হিমু দিবসে হিমু আড্ডা। ছবি- ড. জিনিয়া রহমান

হুমায়ুনের জন্মদিনে হিমু আড্ডায়

আফসানা সুমী
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০১৭, ২১:২৯
আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৭, ২১:২৯

(প্রিয়.কম) “চাঁদের বিশালতা মানুষের মাঝেও আছে, চাঁদ এক জীবনে বারবার ফিরে আসে…ঠিক তেমন মানুষ প্রিয় বা অপ্রিয় যেই হোক,একবার চলে গেলে আবার ফিরে আসে..” হুয়য়ূন আহমেদ বলেছিলেন এই কথা! কিন্তু কই তিনি তো ফিরে আসেন নি! আবার অন্যভাবে ভাবলে নিজের কালজয়ী শত শত লেখায় তিনি যেভাবে আজও বেঁচে আছেন তাতে বলতে হয় তিনি কোনোদিন আমাদের ছেড়ে যাননি।

হুয়য়ূন আহমেদ। একটি শক্তিশালী নাম। তার লেখনীশক্তি যতটা প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে ততটা হয়ত আর কারও লেখা কখনো পারেনি। আমাদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সমৃদ্ধ। অনেক গুণী লেখক পেয়েছি আমরা। তবে হুমায়ুন সেখানে একেবারে ভিন্ন ধারার একজন লেখক। তিনি কথা বলেছেন জীবন নিয়ে, যে জীবনে আমরা শ্বাস নিই, বাঁচি। রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যান নি আবার কল্পনা করতে ঠিকই শিখিয়েছেন হলুদ হিমুকে দিয়ে। জটিল মনোস্তত্ত্ব বা জীবনের ধাঁধাগুলো তিনি সমাধান করেছেন মিছির আলীর মতো মজার চরিত্র দিয়ে।  মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে, হতাশাগ্রস্থ না করে সব সমস্যার সমাধান বের করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। একই সাথে লেখায় তিনি নিয়ে এসেছেন প্রেম, বন্ধুত্ব, পরিবারের দ্বন্দ সবই।

আজ ১৩ নভেম্বর হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন। এই দিনে ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের পিতার নাম ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শহীদ হন ফয়জুর রহমান। পেশায় তিনি পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। পিরোজপউর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন তিনি। এভাবে যুদ্ধ কেঁড়ে নিয়েছিল হুমায়ুন পরিবারের মাথার ছাদ।

himu

হিমু আড্ডার প্রবেশপথ। ছবি- ড. জিনিয়া রহমান

লেখালেখি করার প্রতিভা হুমায়ুন পরিবারের প্রত্যেকের মাঝেই ছিল। বলা যায়, পারিবারিক একটা সাহিত্যবোদ্ধা পরিবেশ পেয়েছিলেন হুমায়ুন সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। তিনি একটি বই লিখেছিলেন যার নাম ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’। হুমায়ুন মাতা কখনোই লেখিকা ছিলেন না। তবে নিজ জীবনী গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তার লেখা বই এর নাম ‘জীবন যে রকম’। এমন এক্টী পরিবারে সবসময়ই নিজেকে বিকাশের সুযোগ পেয়েছেন হুমায়ুন। তার ব্যক্তিত্বও ছিল সেরকমই। মানুষকে দেখতে, মানুষের আচার-আচরণকে পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসতেন তিনি। তার সব লেখাই সংলাপ নির্ভর। নেপথ্যে কেউ গল্প বলবে, চরিত্রদের সম্পর্কে পাঠককে জানাবে উপন্যাসের এই চিরাচরিত রীতি হুমায়ুন আহমেদের পছন্দ ছিল না। তিনি চরিত্রদেরকেই কথা বলাতেন। আর তাই হয়ত তার লেখা হিমু, রূপা, মিসির আলী এতটা জীবন্ত হয়ে গেঁথে গেছে মানুষের মনে।

সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে হিমু। হলুদ পাঞ্জাবি পরা এলোমেলো স্বভাবের কিন্তু দারুণ বুদ্ধিমান এই যুবক কিশোর তরুণদের জন্য অনুসরণিয় এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিল। এখনো হুমায়ুনের জন্মদিনে যুগলরা হিমু আর রূপা সেজে পথে নামে, ঘুরতে যায়। কারণ প্রিয় লেখকের জন্মদিন মানে তো উৎসব। আর এই দিনে তার জন্য তার লেখা কোনো চরিত্রকে নিজের মাঝে বাঁচিয়ে তোলার চেয়ে দারুণ উপহার আর কি হতে পারে? হিমু, রূপা বেশ ধারণ হলো, কিন্তু কোথায় যাবেন? যেতে পারেন ‘হিমু আড্ডা; থিম ক্যাফেতে। যার অবস্থান অপরূপ নদ ব্রহ্মপুত্রের তীরে।

হুমায়ূনকে ভালোবেসে তার একদল তরুণ ভক্ত নির্মান করেছেন ‘হিমু আড্ডা’ রেস্টুরেন্ট। কোনো বিশেষ দিনকে ঘিরে আড্ডা হবে না এখানে। আড্ডা হবে প্রতিদিন, যে কোনো সময়। যখন আপনি চান। ২০১৩ সালের পহেলা মার্চ যাত্রা শুরু করে হলুদ রঙা এই দোতলা রেস্টুরেন্টটি। ফারজানা ইয়াসমিন, আবদুল্লাহ আল মাসুদ, সাইফুল ইসলাম টিটু নামের তিন হুমায়ুন ভক্ত লেখকের মৃত্যুর পরের বছর তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেন। 

himu
হিমু আড্ডার মেনু। ছবি- ড. জিনিয়া রহমান

হলুদ হিমু আর নীল রূপার হিমু আড্ডা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। কথা সাহিত্যিকদের জন্য এখানে আছে হিমু আড্ডার ২য় তলায় আলাদা কর্ণার। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লিখে ফেলতে পারেন কোনো কবিতা। হুমায়ুন আহমেদের লেখালেখির শুরুটাও কিন্তু হয়েছিল কবিতা দিয়েই। যদিও উপন্যাসেই যেন তাকে সবচেয়ে বেশি কাছে পাই। আরেকটা হিমুর উন্মাদনাময় উপন্যাস না পাওয়ার দুঃখ থাকবে তার ভক্তদের মনে। তবে যতটা পাওয়া গেল তাই নিয়ে উন্মাদ হয়ে কাটানো যাবে এক জীবন। 

তিনশতাধিক গল্পগ্রন্থ আর উপন্যাসের লেখক হুমায়ুনের জন্ম নাম শামসুর রহমান। এক সময় তাকে বাচ্চু নামেও ডাকা হতো। বাবা ছেলে-মেয়েদের নাম বদলাতে ভালোবাসতেন। তিনিই পরে প্রিয় পুত্রের নাম দেন হুমায়ুন আহমেদ। এই নাম আজ বাংলার সাহিত্যের আকাশে চিরঞ্জীব তারা। আরেকজন হুমায়ুন আহমেদের জন্য জাতিকে হয়ত অপেক্ষা করতে হবে শত বছর। 

হিমু আড্ডার অবস্থানঃ কাচারী ফেরিঘাট, ব্রহ্মপুত্র নদের তীর, ময়মনসিংহ

সম্পাদনাঃ ড. জিনিয়া রহমান

প্রিয় ট্রাভেল সম্পর্কে আমাদের লেখা পড়তে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেইজে। যে কোনো তথ্য জানতে মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়। ভ্রমণ বিষয়ক আপনার যেকোনো লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন এই লিংকে - https://www.priyo.com/post