ছবি সংগৃহীত
বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সন
আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ০৪:২৪
বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য আজকাল যে উদগ্রীবতা প্রকাশ করা হয়, তাকে অনেক সময় গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো ব্যাপার বলে মনে হয়। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষিত বিত্তশালী লোকদের প্রায় সবাই বাংলা ছেড়ে ইংরেজি গ্রহণে তৎপর। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নানা ধারা-উপধারায় বিভক্ত। শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষাপূর্ব পর্যায়ে এত ধারা-উপধারা পৃথিবীর আর কোনো রাষ্ট্রে আছে বলে আমাদের জানা নেই। নানা ধরনের মাদরাসা, নানা ধরনের স্কুল, নানা ধরনের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কত কী! এ শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলা ভাষার ও বাংলাদেশের স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী। রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য, এ শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা তাকে বিনষ্ট করা হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) যে ধারার শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের জোগান দেয়, সেটাকে বলা হয় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ধারা। ২০০২ সালে সরকার এ মূল ধারার ভেতর ইংলিশ ভার্সন বলে একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সরকার সেই ধারাকে বেগবান করে। সেই বেগ আজও অব্যাহত আছে। ইংলিশ ভার্সনের জন্য বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজের ভেতর থেকে যে কোনো দাবি ছিল, তা নয়। এ ব্যবস্থা ভালো কী মন্দ, তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো আলোচনা-সমালোচনাও হয়নি। বর্তমান আলোচনা ইংলিশ ভার্সন নিয়ে, ইংরেজি শেখা নিয়ে নয়। ইংরেজি শেখার যথোচিত ব্যবস্থা বাংলাদেশে রাখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি শেখার ব্যবস্থারও উন্নতি সাধন করতে হবে; কিন্তু ইংরেজির জন্য মাতৃভাষার স্থান ছেড়ে দেয়া যাবে না। ইংলিশ ভার্সন বাঙালি সন্তানদের ইংরেজি শেখার কোনো সুব্যবস্থা নয়। বাংলাদেশে ইংরেজিকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যম করা ভুল। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যে সৃষ্টিশীলতা ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষারূপে রেখেই সম্ভব হবে। ইংরেজিকে প্রথম ভাষা করা হলে বাঙালির সৃষ্টিশক্তি দুর্বল হবে-সৃষ্টিশীলতা বিনষ্ট হবে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে রক্ষা করে সম্প্রসারিত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কেবল বাংলা মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং প্রকাশ করত। ইংলিশ ভার্সন প্রবর্তনের পর বোর্ড বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদেও সব পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করতে থাকে। আদেশ জারি করা হয়, কোনো স্কুল ইচ্ছা করলে বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে ইংলিশ ভার্সন খুলতে পারে। সরকারের আদেশ অনুসরণ করে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংলিশ ভার্সন ধীরে ধীরে চালু হতে থাকে। তখন থেকে সারা দেশে শুধুই ইংলিশ ভার্সন নিয়ে নতুন নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও স্থাপিত হতে থাকে। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে কিংবা ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনে ইংলিশ ভার্সন নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। এখন দেখা যাচ্ছে, সারা দেশে সচ্ছল অভিভাবকরা শিশু-কিশোরদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য দ্রুত গতিতে ইংলিশ ভার্সনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। বিষয়টিকে স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। শিক্ষিত সচ্ছল লোকদের ইচ্ছা এখন ইংরেজির দিকে। ইংরেজি শেখানোর বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বেড়ে চলছে। সারা দেশে প্রতি বছর অধিক থেকে অধিকতর সংখ্যায় বিদ্যালয় ইংলিশ ভার্সন খুলে চলছে। কেবল ইংলিশ ভার্সন নিয়ে নতুন নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠিতও হচ্ছে। ইংলিশ ভার্সনে ছেলেমেয়েরা অনেকে বাড়িতেও ইংরেজিতেই কথাবার্তা বলে। 