হুমায়ূন আহমেদের "দেয়াল" নিয়ে সোশ‌্যাল মিডিয়াতে হৈ চৈ

priyodesk
লেখক
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০১২, ০৮:১৮
আপডেট: ১৬ মে ২০১২, ০৮:১৮

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক এবং নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। সম্প্রতি তার প্রকাশিতব্য রাজনৈতিক উপন্যাস 'দেয়াল' নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। হাইকোর্ট থেকে বইটির তথ্য সংশোধনের আদেশ দেয়া হয়েছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হুমায়ূন আহমেদ কয়েকদিনের জন্য দেশে এসেছেন। আর এ সময়ে তার অপ্রকাশিত উপন্যাস নিয়ে চলছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে তর্ক বিতর্ক। এসব তর্ক বিতর্কের সংকলন তুলে ধরা হলো এই পোস্টে। খবরের সূত্র: বিবিসি বাংলা বাংলাদেশে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা দেয়াল নামের একটি উপন্যাস সংশোধন না করে তা প্রকাশের উপর গত ১৫ মে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হাইকোর্ট।

এই উপন্যাসে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার বিবরণে তথ্যগত ভুল রয়েছে, এমন অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের এটর্নি জেনারেল আদালতের নজরে এনেছিলেন। আদালত উপন্যাসটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নে কারণ দর্শানোর নোটিশও জারি করেছে। তবে আদালত এই মর্মে আশা প্রকাশও করেছেন যে ওই ভুল সংশোধন করে বইটি প্রকাশ করা হবে। কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা দেয়াল নামের উপন্যাসটি এখনো বই আকারে প্রকাশ হয়নি। এর অংশ বিশেষ দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশ হয় গত এগারোই মে। ১১ মে দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হওয়া দেয়ালের দুই অধ্যায়। এ পর্যন্ত প্রকাশিত উপন্যাসের অংশের ভিত্তিতেই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুব আলম হাইকোর্টের নজরে এনেছেন যে, উপন্যাসটিতে ইতিহাসের একটি ঘটনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তথ্যগত ভুল রয়েছে। তিনি আদালতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে এই উপন্যাসে। কিন্তু ঘটনার বর্ণনায় শেখ মুজিবের ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে হত্যার বর্ণনা সঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে খন্দকার মোশতাক আহমেদ জড়িত ছিলেন বলে মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে উঠে এসেছে। কিন্তু মোশতাক আহমেদ কিছুই জানতেন না, এমনটাই তুলে ধরা হয়েছে ঐ উপন্যাসে।’ মাহবুবে আলম বলেন সে কারণেই তিনি বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছেন। হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ উপন্যাসটির তথ্য সংশোধন করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সেই মর্মে তথ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে। খবরের সূত্র: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, উপন্যাসে তথ্যগত ভুল সংশোধন না করা পর্যন্ত তা প্রকাশের উপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে লেখক হুমায়ূন আহমেদের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে এবং শেখ মুজিব হত্যা মামলার বিচারের পেপারবুকসহ সব কাগজপত্র তাঁকে দেওয়ার জন্যও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বইটিতে এক জায়গায় লিখা হয়েছে, `বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ তাদের মাঝখানে রাসেলকে নিয়ে বিছানায় জড়াজড়ি করে শুয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। ঘাতক বাহিনী দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। ছোট্ট রাসেল দৌড়ে আশ্রয় নিল আলনার পেছনে। সেখান থেকে শিশু করুণ গলায় বললো, তোমরা আমাকে গুলি করো না। শিশুটিকে তার লুকানো জায়গা থেকে ধরে এনে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হলো।` কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ঘটনার একটি স্বীকৃত বিবরণ রয়েছে। তাতে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে রমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে রাসেলকে হত্যা করা হয়। প্রথম আলোর ১১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেয়াল` হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশিতব্য রাজনৈতিক উপন্যাস। এ উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭৫ সালে ঘটে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য রাজনৈতিক ঘটনা। সাময়িকীর পাঠকের জন্য সুবিশাল এ উপন্যাসের দুটি অধ্যায় এখানে ছাপা হলো।`` এর একটি অংশে বলা হয়, "ঢাকা মসজিদের শহর। সব মসজিদেই ফজরের আজান হয়। শহরের দিন শুরু হয় মধুর আজানের ধ্বনিতে। আজান হচ্ছে। আজানের ধ্বনির সঙ্গে নিতান্তই বেমানান কিছু কথা বঙ্গবন্ধুকে বলছে এক মেজর, তার নাম মহিউদ্দিন। এই মেজরের হাতে স্টেনগান। শেখ মুজিবের হাতে পাইপ। তাঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি এবং ধূসর চেক লুঙ্গি।" বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং বিকল্প গণমাধ্যমে লেখালেখি শুরু হয়েছে। সেগুলো থেকে বাছাই কিছু লেখার লিংক এখানে দেয়া হলো: ঘৃণার দেয়াল গড়বেন না প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ - ফজলুল বারী, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম হুমায়ূন আহমেদ, দেয়াল এবং দায়মুক্তি… অমি রহমান পিয়াল, অতিথি লেখক, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক এবং সাপ্তাহিক ২০০০-এর সম্পাদক মইনুল আহসান সাবের ফেসবুকে স্ট‌্যাটাস দিয়েছিলেন -"আচ্ছা, হুমায়ূন আহমেদ যদি আদালতের "অনুরোধ " না রাখেন তাহলে কী হবে ?" এটা হয়তো আদালত অবমাননার মতো বিষয় হয়ে দাড়াবে। তবে ইত্তেফাকের রাজীব নূর ফেসবুকে বলেছেন, "খুব কষ্ট লাগলো , আমরা কি কোন দিন গুণী মানুষে কদর করতে জানবো না ? লেখকের স্বাধীন স্বত্তা থাকবে, পাঠক পড়ে নিজ বিবেচনায় লেখা গ্রহণ করবে। কাপুরুষ জাতিই লেখককে কাটগড়ায় দাড় করায়...,আদালতের আদৌ এখতিয়ার আছে কিনা (?)একজন লেখককে তাঁর লেখা পরিবর্তন করতে বলতে পারেন। অশ্লীল বা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কিছু থাকলে বই নিষিদ্ধ করতে / বলতে পারেন কিন্তু পরিবর্তন! যদি তাই হয় তাহলে বাংলাদেশে এখনো বর্তমান এ রকম অসংখ্য বিতর্কিত বইয়ের কি হবে?" তবে, মনোয়ার মনা নামের একজন পাঠক বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন, "ভাই... কি আর হবে ! উনাকে নিয়ে আরো কিছুদিন লেখালেখি হবে..আরো কিছু ঘটনা হয়ত ঘটবে সবচে বড় কথা প্রকাশিতব্য ''দেয়াল'' আরো প্রচার পাবে...পড়ার আগেই পাঠকপ্রিয় হয়ে পরে কাটতি বাড়াবে এমনি এমনি এসব ঘটবে । ভদ্রলোকের 'শংখনীল কারাগার','নন্দিত নরকে' ও 'শ্যামল ছায়া ' ছাড়া যে আমি আর কোনো লেখা পড়িনি সে আমিই হয়ত আবার পড়ব। বিতর্কিত জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতুহল চিরকালই দূর্বার থাকে এটা কে না জানে ! আমিত ভাবছি পরে "অসংশোধিত" কপিটা ম্যানেজ করার চেষ্টা করব ।" বিশিষ্ট ব্লগার আরিফ জেবতিক বলেছেন, "বাংলাদেশের ইতিহাস কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। হুমায়ুনের বইতে ইতিহাস নিয়ে অনেক সমস্যা আছে। তাই বইটি প্রকাশ করা ঠিক হবে না। এটা বন্ধ হওয়া উচিৎ।" তবে জুলফিকার শাহাদাত নামের একজন বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, "আমরা লেখকের স্বাধীনতার কথা বলি। স্বাধীনতার স্বরূপ কি এই? ইতিহাস আর উপন্যাস দুটি দু জিনিস। হুমায়ূন কোন ইতিহাস লিখতে যান নি। তিনি উপন্যাস লিখেছেন। বাজারে এ ধরনের ইতিহাস মিশ্রিত একাধিক উপন্যাস রয়েছে। 