ছবি সংগৃহীত
শুভ জন্মদিন নির্মলেন্দু গুণ!
প্রকাশিত: ২১ জুন ২০১৩, ০৭:৫০
আপডেট: ২১ জুন ২০১৩, ০৭:৫০
আপডেট: ২১ জুন ২০১৩, ০৭:৫০
কেবল কবিতা লিখলেই "কবি" সম্বোধন শুনতে পাওয়া যায় না। "কবি" রূপে সম্মান পাওয়ার জন্য হতে হয় বিরল প্রতিভার অধিকারী। আর বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় "কবি" হবার সম্মানে যারা ভূষিত, তাঁদের মাঝে একজন অতি অবশ্যই কবি নির্মলেন্দু গুণ। নির্মলেন্দু গুণ বাংলা ভাষার অন্যতম বিখ্যাত এক কবি। তাঁর জনপ্রিয়তা আর কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই, সকল বয়সী কবিতা প্রেমীদের উচ্চারণে তাঁর কবিতা ফেরে। জন্ম নিয়েছিলেন ২১ জুন, ১৯৪৫ সালে। বাংলা আষাঢ় ৭, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ। জন্মস্থান কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণা। কেবল জনপ্রিয় নন, বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন তিনি। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন।

শৈশব ও শিক্ষা জীবন-
কবির শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামে। বাবা সুখেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী, মাতা বীণাপাণি। এই দম্পতির ৩ কন্যা ও ২ পুত্রের কনিষ্ঠ পুত্র হচ্ছেন নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী। মাত্র ৪ বছর বয়সে মাতৃ বিয়োগ ঘটে। মা মারা যাবার পর তাঁর বাবা আবারও বিয়ে করেন। লেখা পড়ার হাতেখড়ি নতুন মা চারুবালার হাতেই। ৩য় শ্রেণীতে, প্রথম স্কুলে ভর্তি হন বারহাট্টা স্কুলে। ক্লাসে বসেই একদিন লিখে ফেলেন একটি ছড়া, স্কুলকে নিয়ে। কবিতা লেখার শুরু ঠিক এভাবেই। মেট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’৷ মেট্রিকের পর আই.এস.সি পড়তে চলে আসেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে৷ মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপসহ পড়তে থাকেন এখানে৷ নেত্রকোণায় ফিরে এসে নির্মলেন্দু গুণ আবার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকা ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছে আসার সুযোগ পান৷ নেত্রকোণার সুন্দর সাহিত্যিক পরিমন্ডলে তাঁর দিন ভালোই কাটতে থাকে৷ ১৯৬৪ সালের জুন মাসে আই.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা কলেজের৷ পরবর্তীতে বাবা চাইতেন ডাক্তারী পড়া৷ কিন্তু না তিনি চান্স পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে৷ ভর্তির প্রস্তুতি নেন নির্মলেন্দু গুণ ৷ হঠাত্ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয় ঢাকায়৷ দাঙ্গার কারণে তিনি ফিরে আসেন গ্রামে৷ ঢাকার অবস্থার উন্নতি হলে ফিরে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম ভর্তি লিষ্ট থেকে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া৷ আর ভর্তি হওয়া হলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ফিরে আসেন গ্রামে৷ ১৯৬৫ সালে আবার বুয়েটে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷ ডাক পড়ে ভাইভা বোর্ডে৷ তখন পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হতো৷ আর বেশ কিছু হিন্দু ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার চাকরি ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল বলে ভর্তিচ্ছুদের পারিবারিক অবস্থা জেনে নেবার চেষ্টা করতেন প্রশ্নকর্তারা৷ নির্মলেন্দু গুণ পরিষ্কার করেন যে, তাঁর এক ভাই ভারতে থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার হলে তিনি দেশেই থাকবেন৷ কিন্তু ভাইভা বোর্ডে পাঠ্যসূচী থেকে কোন প্রশ্ন না করেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে৷ ততদিনে সামপ্রদায়িকতার কালো শেকড় অনেক জায়গাতেই প্রথিত হয়েছে৷ একবুক কষ্ট নিয়ে ফিরে আসেন আনন্দমোহনে৷ আই.এস.সি-তে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন৷ মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা৷ তখনকার দিনে অনেক টাকা৷ সেই অর্থের ভরসায় ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বি.এ. পাশ করেন তিনি। যদিও বি.এ. সার্টিফিকেটটি তিনি কখনোই তোলেননি।
কর্মজীবন-
