে, বস্তুর আসলের উপর অন্য আরেকটি হুকুম আরোপিত হয়েছে এবং তার পূর্বেকার হুকুমের পরিবতর্ন ঘটেছে। এ জন্যই আমরা বলি, নতুন হুকুমের দলীল উপস্থাপনের অতিরিক্ত জ্ঞান যোগ হয়। অর্থাৎ প্রাথমিক এবং সাধারণ অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে এবং নারীর চেহারা আবৃত রাখা ফরজ সাব্যস্ত হয়েছে। কাজেই নেতিবাচক হুকুমটির উপর ইতিবাচক হুকুমটির প্রাধান্য অর্জিত হবে। এটি উল্লেখিত দলীলাদির সংক্ষিপ্ত জওয়াব। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, উভয় পক্ষের প্রমাণপঞ্জী মাসআলা সাব্যস্ত করার দিক দিয়ে পরস্পর সমপর্যায় সম্পন্ন তাহলেও ইতিবাচককে নেতিবাচকের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই মূলনীতির দৃষ্টিতে নারীর মুখমন্ডল আবৃত রাখা অপরিহার্যতার প্রমাণপঞ্জী অগ্রাধিকার লাভ করবে। (খ) আমরা যখন নারীর চেহারা খোলা রাখার বৈধতার দলীলাদি নিয়ে গভীর গবেষণা করি তখন এই বাস্তবতা ফুটে উঠে যে, এই সব দলিলাদি বৈধতার দলীলাদির সমতুল্য নয়। বিস্তারিত বিবরণ প্রতিটি দলীলের পৃথক পৃথক জওয়াবের মাধ্যমে জানা যাবে ইনশাআল্লাহ। এখানে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখিত যুক্তিগুলোর জওয়াব প্রদান করা হলো- (১) সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) বর্ণিত তাফসীরের তিনটি জওয়াব। (ক) আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের অবস্থা বণর্না করেছেন। যেমন শায়খুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার উক্তি বর্ণনার স্থলে উল্লেখ হয়েছে। (খ) হতে পারে তার উদ্দেশ্য হলো, ঐ সৌন্দর্য বর্ণনা করা যা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। যেমন- আল্লামা ইবনে কাসীর (র.) উক্ত আয়াতের তাফসীর সম্পর্কিত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের (রা.) যেই তাফসীর উল্লেখ করেছেন তাতেও আমাদের পক্ষ হতে উপরোক্ত জওয়াবদ্বয়ের সমর্থন পাওয়া যায়, যা কোরান ভিত্তিক তৃতীয় প্রমাণের পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। (গ) যদি আমাদের উল্লেখিত দুই জবাব মানতে তাদের আপত্তি থাকে। তাহলে তৃতীয় জওয়াব হচ্ছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের তাফসীর কেবলমাত্র তখনই দলীল হতে পারে যখন তার তাফসীরের প্রতিকূলে অন্য সাহাবির কোন বক্তব্য বিদ্যমান না থাকে। নতুবা পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলীলাদির যেটি অন্য দলীলের সমর্থনে প্রবল এবং প্রাধান্যযোগ্য সাব্যস্থ হবে, সে দলীল দ্বারা প্রমাণিত উক্তির উপরই আমল করা হবে। আমাদের বিতর্কিত মাসআলায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের তাফসীরের প্রতিকূলে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের তাফসীর ও বিদ্যমান। তিনি বলেন, (ততটুকু ভিন্ন যতটুকু এমনিই প্রকাশ পায়) বাক্যে উপরের কাপড় যেমন- বোরকা, চাদর ইত্যাদিকে পর্দার বিধানের ব্যতিক্রমের অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে যা সর্বাবস্থায় প্রকাশিত হয়ে যায়, যা আবৃত করা সম্ভবপর নয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কর্তব্য হচ্ছে। রাসূলের বিশিষ্ট সাহাবিদ্বয়ের তাফসীরের মধ্যে কোন তাফসীরটি প্রবল এবং প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য তা দলীল ভিত্তিক যাচাই করা এবং প্রবল এ প্রধান্য পাওয়ার যোগ্য তাফসীর অনুসারে আমল করা। (২) উম্মত জননী আয়েশা (রা.) এর বর্ণিত হাদিসটি দুই কারণে দুর্বল। (ক) খালেদ বিন দুরাই যে হাদিস বণর্নাকারীর মধ্যস্থতায় আয়েশা (রা.)