ছবি সংগৃহীত
মাটির ময়না... ছায়াছবির বুননে এক অনবদ্য কাব্য
আপডেট: ২৮ মার্চ ২০১৩, ০৭:৪৩
বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা, হিন্দি সিনেমা আর অ্যাকশনধর্মী ইংরেজি সিনেমা তো আমরা প্রায়ই দেখে থাকি। কিন্তু স্বাধীনতার এই মাসে একটি ভিন্নধর্মী কাহিনী নিয়ে রচিত অসধারন একটি বাংলা ছবি দেখতে পারেন আপনার পুরো পরিবারকে নিয়ে- মাটির ময়না! মাটির ময়না তারেক মাসুদ পরিচালিত একটি বাংলা চলচ্চিত্র। ছবিটি ২০০২ সালে মুক্তি পায়। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বেগের পটভূমিতে তারেক মাসুদের মাদ্রাসায় জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে ঐতিহাসিক ঘটনার উদ্ধৃতি থাকলেও সেগুলো একটি কিশোরের মানবিক অভিজ্ঞতায় প্রকাশিত হয়েছে। মাদ্রাসায় তার শিক্ষক, সহপাঠীদের আচরণ আর পরিবারের সদস্যদের সাথে তার সম্পর্কের ভিতর দিয়ে চলচ্চিত্রটির কাহিনী এগিয়ে গিয়েছে। ছবিটি আন্তর্জাতিকভাবে পুরষ্কুত হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল। বহিষ্কারাদেশ বাতিল হবার পর ২০০৫ সালের ১৬ই এপ্রিল ডিভিডি ভার্সন প্রকাশিত হয়। মাটির ময়না চলচ্চিত্রটি প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে "শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র" বিভাগে একাডেমি পুরস্কার প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বাংলাদেশের মনোনয়ন লাভ করে। পরিচালকের নিজের ছোটবেলার কাহিনীর জীবনের উপর ভিত্তি করে এ ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে। খুব সাধারণ লোক ছিলেন কাজী সাহেব, একদিন তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসলো। হঠাৎ করেই তিনি অত্যন্ত ধর্ম অনুরাগী হয়ে গেলেন। অত্যন্ত ধার্মিক বাবা কাজী সাহেব তাঁর ছোট্ট ছেলে আনুকে পড়াশোনার জন্য মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। মাদ্রাসায় আনুর কঠিন জীবন শুরু হয়। এখানে এসে তার পরিচয় হয় রোকন নামে আরেকটি ছেলের সাথে। রোকন মাদ্রাসার কোন নিয়ম কানুন মানতো না এজন্য সে সবসময়ই নানা রকম শাস্তির ঝামেলায় পড়তো। এইদিকে আনুর ছোট বোন একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পরে কিন্তু আনুর বাবা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, তাই মেয়ের চিকিৎসায় তিনি কোন ইংরেজি ওষুধ মানে অ্যালোপ্যাথিক ব্যবহার করবেন না। তার এই গোয়ার্তুমির শিকার হয়ে তার মেয়ে একসময় মারা যায়। এরমধ্যে দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ প্রাক্কালীন সময়ের অস্থির অবস্থা বিরাজমান, গ্রামে চলে এসেছে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। ষাটের দশকের উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপট হতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের সময়ের একটি পরিবার কিভাবে যুদ্ধ ও ধর্মের কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার গল্প নিয়ে তৈরি এ চলচ্চিত্র। দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের পাশাপাশি আনুর মাদ্রাসাতেও চরম ও মধ্যপন্থী মতবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে। বিভক্তির এই একই চিত্র দেখা যায় গোঁড়া ধার্মিক কাজী ও তাঁর স্বাধীনচেতা স্ত্রী আয়েশার মধ্যে । ধর্মীয় উদারতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং ইসলামের দুর্বোধ্যতা এ সব কিছু মিলিয়ে মাটির ময়না জাগতিক দ্বন্দ্বের একটি দৃশ্যমান প্রতিকৃতি। পরিচালনা - তারেক মাসুদ প্রযোজনা - ক্যাথরিন মাসুদ চিত্রনাট্য - তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ অভিনয়েঃ আনু - নুরুল ইসলাম বাবলু রোকন - রাসেল ফরাজী কাজী - জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় আয়েশা - রোকেয়া প্রাচী সম্মাননা ও পুরস্কার •ফিপরেস্কি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস্ এওয়ার্ড, কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ২০০২; •সেরা চলচ্চিত্র ও ২ টি অন্য পুরস্কার, কারাফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, পাকিস্তান ২০০৩; •সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালক, চ্যানেল আই ফিল্ম এওয়ার্ড, ২০০৩; •সেরা চলচ্চিত্র ও ৫ টি অন্যান্য পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, ২০০৩; •বিদেশী ভাষার অস্কার পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশের প্রথম মনোনীত চলচ্চিত্র; •ফরাসি সরকারের সাউথ ফান্ড কর্তৃক স্ক্রিপ্ট (চিত্রনাট্য) এওয়ার্ড।