ছবি সংগৃহীত

কখন, কীভাবে এবং কাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম মূর্তিপূজার সূচনা হয়েছিলো?

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
লেখক
প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০১৫, ০৪:০১
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০১৫, ০৪:০১

হজরত আদম [আ.]-এর জীবদ্দশায় তার বংশধরদের ধর্মবিশ্বাসে কোনো প্রকার শিরক বা কুফরের সংমিশ্রণ ছিলো না। তারা সবাই একত্ববাদের (তাওহিদ) অনুসারী ছিলেন। আদম [আ.]-এর শরিয়তের অধিকাংশ আদেশ নিষেধ ছিলো বৈষয়িক বিষয়ে। কারণ পৃথিবীকে নতুন করে আবাদ করতে এবং এটিকে বাসযোগ্য করতে গার্হস্থ্য বিষয়ের প্রয়োজনই ছিলো বেশি। এ কারণে আদম আ.-এর বংশধরদের মাঝে ধর্ম নিয়ে তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। [সূত্র : সুরা বাকারা, আয়াত ২১৩] কিন্তু আদম [আ.]-এর মৃত্যুর পর কালের বিবর্তনে মানুষের মধ্য শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। তার পরলোকগমনের হাজার বছর পর হজরত নুহ [আ.]-এর সম্প্রদায় ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরা নামের কয়েকজন মৃত নেককার লোকের পূজো শুরু করে। তাদের পূজায় লিপ্ত হওয়ার ধাপগুলো এমন- মুহাম্মাদ ইবনু কায়েস বলেন, ওয়াদ ছিলেন নুহ পূর্বকালীন সময়ের সবচেয়ে নেককার ও বুজুর্গব্যক্তি। লোকেরা তাকে খুবই ভালোবাসতো ও সম্মান করতো। সে মারা যাওয়ায় লোকেরা খুব কষ্ট পেলো এবং তার কবরের পাশে জড়ো হয়ে আহাজারি করতে লাগলো। ইবলিস শয়তান তাদের এ অবস্থা দেখে এক ফন্দি আঁটলো। সে মানুষের আকৃতি ধরে এসে বললো, এ লোকের জন্য তোমাদের কী বেদনা তা আমি লক্ষ করেছি। আমি কি তোমাদেরকে তার এমন একটি প্রতিকৃতি বানিয়ে দিবো যা তোমরা তোমাদের মিলনকেন্দ্রগুলোতে রেখে দিবে এবং এর মাধ্যমে তোমরা তার কথা স্মরণ করবে? এইসব নেককার মানুষের মূর্তি সামনে থাকলে তাদের দেখে আল্লাহর প্রতি ইবাদতে অধিক আগ্রহ সৃষ্টি হবে। লোকেরা তার কথায় খুশি হয়ে তাকে তার প্রতিকৃতি বানিয়ে দিতে বললো, যাতে তারা তাকে চোখের সামনে দেখে তার জন্য শোক করতে পারে, তাকে স্মরণ করতে পারে। এভাবে শয়তান তাদের জন্য ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসরা নামের পুণ্যব্যক্তিদের প্রতিকৃতি বানিয়ে দেয় এবং লোকজন তাদের প্রতিকৃতি সামনে রেখে তাকে স্মরণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে অনেকে তাদেরকে অসিলা বানিয়ে আখেরাতে মুক্তি পাবার আশায় তাদের পূজা শুরু করে। এই পূজা তাদের কবরেও হতে পারে, কিংবা তাদের মূর্তি বানিয়েও হতে পারে। তাফসিরবিদগণ দুটো সম্ভাবনার কথাই বলেছেন। কালক্রমে তাদের সন্তানেরা তাদের এ সমস্ত কাজ দেখতে লাগলো। ধীরে ধীরে বংশবৃদ্ধি হতে লাগলো। নতুন প্রজন্ম আস্তে আস্তে ওই মূর্তি তৈরির আসল উদ্দেশ্যটিই ভুলে গেলো। তারা মৃত পুণ্যবান লোকটিকে নয়, এই মূর্তিকেই শ্রদ্ধা করতে লাগলো এবং মূর্তিকে বিভিন্ন ক্ষমতার অধিকারী মনে করে এটার পূজা করতে লাগলো। আর এভাবেই মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম মূর্তি পূজার সূচনা হলো। এ পাঁচটি মূর্তির মাহাত্ম্য ও তাদের প্রতি ভক্তি লোকদের হৃদয়ে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছিলো যে, তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এবং পারস্পরিক চুক্তি সম্পাদনকালে তাদের নাম উল্লেখ করতো। সম্প্রদায়ের এইরূপ পতন দশায় আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য নুহ আ.-কে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেন। [সূত্র : সুরা আরাফ, আয়াত ৬১, তাফসির ইবনে কাসির, বুখারি- ইবনে আব্বাস থেকে প্রায় অনুরূপ বর্ণনা] আরবের ইতিহাসে দেখা যায়, এ মূর্তিগুলোর পূজা পরবর্তীকালে আরবদের মধ্যেও চালু ছিলো। ‘ওয়াদ’ ছিলো বনু কালবের জন্য দুমাতুল জান্দালে, সুওয়া ছিলো বনু হোজায়েলের জন্য, ইয়াগুছ ছিলো বনু গুত্বায়েফের জন্য জুরুফ নামক স্থানে, ইয়াউক ছিলো বনু হামদানের জন্য এবং নাসরা ছিলো হিমইয়ার গোত্রের বনু জি-কালা’র জন্য। পৃথিবীর প্রাচীনতম শিরক হলো নেককার মানুষের কবর অথবা তাদের মূর্তিপূজা। যা আজও প্রায় সকল ধর্মীয় সমাজে চালু আছে এবং বর্তমানে যা মুসলিম সমাজে স্থানপূজা, কবরপূজা, ছবি-প্রতিকৃতি, মিনার ও ভাষ্কর্য পূজায় রূপ নিয়েছে। এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের সবচে বড় উদাহরণ যীশুর মূর্তি। আজকের খৃস্টানরা গির্জায় স্থাপিত যীশুর মূর্তির সামনে গিয়েই নতজানু হয়, তার কাছেই কায়মনে প্রার্থনা করে, কোনো কিছু কামনা করে। তারা জানে যে এই মূর্তির কোনো কার্যক্ষমতা নেই তবু তারা এটিকে নবির একটি সিম্বল বানিয়ে, ঈশ্বরের পুত্রের একটি উপমা বানিয়ে তার পূজো করছে। যীশু তো আর হিন্দুধর্মের দেবতাদের মতো বেদ, গীতা, মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনি থেকে উঠে আসেননি; তিনি সত্য এবং তার ইতিবৃত্ত বেশ ঘটা করেই পৃথিবীর ইতিহাসে সংরক্ষণ করা হয়েছে। যীশুকে সত্য জানার পরও, তার আগমন, ধর্মপ্রচার, পরলোকগমন সব ইতিহাসে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানার পরও মানুষ তার মূর্তি বানিয়ে তাকে পূজো করা শুরু করেছে। এটাই হলো শয়তানের কারসাজি। শয়তান এভাবেই মানুষের অন্তকরণে ধোঁকার বীজ বুনে দেয়। মানুষকে একেশ্বরবাদ (তাওহিদ) থেকে পৌত্তলিক (মুশরিক) বানানো মানবমনের ভঙ্গুর ধর্মবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর লেখক : গবেষক, কথাসাহিত্যিক