ছবি সংগৃহীত

ওমর আল জাবির

farzana akter
লেখক
প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০১৩, ১০:৪১
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০১৩, ১০:৪১

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকাশনা সংস্থা বিল্ডিং অ্যা ওয়েব ২.০ পোর্টাল উইথ এএসপি ডট নেট ৩.৫ নামে ওমর আল জাবিরের লেখা একটা বই প্রকাশ করে। এ বই পড়েই তাঁকে ডেকে নেন ব্রিটিশ টেলিকমের (বিটি) এক পরিচালক। আর এভাবেই তার সফটওয়্যার জগতে যাত্রা শুরু। আল জাবির পেইজফ্লেক্সের সহ-উদ্ভাবক এবং তিনি ব্রিটিশ টেলিকমের সফটওয়্যার-অ্যাজ-অ্যা-সার্ভিসের (সাস) প্রধান স্থপতি। পরিবার ওমর আল জাবিরের জন্ম ঢাকায় ১৯৮২ সালের ৫ মে। তাঁর স্ত্রী সাকী একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। তিনি সফটওয়্যারের মাননিয়ন্ত্রণ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। যেভাবে শুরু আল জাবিরের প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় সেই কিশোর বয়স থেকেই। স্কুলে থাকা অবস্থায়ই কম্পিউটারের ওপর বেশ ঝোঁক দেখা যায়। কম্পিউটারভিত্তিক মাসিক 'কম্পিউটার জগৎ' তাঁর সে ঝোঁককে বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়। ১৯৯৩ সালে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ই পত্রিকাটিতে তিনি কম্পিউটারের বিভিন্ন বিষয়ে লেখা ও টিপস দিতে শুরু করেন। যেমন 'ডস-এ যারা বেশি অভিজ্ঞ নয় তাদের জন্য এই টিপস। আপনারা হয়তো অনেক সময় দেখেছেন, ডাইরেক্টরিতে ফাইলের নামের মধ্যে এমন সব কি বা চিহ্ন আছে, যা পুরো কিবোর্ডেও নেই। তাঁরা নিশ্চয়ই খুব সমস্যায় পড়বেন যে কিভাবে প্রোগ্রাম বা ফাইলটি লোড করবেন। আসলে কিন্তু মোটেও সমস্যা নয়। শুধু কয়েকটি কি চাপতে হবে।' এভাবে ধীরে ধীরে পড়াশোনার আরেকটি অংশ হয়ে যায় কম্পিউটার। অতি আগ্রহের কারণে প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ আর সফটওয়্যার প্রোগ্রাম রীতিমতো তাঁকে নেশার মতো পেয়ে বসে। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে মাঝেমধ্যেই তাঁকে নিজের বিগ সাইজ একটা কম্পিউটার নিয়ে ইন্দিরা রোডের একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে হাজির হতে দেখা যেত। কোনো গেম নিতে নয়, আসতেন প্রোগ্রাম লেখার সফটওয়্যার ভরে নিতে অথবা বিশেষ সমস্যা নিয়ে কথা বলতে। লেখার প্রতিভা শুধু কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগাম আর সফটওয়্যার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিই নয়, স্কুলে থাকতেই লেখায় হাত পাকে তাঁর। কিভাবে, কতটা সহজ করে কম্পিউটারের বিষয়গুলো সবার সামনে তুলে ধরা যায়, তা ভালোই আয়ত্ত করে ফেলেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত একটি লেখার শুরুটা দেখলেই পাকা হাতের স্বাক্ষর মেলে- 'মাউস অর্থ ইঁদুর। শুরু থেকেই সেরা ১৫ বছর বয়সেই আল জাবির তৈরি করে ফেলেন চারটি সম্পূর্ণ বাংলায় লেখা সফটওয়্যার। এর মধ্যে একটি প্রি-স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বর্ণমালা, ছড়া, পাজলভিত্তিক শিক্ষামূলক মাল্টিমিডিয়া। আরেকটি টিনএজারদের জন্য, অ্যানিমেশনের মাধ্যমে কেমিস্ট্রি ও থ্রিডি ইলাস্ট্রেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া। তৃতীয়টি জ্যোতির্বিদ্যায় উৎসাহীদের জন্য। যেখানে ছিল ১০০টিরও বেশি ভিডিও ও নাসার ক্লিপ এবং চতুর্থ মাল্টিমিডিয়াটি বাংলাদেশের পর্যটনের ওপর। সেখানে ছিল পর্যাপ্ত ম্যাপসহ চার শরও বেশি আকর্ষণীয় ছবি ও বর্ণনা। মোটকথা, চারটি সিডি ছিল ওমর আল জাবিরের জীবনের প্রথম ধাপ- সফটওয়্যার জাদুকরীতে হাত পাকানো। প্রোগ্রামার আল জাবির মাত্র ১৫ বছর বয়সে আল জাবির প্রোগ্রামার হিসেবে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেন। পরের বছর যোগ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ডেভেলপমেন্ট কম্পানির অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে। যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আর্থিক