-এর হাদিসটি বর্ণনা করেছেন , খালেদ সেই বর্ণনাকরীর নাম উল্লেখ করেননি, কাজেই হাদিসটি মুনকাতে প্রমাণিত হল। তাছাড়া ইমাম আবু দাউদ (র:) হাদিসটিকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করে বলেন যে, খালেদ ইবনে দুরাই আয়েশা (রা.) হতে সরাসরি হাদিসটি শুনেছেন বলে এরূপ কোনো প্রমাণ নেই। হাদিসটি দুর্বল হওয়ার এ কারণটি আবু হাতেম রাজী (রহ.)ও বর্ণনা করেছেন। (খ) এই হাদিসের সনদ তথা হাদিস বর্ণনা কারীদের ধারাবাহিক তালিকায় সাঈদ বিন বশীর আল-বসরী (পরবর্তীতে সিরিয়ার রাজধানী দামেশকের অধিবাসী।) নামের এক ব্যক্তি পাওয়া যায়। ইবনে মাহদী তাকে অনুপযুক্ত মনে করে পরিত্যাগ করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে মাঈন ইবনে মাদীনী এবং ইমাম নাসায়ী প্রমুখ অনুসরণযোগ্য মুহাদ্দেসীনে কেরাম তাকে দুর্বল বর্ণনাকারী সাব্যস্ত করেছেন। কাজেই হাদিসটি দূর্বল এবং তা আমাদের বর্ণিত পর্দার অপরিহার্যতা সম্পর্কিত বিশুদ্ধ হাদিসের মোকাবেলা করতে পারবে না। তাছাড়া আসমা বিনতে আবু-বকর (রা.)-এর বয়স হিজরতের সময় সাতাশ বৎসর ছিল, এই বয়স্কা নারী রাসূলের সমীপে এমন পাতলা বস্ত্র পরিধান করে যাবেন, যাতে তার হাত ও চেহারা ব্যতীত অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকৃতিও প্রকাশ পাবে এটা সুস্থ্ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, হাদিসটি বিশুদ্ধ, তাহলে বলা যাবে আসমা সম্পর্কিত ঘটনাটি পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই ঘটেছে। আর পর্দার বিধান অবতীর্ণ হয়ে পূর্বের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কাজেই পরবর্তী বিধান তথা পর্দার অপরিহার্যতার বিধান অগ্রগণ্য ও পালনীয় হবে। (৩) আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের জওয়াব, এই হাদিসে পরনারীর মুখমন্ডলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা জায়েয হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজল ইবনে আব্বাসের এই কর্ম অর্থাৎ তার নিকট আগমন কারী নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করার উপর সম্মতি প্রকাশ করেননি বরং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ফজলের চেহারা অন্য দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এ কারণেই ইমাম নববী (র:) সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন যে, এ হাদিস থেকে প্রমাণিত মাসআলা সমূহের মধ্যে এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা যে, পর নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা হারাম। হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী (র:) সহিহ বুখারির শ্রেষ্ঠতম ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুলবারীতে এই হাদিসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন, এই হাদিস দ্বারা এটাও জানা হল যে, পরনারীর দর্শন ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ এবং এমতাবস্থায় দৃষ্টি নত রাখা ওয়াজিব। কাজী আয়াজ (রহ:) বলেন, কতক লোকের ধারণা, যখন পরনারী দর্শনে ফেৎনা ও অনচারে লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে তখনই (পুরুষের জন্যে) দৃষ্টি নত রাখা