বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তিন চিত্রনায়িকা। ছবি: সংগৃহীত।
বাংলা সিনেমায় কীভাবে নারী উপস্থাপিত হচ্ছে?
আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০১৭, ২০:০২
(প্রিয়.কম) নারীকে হয়রানি করার দৃশ্য বাংলা চলচ্চিত্রে একটি সহজলভ্য বা প্রচলিত বিষয়। প্রায় প্রতিটি বাংলা সিনেমায় এই রকম দৃশ্য অবশ্যাম্ভী। ধর্ষণ, সামাজিক-পারিবারিকভাবে হেয় করা, নির্যাতিত হওয়া কিংবা শারীরিক ভাবে উত্যক্ত করার এই সকল দৃশ্য কী আসলে মানুষকে নির্মল আনন্দ দিতেই? নাকি এই দৃশ্যগুলোর মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা থেকেই এই রকম দৃশ্যের বারবার অবতারণা? যদি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেই এই সব নারীকে হেয় করে এই ধরনের দৃশ্য সিনেমায় সংযোজন করা হয়, প্রশ্ন তবুও থেকে যায়- এর মাধ্যমে কতটুকুই বা শিখছে বাংলার আপামর সাধারণ শ্রেণীর দর্শক?
নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলু পরিচালিত অত্যন্ত ব্যবসা সফল এবং জনপ্রিয় সিনেমা ছিল ‘মোল্লা বাড়ির বউ’। এই সিনেমার অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র বকুল (মৌসুমী) পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পা পিছলে হারান তার গর্ভে থাকা সন্তানকে। আর এরপরই তার উপর নেমে আসে শ্বশুর গাজী এবাদত উল্লাহ’র (এটিএম শামসুজ্জামান) অমানবিক নির্যাতন। গ্রাম বাংলার প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা থেকে বকুলের শ্বশুর ধরেই নেন- পুত্রবধূর উপর জ্বীনের আছর পড়েছে। আর তাই জ্বীন ছাড়ানোর নামে বকুলকে পেটানো হয় ঝাড়ু দিয়ে, নাকের কাছে মরিচ পুড়িয়ে জোরপূর্বক শোঁকানো হয়। গ্রামের হয়তো এটাই পরিচিত দৃশ্য, আর সিনেমার এই দৃশ্যের মতোই বাস্তবেও হয়তো এই রকম দৃশ্য দেখতে আশেপাশের মানুষের ভিড় বসে। কিন্তু এতগুলো মানুষের মধ্যে একজনকেও দেখা গেল না যে এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদ করছে। তাহলে বাস্তবের সাথে সিনেমার পার্থক্য কোথায়? একটি চলচ্চিত্র সামাজিক ভাবে মানুষকে সচেতন করতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু কোনো প্রতিকার না দেখিয়ে যদি গতানুগতিক সামাজিক অবস্থাই কেবল জনপ্রিয়তার উদ্দেশ্যে অথবা ব্যবসায়ীক লাভের আশায় সিনেমার দৃশ্যের তুলে দেওয়া হয়, তবে সেই সিনেমা নির্মাণের উদ্দেশ্যে সাথে চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যের সামঞ্জস্য থাকে না।

গ্রাম অথবা শহর, বাংলাদেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ নারী-শিশু নির্যাতিত হচ্ছে, সেটা রোধে চলচ্চিত্র একটি বিরাট বড় প্ল্যাটফর্ম। তবে আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে তা কতটাই বা প্রতিফলিত হচ্ছে? এ সময়ের কোনো চলচ্চিত্র নারী নির্যাতন রোধে দর্শকদের মনে প্রতিকার তৈরি করছে কি? নাকি নারীর দুর্বলতা, নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করার সেই আদিম পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাই বারবার চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে, একজন পুরুষ নারীকে যেভাবে দেখতে চায়, সেভাবেই বারবার উপস্থাপন করা হচ্ছে? আর হয়তো এ কারণেই ধর্ষণের দৃশ্য দেখেও একদল পুরুষ সিনেমা হলে সিটি বাজিয়ে থাকেন, ভুলে যান হয়তো একটা সিট পরেই একজন নারী বসে আছে তাদের মাঝে। নারীকে এভাবে উপস্থাপনও তাদের জন্য এক নির্মল আনন্দের বিষয়, যেমনটা তারা মনে মনে ভেবে থাকেন।
এ ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকলের কিছু সুনির্দিষ্ট দায় থেকে থাকে। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা; কিংবা সিনেমাটি নির্মাণে যিনি অর্থলগ্নি করে থাকেন- তাদেরকেই মূলত ভাবতে হবে, ব্যবসায়িক ভাবে লাভবান হওয়ার জন্য এ রকম সস্তা-সুড়সুড়ি দেওয়া, নারীকে লাঞ্ছিত হওয়া, ধর্ষিত হওয়ার দৃশ্যগুলো তারা আর কতদিন দেখাবেন। শুধু তাদেরই নয়, ভাবতে হবে অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীদেরও। তাদের অভিনয়ে যেমন দর্শকদের মুগ্ধতার শেষ থাকে না, তেমনই তাদের একটা ভুল এক্সপ্রেশন, ভুল চরিত্র উপস্থাপন কিংবা ভুল এপ্রোচ কিন্তু হাজারো ভক্তকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট। ফলে শুধু অভিনয়ের খাতিরে কিংবা জনপ্রিয়তা অথবা খ্যাতির মোহে যে কোনো দৃশ্যে অথবা চরিত্রে অভিনয় করা উচিৎ কিনা, সেটা ভেবে নেওয়া প্রয়োজন।
নাটক অথবা চলচ্চিত্রকে বলা হয়ে থাকে সমাজের প্রতিফলন, সেক্ষেত্রে যদি সচেতন না হয়ে ‘সুন্দরী চলেছে একা পথে/সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে’ টাইপ গান গাওয়ার মাধ্যমে নায়িকাকে ধাওয়া করা হয় অথবা জড়িয়ে ধরা হয় তবে দর্শকদের মন পরিবর্তিত না হয়ে বরং আরো বেশি উত্যক্তকারী হওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেওয়ারই আশঙ্কা থেকে যায়। নারী চরিত্র নির্মাণে তাই আরো বেশি সচেতন হয়ে উঠা জরুরি, নাহলে এ ধরনের হয়রানিমূলক দৃশ্য বারবারই বাংলা সিনেমায় জনপ্রিয় হতে থাকবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
প্রিয় বিনোদন/গোরা