'ইংলিশ-পছন্দ মহল' থেকে জনমনে ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে, বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ছাড়া গতি নেই, বাংলার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বিশ্বায়ন নামে যে কর্মধারা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ চালিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের চেয়ে বিশ্বায়নকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। বাংলাদেশে ১৯৮০-এর দশক থেকে নিঃরাজনীতিকরণের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে না রেখে বিশ্বায়নে বিলীন করে দেয়ার অঘোষিত কার্যক্রম চালু আছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন-কার্যক্রম ও উন্নয়ন-চিন্তা পর্যবেক্ষণ করলে এটা বোঝা যায়। বাংলাদেশ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষাধারা (এ-লেভেল, ও-লেভেল) অব্যাহত আছে। তাদের পাঠ্যসূচি যুক্তরাজ্যের বাস্তবতায় তৈরি। অবস্থার চাপে তারা অল্প কিছু নম্বরের Bangladesh Studies পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে। যুক্তরা���্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বাংলাদেশে সেট, টোফেল, আইইএলটিএস ইত্যাদি পরীক্ষা নিয়মিত নিচ্ছে এবং বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা ঢাকায় ও আরও কয়েকটি শহরে বিরাট সংখ্যায় সেগুলোতে অংশগ্রহণ করছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এগুলো চালানো হচ্ছে। যারা ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে চায়, বিশ্বায়নের কাজ করতে চায়, তাদের জন্য ইংলিশ ভার্সনের তুলনায় এ-লেভেল, ও-লেভেল অনেক ভালো। বাংলাদেশের দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংলিশ ভার্সনে গিয়ে ছেলেমেয়েরা ইংরেজি ভালো শিখতে পারছে না, বিষয়জ্ঞানও ভালো লাভ করছে না। মাদরাসা নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন না হওয়া ভালো। কাল নিরবধি, পৃথ্বী বিপুলা। সার্বিক উন্নতির জন্য সময় পাওয়া যাবে, সুযোগও সৃষ্টি করা যাবে। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করা যাবে তখনই যখন তা করার মতো সরকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে। এখন পরিপূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা দরকার মূলধারার ব্যবস্থাকে বাংলাদেশোপযোগী করার জন্য। এর জন্য বাংলা মাধ্যমকে উন্নত করা ও ইংলিশ ভার্সনকে পরিহার করা উচিত। ইংলিশ ভার্সন নিয়ে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা চলতে থাকলে বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা থাকবে না। বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ লোকের জন্য বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে রক্ষা করতে হবে, আর বাংলাদেশকেও রাষ্ট্র রূপে রক্ষা করতে হবে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না থাকলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থাকবে না। বাংলাদেশকে এবং অন্যসব রাষ্ট্রকেও বিশ্বায়নবাদী নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে সুষ্ঠু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে উত্তীর্ণ হতে হবে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়ায় ইংরেজির প্রতিপত্তি বাড়ানোর জন্য অন্তত দুই শতাব্দী ধরে কাজ করে আসছে। সব জাতিকে ইংরেজি শেখানো দুটি রাষ্ট্রেরই বিশ্ববিস্তৃত ব্যবসাও বটে। বিশ্বব্যাপী তাদের কর্তৃত্ব অনেকটাই নির্ভর করে বিশ্বব্যাপী ইংরেজি ভাষার প্রতিষ্ঠার ওপর। বাংলার উন্নতির জন্য মৌসুমি হুজুগ ছাড়া আর কী আছে? আমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করি না, বিদেশিদের কাছে বিকিয়ে দিই। আমাদের উন্নতি হবে কীভাবে? রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে, বাংলার প্রতি, বাংলাদেশের প্রতি, জনগণের সক্রিয় আস্থা ও সক্রিয় ভালোবাসা লাগবে। জনগণের ভালোবাসাই প্রাণশক্তি। ইংরেজির প্রতি ভালোবাসা বাংলার চেয়ে বেশি হলে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ রক্ষা পাবে কীভাবে? ইংলিশ ভার্সনের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের তুলনায় এখনও অনেক কম। তবে এ সংখ্যা বাড়ছে। ইংলিশ ভার্সন যে অনুপাতে বাড়ছে, বাংলা মাধ্যমের প্রতি সেই অনুপাতে শিক্ষার্থীদের আস্থা কমছে। ব্যাপারটা কেবল ভাষাগত নয়, সংস্কৃতিগতও। 