'দেয়াল' আরেকটি নতুন সংযোজন শুধু। এ মুহূর্তে হুমায়ূন আহমেদ রণেভঙ্গ দেবেন বলে আমার মনে হয় না। কারণ আমি জানি, তিনি নির্মোহ প্রজাতির মানুষ। মুখোশ ও মুখ তার এক। আমি এটাও জানি , তাঁর পিতৃহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কারাবন্দি সাঈদীর ছেলের বিয়েতে তিনি উপহার পাঠিয়েছেন। সম্ভবত বরযাত্রীও ছিলেন। এ ধরনের দৃঢচেতার মানুষ এসময় বিরল। যিনি নিজেও স্বীকার করেন তার নানা রাজাকার ছিলেন। এবং তার নানার মত ভাল মানুষ আর দ্বিতীয়টি তিনি দেখেননি। মানুষ উপন্যাস থেকে ইতিহাসের পাঠ নেয় না, বরং ইতিহাসের সাথে উপন্যাসের মিল খোঁজে। এ ধরনের একটি বইকে ঘিরে যদি আদালতে যেতে হয়, তাহলে আদালতেই থাকতে হবে আমাদের শত শত লেখকদের। সে বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। আমরা যেভাবে হুমায়ুন আজাদের বা তসলিমা নাসরিনের লেখালেখির স্বাধীনতা চাই, অনুরূপ হুমায়ূন আহমেদও তার লেখার স্বাধীনতা ভোগ করুক এ দাবী জানাচ্ছি। আর হুমায়ূন আহমেদ যে তাঁর অবস্থান থেকে একটুও পিছ পা হবেন না এ বিশ্বাস আমাদের আছে। ইতোপূর্বেও তিনি তার দৃঢ মনোবলের পরিচয় রেখেছেন।" কবি সেজান মাহমুদ তার স্ট্যাটাস লিখেছেন এভাবে - "ইতিহাস থেকে কিছু চরিত্র নিয়ে তাঁদের মুখে সংলাপ ধরিয়ে দিলেই ঐতিহাসিক উপন্যাস হয় না; ঐতিহাসিক উপন্যাস কেও আগে উপন্যাস হতে হয়। সে-বচন-১৪৯"। খন্দকার সোহেল নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী তাতে লিখেছেন, "হাত দুইটাকে এত বলি-'নীচে নাম। তোর কাজ শৌচাকার্যের মল পরিষ্কার করা'। তবুও হাত দুইটা খালি উপরে উঠবার চায়। আবার বলি-'বড্ড বেশি বুঝিস তুই। আরে প্রতিবাদী হয়ে নয়; তুই থাকবি চাকর হয়ে। উনুনের কড়াই মাজবি, দাদার পায়ের জুতোর ধূলি ধুবি, আদাব-আদাব করে পদতলে লুটিয়ে পড়বি। এ সবই নিম্নস্থানের কার্য-রে ব্যাটা; উচ্চে নয়'। তবুও হাত উপরে উঠবার চায়। শেষমেশ হাতকে বলিয়া দিয়াছি-'তোর কপালে দু:খ আছে; হাতকড়া আসল বলে। ব্যাটা তুই লাল দালানে যাবার চাও? যা। তবে আমারে ছাড়িয়া যা'।" মিলি সুলতানা লিখেছেন, "উনার মাথাটা সেদিনই গেছে যেদিন উনি হুমায়ুন আজাদের মেরে ফেলাকে সমর্থন করেছিলেন। সেই দাগটা আমার বুকে আজো জ্বলজ্বল করছে।" পাশাপাশি হুমায়ুন আহমেদকে জাতিসংঘের বাংলাদেশের চাকুরী থেকে বাদ দেয়া হবে কি না, সেটা নিয়েও আলোচনায় মুখর সোশ্যাল মিডিয়া। ব্লগে এখন সব বিষয় নিয়েই উম্মুক্ত আলোচনা হয়। তাই হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল উপন্যাস নিয়ে সরগরম বাংলা ব্লগাঞ্চল: সাহিত্যের দেয়াল-দেয়ালের সাহিত্য: ফ্রম হুমায়ূন আহমেদ টু আনোয়ার শাহাদাত - ব্লগার: কুলদা রায়, ব্লগ: সচলায়তন "দেয়াল" হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের শুভ মহরত, ১৫ আগস্টকে গল্প বানানো আর পাকি সেনা মেহন। - ব্লগার: কর্নফুলির মাঝি, ব্লগ: আমার ব্লগ হুমায়ুন আহমেদের "দেয়াল" সুপার হিট। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা ব্যায়ের সমুদয় অর্থ এবার সুদে আসলে উঠানো যাবে, ইতিহাস গোল্লায় যাক.. - ব্লগার: নাসিম রূপক, ব্লগ: আমার ব্লগ দেয়াল সম মিথ্যাচার---হুমায়ন আহমেদ -ব্লগার: আমি_শাওন, ব্লগ: সামহ্যোয়ারইনব্লগ আলোচনা চলছে, এবং হয়তো চলবে আরো কিছু দিন!