বিবরণী ও ডকুমেন্টের সহযোগী সফটওয়্যার তৈরি করেন। তাঁর তৈরি সফটওয়্যারের প্রযুক্তিসেবা নিতে থাকে ব্যাংক অব আমেরিকা, ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাব্লিওএএমইউ, এইচএসবিসিসহ অনেকে। ব্যাংকের জটিল ও সূক্ষ্ম সব সফটওয়্যার সল্যুশনের জন্য তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ সমাদৃত হন। সফটওয়্যার আর্কিটেক্টের কাজ হচ্ছে মূলত সফটওয়্যারের প্রতিটি খুঁটিনাটি ডিজাইন করে প্রোগ্রামার বা সফটওয়্যার নির্মাতাকে বলে দেওয়া যে কিভাবে সেটি বানিয়ে, পরীক্ষা করে গ্রাহককে দিতে হবে। আর তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল পাঁচটি প্রকল্প। যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ব্যাংকিংসেবা পরিচালিত করতে সহায়তা করেছিল। কম্পিউটার বিজ্ঞানে লেখাপড়া জাবির যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন মোট আট বছর। মাঝে ফিরে আসেন দেশে। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (এআইইউবি) থেকে নিয়েছেন কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি। প্রথম সেমিস্টারে পড়াকালীন তিনি ছাত্র-শিক্ষক সংযোগ, কুইজ প্রেরণ, মার্কস প্রকাশসহ শিক্ষকদের কাছে অনলাইনে অ্যাসাইনমেন্ট প্রকাশসংক্রান্ত নানা অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে জড়িত হয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে প্রশাসন বিভাগও তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহে রাজি হয়েছিল। শেষে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে তিনি ক্লাসে অংশগ্রহণের চেয়ে আইটি বিভাগেই বেশির ভাগ সময় দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত তিন বছরের চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি পরিপূর্ণ অনলাইন ইকোসিস্টেম চালু করতে সমর্থ হন। হেলথ রেকর্ড ব্যাংক স্নাতক পাসের পর ২০০৫ সালে জাবির তৈরি করেন পেইজফ্লেক্স। পেইজফ্লেক্সের পরে 'কংগ্রেল'-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। সেটি ছিল আমেরিকার বেলিংহ্যামে। সেখানে প্রথমবারের মতো তিনি অনলাইনে হেলথ রেকর্ড ব্যাংক চালু করলেন। যেখানে মাইক্রোসফট হেলথ ভল্টে সব তথ্য জমা থাকবে। তথ্যের জন্য রোগীকে কষ্ট করে হাসপাতাল বা ল্যাবে যেতে হবে না। যে হাসপাতালে রোগী চিকিৎসা করিয়েছিলেন, তার সব তথ্য ঘরে বসেই পাওয়া যাবে। ২০১১ সালে সেটি পুরো ওয়াশিংটন স্টেটে ঝড় তোলে। এই সাইট সম্পর্কে জাবির বলেন, 'এর ফলে আইফোনই ব্যক্তিগত নার্সের ভূমিকা নেবে।' ব্রিটিশ টেলিকমে তিন বছর হলো ব্রিটিশ টেলিকমে যোগ দিয়েছেন ওমর আল জাবির। এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিটি রিটেইলের মাধ্যমে বিটি ইংল্যান্ডে ইন্টারনেট, টিভি, ফোন, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিসেবা দেয়। এই সেবা দেওয়ার জন্য যত কম্পিউটার সিস্টেম রয়েছে, সেগুলোর স্থাপত্যশৈলী তৈরি, দেখাশোনা, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল ওমর আল জাবিরের ওপর। পুরস্কার ওমর আল জাবির মাইক্রোসফটের এমভিপি (মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রফেশনাল) পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম বাংলাদেশি। তিনি এই পুরস্কার পেয়েছেন ছয়বার। এ ছাড়া 'পেইজফ্লেক্স' ওয়েবসাইটের সহ-উদ্ভাবকও তিনি। ২০০৬ সালে এটি গুগল, ইয়াহুকে হারিয়ে দিয়ে এক নম্বর 'স্টার্ট পেইজ' ওয়েবসাইটের পুরস্কার পায়। নটর ডেম কলেজে পড়াকালীন বার্ষিক সফটওয়্যার মেলায় জাবিরের তৈরি সফটওয়্যারগুলো তিন বছর ধরে প্রথম পুরস্কারের স্থান দখল করে রাখে। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রথম প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় ছোটদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগীর পুরস্কার পান জাবির। Blog: http://omaralzabir.com Email: [email protected] twitter: twitter.com/omaralzabir