(প্রিয়.কম) ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশে গণহত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাড়ি লারকানা হাউজে। আর তা হয়েছিল গণহত্যা শুরুর একমাস আগে। পাখি শিকারের কথা বলে লারকানায়ই ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল পাকিস্তানি জেনারেলদের নিয়ে।
সেসময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির সভাপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে লারকানায় ‘পাখি শিকার’ করতে আমন্ত্রণ জানান। আর সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি লারকানায় ভুট্টোর বাড়িতে ইয়াহিয়া, সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদ, প্রধান স্টাফ অফিসার লে. জে. পীরজাদা ওমসহ আরো পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা মিলিত হন। সেখানেই বাংলাদেশে গণহত্যার পরিকল্পনা হয়। যা পরে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাস্তবায়ন করা হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে।

বাঙালি হত্যার এ পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল আহসান এবং ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান সম্মত হননি। তাই তাদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এর আগে বেসামরিক মন্ত্রিসভা বাতিল করা হয়।
২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে একযোগে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ঢাকায় তখনকার বিডিআর (ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসে। তারা গোলা নিক্ষেপ করে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে, হামলা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বস্তি এলাকায়। ইতিহাসের এই নির্মম নিধনযজ্ঞ সেই রাতেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে, বাংলাদেশে। ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়নারা।

‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের গণহত্যা ষড়যন্ত্রে যারা অংশ নিয়েছিলেন সেই জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া এবং জেনারেল হামিদ মনে করেছিলেন, ২০ হাজার মানুষ হত্যা করলেই ভয় পাবে বাঙালিরা, স্বাধীনতা এবং স্বাধিকারের কথা আর বলবে না।
কিন্তু ২৫ মার্চ মধ্যরাতেই রাজারবাগ থেকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ, শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাসের মুক্তি সংগ্রামে ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম রাজা ও গুল হাসান খান তাদের আত্মজীবনীমূলক বইয়ে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর কথা বলেছেন৷ কারা এই গণহত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের নামও লেখা হয়েছে খাদিম রাজার ‘স্ট্রেঞ্জার ইন ওন কান্ট্রি’ বইতে৷ আর পাকিস্তান সরকার নিজেই মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘ক্রাইসিস ইন পাকিস্তান' শিরোনামে। তাতে একপেশে তথ্য পরিবেশন করা হলেও গণহত্যার ভয়াবহতা বোঝা যায়৷

১৯৭২ সালে পাকিস্তান সরকার একটি কমিশনও গঠন করেছিল৷ হামিদুর রহমান কমিশনের ওই রিপোর্ট সরকারিভাবে কখনো আলোর মুখ দেখেনি৷ কিন্তু রিপোর্টের অনেক তথ্যই এখন জানা যায়৷ তাতেও ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের গণহত্যার ষড়যন্ত্রের জন্য প্রধানত জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল হামিদ ও টিক্কা খানকে দায়ী করা হয়। আর তদন্ত রিপোর্টে নয় মাসের গণহত্যার কথা উল্লেখ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা হয়েছিল যে লারকানা হাউজে সেখানেই মৃত্যুর পর জুলফিকার আলি ভুট্টোকে দাফন করা হয়।