ছবি সংগৃহীত

প্রিয় গন্তব্য: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

খন্দকার ইশতিয়াক মাহমুদ
লেখক
প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০১৭, ০৯:২২
আপডেট: ১০ মার্চ ২০১৭, ০৯:২২

লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে চলে গেছে এক ছায়াঢাকা রেল লাইন। ছবি: নাসির খান।
 
(প্রিয়.কম): লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে টিকে থাকা চিরসবুজ বনগুলোর একটি। বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে এটি অন্যতম। এটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে এই বনকে 'জাতীয় উদ্যান' হিসেবে ঘোষণা করে। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদ। এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, সূর্যের আলোর জন্য প্রতিযোগিতা করে এ বনের গাছপালা, একে অপরকে ছাড়িয়ে উঁচু হয়ে আলো পাবার চেষ্টা করে। বেশিরভাগ গাছ অনেক ওপরে ডালপালা ছড়িয়ে ছাদের মত অবস্থা তৈরি করে। যার ফলাফল হল, এই বন এতই ঘন যে মাটিতে সূর্যের আলো পড়েনা বললেই চলে। রহস্যময় একটা গা ছমছমে ভাব সব সময় জড়িয়ে থাকে এই এলাকাটিতে।
 
কোথায়: সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান একটি ১২৫০ হেক্টর আয়তনের বন।
 
পায়ে হাটা ট্রেইল, কপাল ভাল হলে চোখে পড়বে উল্লুক পরিবার। ছবি: শরীফ।
 
কিভাবে: লাউয়াছড়া যেতে হলে প্রথমে ট্রেন বা বাসে করে শ্রীমঙ্গল অথবা কমলগঞ্জে আসতে হবে। ঢাকা থেকে রেল ও সড়ক পথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। দুপুর ২টায় প্রতিদিন ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০টায় ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ভাড়া ১১৫ টাকা থেকে ৭৬৫ টাকা।
 
এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল সোয়া ৮টায় ছাড়ে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস। শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টায় ছাড়ে উদয়ন এক্সপ্রেস। ভাড়া ১৪০ টাকা থেকে ৯৪৩ টাকা।
 
ঢাকার সায়দাবাদ, কমলাপুর, আরামবাগ থেকে হানিফ, শ্যামলী, মামুন, ইউনিক ইত্যাদি পরিবহনে অথবা কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সিলেট-গামী ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল এসে নামতে হবে। শ্যামলী পরিবহণ- ০২-৭৫৪০৯৯৩,০২৭৫৫০০৭১। সোহাগ পরিবহণ- ০২-৯৩৪৪৪৭৭, ০১৭১১-৬১২৪৩৩। সৌদিয়া -০১৯১৯-৬৫৪৮৫৮,০১৯১৯-৬৫৪৮৬১।
 
শ্রীমঙ্গল থেকে সিএনজি করে যেতে পারেন। যাওয়া আসা ঘণ্টা খানিক থাকা সব মিলিয়ে ভাড়া ৬০০ এর কম না। জীপ এ গেলে ভাড়া বেশী। বাস এ যেতে হলে রিক্সা করে চলে আসুন ভানুগাছা রোড বাস স্ট্যান্ড, সেখান থেকে বাস ভাড়া ১০ টাকা করে।
 
সকালে গেলে দেখতে পাবেন গাছের ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের খেলা। ছবি: ফয়সাল আকরাম।
 
কি দেখবেন: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে রয়েছে ৩টি প্রাকৃতিক ফুট ট্রেইল বা পায়ে হাঁটা পথ। ভ্রমণকারীরা তাদের সামর্থ্য ও সময় হিসেব করে তিনটি ট্রেইল এর মাঝ থেকে সুবিধাজনক ট্রেইল বেছে নিয়ে এটা ঘুরে দেখতে পারেন। ট্রেইল তিনটির মাঝে একটি ৩ ঘণ্টার, একটি ১ ঘণ্টার ও একটি ৩০ মিনিটের। ইকো-ট্যুর গাইডের সাহায্য নিয়ে প্রয়োজনীয় ফি দিয়ে উদ্যানটি ঘুরে দেখতে পারেন। এ পার্কে পর্যটকদের জন্য একটি তথ্যকেন্দ্র রয়েছে। এখান থেকে পাওয়া যাবে যাবতীয় তথ্য। উদ্যানের ভেতরে আছে একটি খাসিয়া গ্রাম। উঁচুনিচু টিলা-জুড়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গঠন। পাহাড়ি টিলার মাঝে দিয়ে এ বনে চলার পথ। বনের ভেতর দিয়েই বয়ে গেছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ছড়া। তবে এসব ছড়ার বেশির ভাগই বর্ষাকালে পানিতে পূর্ণ থাকে। সামান্য যে কটি ছড়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে, সেসব এলাকায় বন্য প্রাণীদের আনাগোনা বেশি। প্রধান সড়ক ফেলে কিছুদূর চলার পরে ভেতর দিয়েই চলে গেছে ঢাকা-সিলেট রেললাইন। এর পরেই মূলত জঙ্গলের শুরু। মূল সড়ক ছেড়ে জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করলে সাইরেনের মতো একধরনের শব্দ কানে আসে। এটি মূলত এ বনে থাকা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
 