ওয়াজিব। (এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আব্বাস তনয় ফজলের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। আর ফেৎনায় পতিত হওয়ার আশংকা না থাকলে পরনারী দর্শন জায়েয। কিন্তু আমার মতে কোনো কোনো বর্ণনামতে রাসূল যে ফজলের চেহারা ঘুরিয়ে দিয়েছেন, তার এই কাজটি মৌখিক নিষেধাজ্ঞার চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। (কাজেই পরনারী র্দশনে ফেৎনায় লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকুক বা না থাকুক উভয় অবস্থাতে হারাম এবং দৃষ্টি নত রাখা ওয়াজিব) এখন প্রশ্ন হল, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনাবৃত চেহারায় আগমন কারী মহিলাটিকে পর্দাবলম্বন করার নির্দেশ দেননি কেন? এর উত্তর হচ্ছে, (ক)মহিলাটি এহরাম অবস্থায় ছিলেন, আর এহরামরত নারীর প্রতি ইসলামের বিধান হল পরপুরুষের দৃষ্টির আওতায় না থাকলে চেহারা খোলা রাখা ওয়াজিব। (খ) এমন সম্ভাবনাও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরবর্তীতে তাকে চেহারা ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা, হাদিস বর্ণনাকারীর পর্দার নির্দেশ উল্লেখ না করার দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে মুখমন্ডল ঢেকে রাখার নির্দেশ দেননি। কারণ, কোনো বিধান উল্লেখ না হওয়াতে এমনটি জরুরি নয় যে বিধানটিই অস্তিত্বশূন্য। সহিহ মুসলিম ও আবু দাউদে সাহাবি জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বাজালী (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি বর্ণিত আছে যে, অনিচ্ছকৃতভাবে (আকম্মাৎ) পর নারীর উপর দৃষ্টি পতিত হলে সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও। (বর্ণনাকারী সন্দেহ পোষণ করে বলেন) অথবা ইবনে আব্দুল্লাহ বাজলী (রা.) বলেন: রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে পর নারী দর্শন থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। (৪) জাবের (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের জওয়াব হল, ১. উল্লেখিত হাদিসে সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই যে, রাসূলের ঈদের নামাজ শেষে মহিলাদেরকে উপদেশ দান করা সম্পকির্ত ঘটনাটি কত সালে সংঘটিত হয়েছিল। ২. হয়ত কালোবর্ণের মুখমন্ডল বিশিষ্ট মহিলাটি সেসব বৃদ্ধ নারীদের অন্তভুর্ক্ত ছিলেন (বাধ্যর্কের কারণে) যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনের আশা করা যায় না। এমন নারীদের চেহারা খোলা রাখা জায়েয। এসব বৃদ্ধ মহিলাদের উপর থেকে পর্দার বিধান উঠিয়ে নেয়ার দ্বারা অন্যান্য মহিলাদের উপর থেকেও পর্দার অপরিহার্যতা বিয়োগ হয় না। (বৃদ্ধ নারী ছাড়া অন্য সব নারীদের উপর পর্দার অপরিহার্যতা বহাল থাকবে।) ৩. হয়ত এই ঘটনাটি পর্দার আয়াত অবতরণের পূর্বেকার ঘটনা। কেননা,পর্দার বিধানাবলী বর্ণিত সূরা আল-আহযাব ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ হিজরী সনে অবতীর্ণ হয়েছে। আর ঈদের নামাজ প্রবর্তিত ২য় হিজরী সনে । এখন যেহেতু ঘটনাটি কত সনে ঘটেছে হাদিসে উল্লেখ নেই। তাই ঘটনাটি পর্দার আয়াত নাজিল হবার পূর্বেকার হলে তার দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, মহিলার জন্যে পর পুরুষের সম্মুখে চেহারা খোলা রাখা বৈধ। কাজেই মহিলার জন্যে চেহারা আবৃত রেখে পরিপূর্ণ পর্দা পালন করা অপরিহার্য। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : মাওলানা মিরাজ রহমান