'বাংলা মাধ্যম নিয়ে সংস্কৃতি' থেকে 'ইংলিশ ভার্সন নিয়ে সংস্কৃতি' আলাদা। বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তি ইংরেজি ভাষা দখল করে নেবে। প্রশাসন ব্যবস্থায় বাংলা ভাষার স্থানকে ক্রমেই ছোট করে ফেলা হচ্ছে। আসলে বাংলাদেশকে বাংলা ছেড়ে ইংরেজিতে যেতে হচ্ছে নিজের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের বিনিময়ে। রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে বিশ্বায়নে বিলীন হয়ে বাংলাদেশ কীভাবে চলবে? মানব জাতিকে প্রগতিশীল আন্তর্জাতিক ফেডারেশন বিশ্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাতেও জাতি, জাতীয় ভাষা, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় রাজনীতি, জাতীয় প্রশাসন, জাতীয় অর্থনীতি থাকবে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এখন ইংলিশ ভার্সনের জন্য বাংলা পাঠ্যপুস্তক ইংরেজিতে অনুবাদ করায়। এদিক দিয়ে ইংলিশ ভার্সন বাংলা মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অচিরেই ইংলিশ ভার্সনের জন্য অনুবাদ-নির্ভরতা পরিহার করে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করা হবে। হয়তো পাঠ্যসূচি ও পাঠক্রমও ভিন্ন হবে। ইউনিসেফ বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের- প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর পাঠ্যপুস্তক, বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে, বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। এটা কি তাদের নিঃস্বার্থ খয়রাত? বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেয়ার সুবাদে তারা আধিপত্যবাদী স্বার্থে পাঠ্যসূচি ও পাঠক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ইউনিসেফের পেছনে আছে ইউনেস্কো। বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সন, কোনোটিতেই শিক্ষা ভালো হচ্ছে না। পরীক্ষার ফল ভালো হলেই শিক্ষা ভালো হয় না। এরই মধ্যে যারা ইংলিশ ভার্সনে পড়বে, তারাই ভবিষ্যতে রাজনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় সব ব্যবস্থা ও আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবে। বাংলা মাধ্যমের ভেতর থেকে যারা বের হবে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ও সরকারে তাদের কর্মক্ষেত্র সঙ্কুচিত হতে হতে একদিন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এভাবে বাংলা ছেড়ে ইংরেজিতে গিয়ে এ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ কী হবে? জাতীয় বাস্তবতা ও বিশ্ববাস্তবতা দুই দিক থেকেই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হবে। ১৯৭২ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা মাধ্যম প্রবর্তিত হয়েছিল। বাংলা ভাষাকে উন্নত এবং সমৃদ্ধ করারও বিপুল আগ্রহ দেখা দিয়েছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ও অনুবাদের কাজ এগিয়ে চলছিল। বছর বিশেক যেতে না যেতেই সেসব কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন দ্রুত ইংরেজি মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু থেকেই চলছে কেবল ইংরেজি মাধ্যম। ৭৮টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র দুটিতে বাংলা বিভাগ আছে। সেগুলোতে পড়ানো হয় কেবল সাহিত্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো বিষয়েই বাংলা মাধ্যম নেই। চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা, কৃষিবিদ্যা, আইন ইত্যাদিতেও বাংলা মাধ্যমের উদ্যোগ দেখা দিয়েছিল। ইউরোপ-আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোতে অনুবাদের যে বৃহদায়তন ব্যবস্থা আছে, সে ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশেও প্রবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপিত হচ্ছিল; কিন্তু সে প্রবণতা এখন আর নেই। '৬০-এর দশকে বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য যে বিপুল আগ্রহ দেখা দিয়েছিল, '৭০-এর দশক শেষ হতে না হতেই তা শেষ হয়ে গেল! এটা কি মূলত সরকারি নীতির কারণে ঘটেছে? শাসক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের ও সিভিল সোসাইটিগুলোর বিশিষ্ট নাগরিকদের ভূমিকা কী? বিশ্বায়নের কারণে কোন মহাদেশে কোন রাষ্ট্র নিজের রাষ্ট্রভাষা ছেড়ে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করেছে? বর্তমানে যে প্রক্রিয়া চলছে তাতে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। পশ্চিমবঙ্গে, আগরতলায় এবং ভারতের আরও কিছু বাংলাভাষী এলাকায় বাংলার কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি? মাতৃভাষা রূপে বাংলা অবশ্যই থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলাদেশে বাংলা থাকবে না। জাতিসংঘ কেবল মাতৃভাষা রক্ষা করতে চায়; দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রভাষা রক্ষা করতে চায় না, ইংরেজি চাপিয়ে দিতে চায়। বাংলা ভাষায় বর্তমানে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ কথা বলে। নানা দেশে ছড়িয়ে আছে বাংলাভাষী মানুষ। বাংলাদেশে বাংলাভাষী ১৬ কোটি মানুষ আছে। ভাষিক জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীতে বাংলার স্থান চতুর্থ। ওড়িয়া ও অসমিয়া ভাষা বাংলা ভাষার খুব কাছাকাছি। রাজনৈতিক আধিপত্য ও অর্থনৈতিক শোষণ দূর করা হলে ওইসব ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সমন্বয় ঘটবে। বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া প্রভৃতি ভাষার লোকদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞানগত আদান-প্রদান নিবিড় হওয়া বাঞ্ছনীয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যে বাংলা ভাষার উন্নতির সম্ভাবনা অফুরন্ত। রাজনীতি উন্নত হলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ শক্তিশালী হবে। মূলধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সনে বিভক্ত করার ফলে জাতির ভেতরকার বিভক্তি পুনর্বিন্যস্ত হবে। তাতে মোট জনংখ্যার অন্তত ৯৮ ভাগ মানুষের স্থায়ী ক্ষতি হবে। আর বাংলা ভাষার উন্নতির সম্ভাবনা নষ্ট হবে। জনসাধারণ কি ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা না করে চিরকাল নিষ্ক্রিয় থাকবে? দেশের রাজনীতি সুস্থ, স্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রধান তিনটি ধারা দেখা যাচ্ছে- এক. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ধারা, যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি বলে আত্মপরিচয় দেয়। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলো এ ধারায় আছে। দুই. জাতীয়তাবাদী ইসলামপন্থী বলে অভিহিত ধারা। বিএনপি, জামায়াত ও তাদের সহযোগী দলগুলো এ ধারায় আছে। তিন. এনজিও ও সিভিল সোসাইটিগুলোর ধারা। ইংলিশ ভার্সনের বিকাশ ঘটলে এনজিও ও সিভিল সোসাইটিগুলোর ধারা শক্তিশালী হবে। জাতীয়তাবাদী ইসলামপন্থী ধারার কথিত জাতীয়তাবাদে মূলত আছে ভারতবিদ্বেষ ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি, কোনো সদর্থক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা নেই। বাংলাদেশে জাতি গঠন ও রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা এবং চিন্তা তাদের নেই। এনজিও ও সিভিল সোসাইটির ধারা তো বিশ্বায়নবাদী। তারা তো জাতীয়তাবাদ ও জাতি-রাষ্ট্রের উপযোগিতাই স্বীকার করে না। রাষ্ট্র ও বিশ্ব ব্যবস্থা নিয়ে তারা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ইত্যাদির অনুসারী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও বিশ্ব ব্যবস্থা নিয়ে অর্ধ নিরপেক্ষতাবাদীদেরও কোনো পরিচ্ছন্ন চিন্তা নেই। জাতি-রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রভাষা রক্ষার জন্য যে স্বাজাত্যবোধ ও দেশপ্রেম দরকার, তার অস্তিত্ব কোথায়? জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা দরকার। পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের বিশ্বায়নবাদী নীতির অন্ধ অনুসরণ ও অনুকরণ দ্বারা কোনো জাতিই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অধিকারী হতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা সাম্রাজ্যবাদেরই নতুন নাম দিয়েছে বিশ্বায়ন। ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতাবাদ ও নিওলিবারেলিজম তাদের অবলম্বন। সে ধারার অন্ধ অনুসারী হয়ে বাংলাদেশ চলছে। তারই ফলে বাংলাদেশে কিছু লোকের মনে ইংলিশ ভার্সনের ধারণা জেগেছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তা কার্যকর করে ফেলা হয়েছে। এর পরিণতি ভালো হবে না, ভালো হতে পারে না। দুনিয়াটা কীভাবে চলছে, কীভাবে চলা উচিত এবং কীভাবে চলবে, তা দূরদর্শিতার বিচার-বিবেচনা করে দেখা দরকার। এ বিষয়ে বাংলাদেশে ইংরেজিতে লেখা যেসব বইপত্র ও লেখালেখির সন্ধান আমরা পাই, সেগুলো সবই বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও চলমান বিশ্বায়নের অন্ধ সমর্থক। বিষয়টি নিয়ে বিচার-বিবেচনা করতে করতে কিছু ধারণা আমার মনে দানা বেঁধেছে। আমি জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকবাদ বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ নামে একটি ছোট বই লিখেছি এবং সেটি এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমি আমার চিন্তাকে ভুল মনে করার কারণ দেখি না। স্বল্প পরিসরে সেসব কথার পুনরাবৃত্তি সম্ভব নয়। একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল বিশ্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও বিশ্ব ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। তাতে জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় সরকার ও জাতি-রাষ্ট্র থাকবে। তার ওপর প্রতিষ্ঠা করতে হবে আন্তর্জাতিক ফেডারেল বিশ্ব সরকার ও বিশ্ব রাষ্ট্র। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত রাখতে হবে 'জনগণের গণতন্ত্র'। জাতীয় সরকার ও জাতি-রাষ্ট্রের কিছু ক্ষমতা চলে যাবে বিশ্ব সরকার ও বিশ্ব রাষ্ট্রের কাছে। কেবল বিশ্ব সরকারের কাছে একটি সেনাবাহিনী রেখে সব রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করতে হবে। বিশ্ব সরকারের কাজ হবে জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি তাদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা তিরোহিত করা। আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানব জাতির ঐক্য ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বকে বিকশিত করতে হবে। বিশ্ব রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জাতি রাষ্ট্র থাকবে। প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো জাতির রাষ্ট্রভাষাই ইংরেজি দ্বারা স্থানচ্যুত হবে না। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত জাতিগুলোর ভাষা থেকে অনুন্নত জাতিগুলোর ভাষায় প্রয়োজনীয় নানা বিষয় গ্রহণ করে সব ভাষাই উন্নতির ধারায় থাকতে হবে। আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের প্রয়োজনে প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বিদেশি ভাষা শেখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। যেসব জাতি রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বিশ্ব ব্যবস্থা, রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে নিজেদের উন্নতির উপায় করবে না, সেসব জাতি ধীরে ধীরে মানব জাতির মূলধারা থেকে খসে পড়বে। বিশ্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠনের সঙ্গে জাতি রাষ্ট্রকেও পুনর্গঠিত করতে হবে। উদার গণতন্ত্র বলে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গ যে গণতন্ত্রকে বাংলাদেশে চাপিয়ে দিচ্ছে, তা জনগণের গণতন্ত্র নয়, তা গণবিরোধী গণতন্ত্র। তা কেবল উচ্চশ্রেণীর লোকদের হীনস্বার্থ হাসিলের গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্রে কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা হয় এবং নির্বাচিত সরকার একনায়কতান্ত্রিক হয়ে জনগণের ওপর শোষণ চালায়। বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদের নির্বাচন করারও সামর্থ্য রাখে না। যে গণতন্ত্র আমরা চাই তা জনগণের গণতন্ত্র কথিত উদার গণতন্ত্র পরিত্যাগ করে জনগণের গণতন্ত্র কায়েম করে রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পুনর্গঠন করতে হবে। অর্থনীতিতেও ঘটাতে হবে পরিবর্তন। জাতি-রাষ্ট্রের পুনর্গঠন ও বিশ্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য গড়ে তুলতে হবে আন্তর্জাতিক আন্দোলন। ইংলিশ ভার্সন যেভাবে প্রবর্তন করা হয়েছে তাতে বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম থেকে অপসৃত হবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে ইংরেজি ভাষা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে থাকতে পারবে না। পরাধীনতার মধ্যে জনজীবনের দুর্দশা বাড়বে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের অপরিহার্য শর্ত। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের জায়গায় অন্যদের ভাষা, সংস্কৃতি ও কর্তৃত্ব নিয়ে আমরা কীভাবে লাভবান হব? লক্ষ করা দরকার যে, কেবল জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত আর জাতিসংঘের সদস্যপদ থাকলেই আজকাল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা থাকে না; এসব আফগানিস্তানের, ইরাকের, লিবিয়ারও আছে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে। ইংলিশ ভার্সনে না গিয়ে বাংলা মাধ্যমের ভেতরে ইংরেজিকে যথোচিত স্থান দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান দুর্গতির মধ্যে কিছু সময়ের জন্য বাংলা ও ইংরেজি দুটোতেই পরীক্ষার নম্বর কিছু বাড়ানো যেতে পারে এবং পাঠ্যসূচি থেকে অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দেয়া যেতে পারে। কেবল শিক্ষার মাধ্যমই নয়, সর্বজনীন কল্যাণে শিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যসূচি এবং পাঠক্রম আমূল পরিবর্তনের দাবি রাখে। শিক্ষা পদ্ধতি ও পরীক্ষা পদ্ধতিও বদলাতে হবে। জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনা করে ইংরেজি, ফারসি, জার্মান, রুশ, চীনা, জাপানি প্রভৃতি ভাষা শেখানোর জন্য স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট নিতান্তই অপর্যাপ্ত। এসব ভাষা শেখার ও অনুবাদের বৃহদায়তন জাতীয় আয়োজন লাগবে। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর দুর্বলতার কারণে বাংলা নাটক দুর্বল হয়ে পড়েছে। শহর ও গ্রামে হিন্দি সিরিয়ালের দাপটে পারিবারিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতি বিকারগ্রস্ত হচ্ছে। এফএম রেডিওতেও বাংলা ভাষার ব্যবহার বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। বাংলা বানানের আরও সংস্কার দরকার। এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ও জনসাধারণের সচেতনতা দরকার। পাশ্চাত্য সভ্যতার একদিকে আছে তার প্রগতিশীল ধারা। তাতে আছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য ও শিল্পকলা। এ ধারা মহান। অপরদিকে আছে তার অপ্রক্রিয়াশীল ধারা। তাতে আছে উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিগ্রহ। এ ধারা মানবতাবিরোধী, কুৎসিত, কদর্য। প্রগতিশীল মহান ধারাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে এবং কুৎসিত কদর্য ধারাকে পরিহার করতে হবে। এর জন্য আমাদের ইংরেজি ও আরও কোনো কোনো ভাষা ভালো করে শিখতে হবে। আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাষ্ট্রিক বিভিন্ন সম্পর্কের প্রয়োজনেও বিদেশি ভাষা শিখতে হবে। এ শেখার উপায় নিয়ে বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা ও বিচার-বিবেচনা দরকার। ইংলিশ ভার্সন নিয়ে সুফল হবে না। এটা পরিত্যাজ্য। যারা পশ্চিমা উপনিবেশবাদী, ফ্যাসিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করে চলতে চায় তাদের জন্য ইংলিশ ভার্সনের চেয়ে এ-লেভেল, ও-লেভেল অনেক ভালো। ইংলিশ ভার্সনে গিয়ে তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে। যারা দুর্গত বাংলাদেশকে পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের গোলাম করে রাখার উদ্দেশে যুক্তির জাল বিস্তার করে চলেছেন, তাদের ভূমিকা নিন্দনীয়-তাদের চিন্তা বর্জনীয়। এখন তুচ্ছ মনে হলেও ইংলিশ ভার্সনের অভিজ্ঞতা অবশ্যই একদিন আমাদের বাংলার গুরুত্ব বুঝতে বাধ্য করবে। তখন বাংলায় ফিরে আসতে হবে। এর মধ্যে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। যে শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে তা নিয়ে আমরা উন্নতি করতে পারব না। চলতি উত্তেজনা ও উপস্থিত অস্থিরতা থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির জন্য প্রগতিশীল নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার কথা আমাদের ভাবা কর্তব্য। এর জন্য যা যা পরিবর্তন দরকার, সবই সাধন করতে হবে। বাংলা উন্নত ভাষা। এ ভাষা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার উপযোগী। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজির চর্চা এ দেশে অনেক হয়েছে। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ও সাহিত্য সৃষ্টিতে বাঙালি তার প্রতিভার পরিচয় বাংলা ভাষার মাধ্যমেই দিয়েছে। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিস, সত্যেন্দ্রনাথ বসু-প্রত্যেকেই বাংলার চর্চা করেছেন এবং বলেছেন- বাংলায়ই তারা চিন্তা করেছেন এবং ইংরেজিতে তা তর্জমা করে প্রকাশ করেছেন। এ তর্জমার কোনো বিকল্প নেই। তাদের মতে, সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্তত দ্বিভাষিক হতেই হয়, মাতৃভাষা বাদ দিয়ে এগোনো যায় না। বাংলা ভাষার উন্নতির সম্ভাবনা অন্তহীন। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার, সেই সঙ্গে সাঁওতাল, গারো, চাকমা, রাখাইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর এবং ইংরেজি, ফারসি, জার্মান, আরবি, উর্দু, সংস্কৃত, পালি, রুশ, চীনা, জাপানি প্রভৃতি ভাষার ব্যবহার কীভাবে, কোথায়, কতখানি করতে হবে এবং এসব ভাষা শেখার ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অনুবাদের কী ব্যবস্থা বাংলাদেশে করা সমীচীন, সে সম্পর্কে যুগোপযোগী জাতীয় ভাষানীতি আমাদের অপরিহার্য। জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়নের বেলায় ভাষা-শিক্ষার চেয়েও অনেক বড় বিবেচ্য হবে শিক্ষার ও জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ভাষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ভাষা। জাতীয় ভাষানীতিতে মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগ মানুষের ভাষা বাংলাকে যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা বাংলাদেশের মোট লোকসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। তবে বাংলাদেশের ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৫টি ভাষাকেও অনুচিত গুরুত্ব নয়, যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর সার্বিক উন্নতির জন্য জাতির (হধঃরড়হ) মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিবিড়তর হওয়া সমীচীন। জাতিসংঘ কথিত আদিবাসীদের চিরকাল আদিবাসী করে রাখার নীতি বর্জনীয়। তাদের মানব জাতির মূলধারায় আসতে সহায়তা করতে হবে। আমি আশা করতে চাই, বাংলাদেশের বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে পরিপূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং সেসব আলোচনা জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য যথোচিত সিদ্ধান্তে পৌঁছার উপযোগী হবে। জনজীবনে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় আছে। আমি চাই, এ ভূ-ভাগের শিক্ষিত সমাজ '৫০ ও '৬০-এর দশকে বাংলা ভাষার সার্বিক উন্নতির জন্য যেভাবে সক্রিয় হয়েছিল, বাংলাদেশের আজকের শিক্ষিত সমাজ বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষারূপে রক্ষা ও সমৃদ্ধ করার জন্য তেমনিভাবে সক্রিয় হবে। বাংলা ভাষা নিয়ে বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের আজকের যে সমস্যা, তা বাংলা ভাষা নিয়ে এ ভূ-ভাগের সেদিনের ৯৯ শতাংশ মানুষের সমস্যার চেয়ে একটুও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জনগণের জন্য সেদিনের এক শতাংশ লোকের ভূমিকার তুলনায় আজকের এক শতাংশ লোকের ভূমিকা একটুও কম ক্ষতিকর নয়। কেবল ভাষার ব্যাপারই নয়, জাতি ও রাষ্ট্রকে রক্ষা এবং উন্নত করার ব্যাপারও এর সঙ্গে যুক্ত। সেদিনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা আমাদের সাহসী, দূরদর্শী ও সংগ্রামী হতে বলে। বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে এগোতে হবে। সাধনা ও সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। বাংলা ভাষা বাঙালির ভরসা। (এই পোষ্টটি আলোকিত বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে) এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে
- ট্যাগ:
- শিক্ষা
- বাংলা ভাষা