৬৯-এর প্রথম দিকে রেডিওতে কবিতা পাঠের আসরে ডাক পান নির্মলেন্দু গুণ ৷ ঢাকায় তাঁর প্রচুর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে৷ তিনি লিখতেন সংবাদ, আজাদ, পাক জমহুরিয়াত, জোনাকী প্রভৃতিতে৷ প্রকাশিত হয় তাঁর কলাম ‘ফসল বিনাসী হাওয়া’৷ ২১ জুলাই ১৯৭০৷ তরুণ কবিদের কবিতা পাঠের আসরে পাঠ করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘হুলিয়া’৷ ‘হুলিয়া’ তাঁকে কবি খ্যাতি এনে দেয়৷ বড় বড় লেখকরা তাঁর কবিতার প্রশংসা করেন৷ সমালোচনা লেখেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী ‘তৃতীয় মত’ কলামে৷ খান ব্রাদার্স বের করে তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’৷ পশ্চিম বঙ্গের শক্তিমান লেখক শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘পূর্ব বাংলার শ্রেষ্ট কবিতা’ গ্রন্থে ছাপেন ‘হুলিয়া’ কবিতাটি৷ এর পর আর থেমে থাকার সময় কোথায়? প্রেম ও গণমানুষকে তাঁর কবিতার বিষয় বস্তুতে পরিণত করে একে একে লিখে চলেন কবিতা, অমীমাংসিত রমণী, চৈত্রের ভালোবাসা, তার আগে চাই সমাজতন্ত্রসহ আরও অনেক কবিতার বই৷ স্বাধীনতার পূর্বপর্যন্ত চাকরি করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কন্ঠস্বর’, আহমদ রফিক সম্পাদিত ‘নাগরিক’, ‘পরিক্রম’ ও ‘জোনাকী’ পত্রিকায়৷ এর পর আবিদুর রহমান সম্পাদিত ইংরেজী পত্রিকা ‘পিপল্’ এ কাজ নেন সাব-এডিটর হিসেবে৷ স্বাধীনতার পর কাজ করেছেন আল-মাহমুদ সম্পাদিত ‘গণকন্ঠ’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে৷ এরপর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন ‘সংবাদ’ ও ‘দৈনিক বাংলার বাণী’-তে৷ এখান থেকে চাকরি নেন ‘বাংলাবাজার’ পত্রিকায় সাহিত্য ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে৷ এরপর ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি কাজ করেছেন ‘দৈনিক আজকের আওয়াজ’ নামে একটি পত্রিকায় যেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি আর কোথাও চাকরি করেননি৷ এখন তিনি তাঁর লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রেমাংসুর রক্ত চাই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। ১৯৭১ সালে নির্মলেন্দু গুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, ভারতের আকাশবাণীতে কথিকা পাঠ করতেন তিনি। কবিতা আবৃত্তি করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যোগাতেন। মুক্তিযুদ্ধের একজন শব্দযোদ্ধা হিসেবে নির্মলেন্দু গুণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে ছিলেন।
ব্যক্তিগত-লেখক জীবন ও পুরস্কার-
ব্যক্তিগত জীবনে এই কবি এক কন্যাসন্তানের জনক৷ তাঁর মেয়ের নাম মৃত্তিকা গুণ৷ তিনি এখন পড়াশুনা শেষ করে চাকরি করছেন৷ নির্মলেন্দু গুণ সাহিত্য সাধনার জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরষ্কার(১৯৮২), একুশে পদক(২০০১), আলাওল সাহিত্য পুরষ্কার, কবি আহসান হাবীব সাহিত্য পুরষ্কার৷ তিনি নিজ গ্রাম কাশতলায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘কাশবন বিদ্যা নিকেতন’ নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়৷ তাঁর বিখ্যাত কবিতা গুলোর মাঝে বহুল আবৃত্ত কবিতাসমূহের মধ্যে - হুলিয়া, অসমাপ্ত কবিতা, মানুষ (১৯৭০ প্রেমাংশুর রক্ত চাই), আফ্রিকার প্রেমের কবিতা (১৯৮৬ নিরঞ্জনের পৃথিবী) - ইত্যাদি অন্যতম। লেখা লিখির সুদীর্ঘ জীবনে লিখেছেন অসংখ্য কাব্য গ্রন্থ, ছড়ার বই ও গল্প গ্রন্থ লিখেছেন একটি করে, চারটি লিখেছেন আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ। এছাড়া একটি গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। দুই যুগেরও বেশী সময় ধরে কবিতা লিখে চলেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। জন্মদিনে তাঁর জন্য অনেক শুভেচ্ছা। আরও দীর্ঘকাল কবিতা লিখতে থাকুন আমাদের মাঝে, এটাই কামনা। তথ্য সূত্র- উইকিপিডিয়া, গুণীজন, আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ- ট্যাগ:
- বই
- লাইফ
- জীবন চর্চা
১ ঘণ্টা, ২৫ মিনিট আগে
২ ঘণ্টা, ৩ মিনিট আগে
২ ঘণ্টা, ৪ মিনিট আগে
২ ঘণ্টা, ৫ মিনিট আগে
২ ঘণ্টা, ৭ মিনিট আগে
৯ ঘণ্টা, ২৩ মিনিট আগে
৯ ঘণ্টা, ২৫ মিনিট আগে
১৩ ঘণ্টা, ৩১ মিনিট আগে