প্রথম পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। পথের শুরুতে উঁচু গাছগুলোতে দেখা মিলতে পারে কুলু বানরের। নানা রকম গাছগাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ পথে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে-কেউ। নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে চলতে এই পথ শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানে। আর এক ঘণ্টার পথ হেঁটে একটু ভেতরে গেলে শুরুতেই চোখে পড়বে বিশাল গন্ধরুই, ঝাওয়া, জগডুমুর, কাঁঠালিচাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। পথের পাশে থাকা ডুমুর-গাছের ফল খেতে আসে উল্লুক, বানর ও হনুমান ছাড়াও বনের বাসিন্দা আরও অনেক বন্য প্রাণী। খাসিয়াদের বসতি রয়েছে মাগুরছড়া পুঞ্জিতে। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে থাকে। ১৯৫০ সালের দিকে বন বিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে।
 
জীব-বৈচিত্র্যের দিক থেকে লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম বনগুলোর একটি। আয়তনে ছোট হলেও এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। বনে প্রবেশের সাথে সাথেই নানা ধরনের বন্যপ্রাণী, পাখি এবং কীটপতঙ্গের শব্দ শোনা যায়। লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়।
 
এ বনে স্তন্যপায়ী আছে নানা প্রজাতির। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। বনের মধ্যে কিছু সময় কাটালেই উল্লুকের ডাকাডাকি কানে আসবে। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে মুখপোড়া হনুমান, বানর, শিয়াল, মেছো-বাঘ, বন্য কুকুর, ভালুক, মায়া হরিণসহ (বার্কিং ডিয়ার), নানা প্রজাতির জীবজন্তু। মায়া হরিণ সাধারণত উচ্চতায় ২০‌-২২ ইঞ্চি। এদের বাদামী রঙের দেহ যা পিঠের দিকে ঘিয়ে গাঢ় রং ধারণ করে।
 
এ বনে সরীসৃপ আছে নানা প্রজাতির। তার ভেতর অজগর হচ্ছে অনন্য। এখানে পাওয়া যায় হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ।
 
উদ্যানের বন্য পাখির মধ্যে সবুজ ঘুঘু, বনমোরগ, তুর্কি বাজ, সাদা ভ্রু সাতভায়লা, ঈগল, হরিয়াল, কালো-মাথা টিয়া, কালো ফর্কটেইল,  ধূসর সাত শৈলী, পেঁচা, ফিঙে, লেজকাটা টিয়া, কালোবাজ, হীরামন, কালো-মাথা বুলবুল, ধুমকল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ দর্শনীয় পাখির মধ্যে টিয়া, ছোট হরিয়াল, সবুজ সুঁইচোর, তোতা, ছোট ফিঙ্গে, সবুজ কোকিল, পাঙ্গা, কেশরাজ প্রভৃতির দেখা মিলে।
 
লাউয়াছড়ার বিশেষ আকর্ষণ হল, সেই ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া জুলভার্নের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে করা 'অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ' মুভিটির একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল এই বনে। ১৩টি দেশের ১১৪টি লোকেশনে চিত্রায়িত হয় ছবিটি। বন ঘেঁষে যে রেলপথ চলে গেছে, ঠিক সেখানেই হয়েছে ছবিটির কিছু দৃশ্যের শুটিং। ছবিটির একটি দৃশ্য ছিল এ রকম, ট্রেন ছুটছে, হঠাৎ চালক খেয়াল করলেন, লাইনের সামনে একপাল হাতি আপনমনে চড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রেন থেমে যায়, ট্রেনের কামরা থেকে নেমে আসেন নায়ক ডেভিড নিভেন, ব্যাপারটা কী দেখতে। সামনের গ্রামেই তখন হচ্ছিল সতীদাহ, নায়ক ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান। মেয়েটি হল শার্লি ম্যাক্লেইন। ছবির এই অংশটুকুই চিত্রায়িত হয়েছিল লাউয়াছড়ার রেললাইন এলাকায়। 
 
এক সময় পুরো সিলেট এলাকা জুড়ে এরকম চিরসবুজ বনের প্রাধান্য থাকলেও চা বাগানের সম্প্রসারণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আজ এই বনাঞ্চল অল্প কিছু সংরক্ষিত এলাকায় এসে ঠেকেছে। যেটুকু আছে, সেটুকুও সঠিক যত্নের অভাবে আস্তে আস্তে তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে। আমাদের আরও সচেতন হওয়া জরুরী। আমরা যখন বনে প্রবেশ করি, তখন আমাদের নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে আমরা বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ এর ক্ষতি করছি কি না, শব্দ দূষণ করছি কি না, ক্ষতিকর কিছু বনে রেখে আসছি কি না।
 
প্রিয় ট্রাভেল/ ড. জিনিয়া রহমান।
 
আপনাদের মতামত জানাতে ই-মেইল করতে পারেন [email protected] এই ঠিকানায়।