ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিকল্প প্রদর্শনীর চালচিত্র

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৪:৫৪
আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৪:৫৪

সংগৃহীত ছবিতে গ্রাফিক্স করেছেন বাহাউদ্দীন খান শাকিল।

(প্রিয়.কম) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের যৌথ আয়োজনে নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তাহব্যাপী ‘দুই বাংলার চলচ্চিত্র উৎসব’ এ আয়োজিত সেমিনারের জন্যে প্রসূন রহমানের লিখিত বক্তব্যটি আজ বিশ্ব চলচ্চিত্র দিবস উপলক্ষে প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্যে প্রকাশিত হলো- 

গত এক দশকে চলচ্চিত্রের ভোকেবুলারিতে যোগ হয়েছে অনেক নতুন শব্দ। এর মাঝে এইচডি, ফুল এইচডি, টু-কে, ফোর-কে যেমন আছে তেমনি আছে- অ্যালেক্সা, আমিরা, রেডওয়ান, রেড এপিক অথবা ব্ল্যাকম্যাজিকের মতো যাদুময় কিছু শব্দ।তবে নতুন যুগের এইসকল শব্দমালার ধোঁয়াশা কাটিয়ে যে শব্দবন্ধটি সকলের মগজেই সহজে স্থান করে নিয়েছে সেটি হচ্ছে- ‘ডিজিটাল’ বা ‘ডিজিটাল চলচ্চিত্র’।বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্রক্রিয়াতেই এখন সৃজিত হচ্ছে, প্রস্ফুটিত হচ্ছে চলচ্চিত্র নামের প্রযুক্তিনির্ভর সবচেয়ে বড় শিল্পমাধ্যম। আর প্রয়োজনীয় কথাটি হলো- এই ডিজিটাল মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হওয়ায় এর নির্মাণ ব্যয় যেমন কমেছে তেমনি নির্মাণ প্রক্রিয়াও সহজতর হয়েছে। নির্মাতার সৃজনশীল স্বাধীনতা প্রয়োগের সুযোগও প্রশস্ত হয়েছে একই সাথে। তবে সেই স্বাধীনতা অনেক নির্মাতাই পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন না প্রাসঙ্গিক অন্য কারণে।

একটি চলচ্চিত্রে যেহেতু বিনিয়োগের ব্যাপার থাকে, অর্থ লগ্নী করবার ব্যাপার থাকে সেহেতু অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী সে বিনিয়োগে শুধুমাত্র পুঁজি তুলে আনবার প্রয়োজনই নয়, সে বিনিয়োগ মুনাফা অর্জনও দাবী করে। দীর্ঘ সময়ের জন্যে বিনিয়োগ দীর্ঘ অংকের মুনাফা দাবী করে। কিন্তু সৃজনশীল চলচ্চিত্র বা শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র বেশীর ভাগ সময়ে পুঁজি তুলে আনতেই ব্যর্থ হয়। এই পুঁজির সংশ্লিষ্টতা ও ঝুঁকির ব্যাপারটি নির্মাতার মাথার ভেতর একধরনের চাপ তৈরি করে রাখে সবসময়। যা কখনো কখনো সৃজনশীল ক্ষমতা প্রয়োগের পথে যেমন অন্তরায়, তেমনি স্বাধীনতার ক্ষেত্রটিকেও সীমাবদ্ধ করে।

প্রথমেই আলোচনা করা যেতে পারে- আমাদের এখানে আসলে এখন কোন কোন ধারার চলচ্চিত্র প্রবাহমান? প্রসঙ্গতঃ আমাদের আজকের আলোচনায় কেবলমাত্র পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্রই প্রাধান্য পাবে।

আশি’র দশকের শেষ দিকে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়, বিকল্প প্রদর্শনীও। শুন্য দশকে এসে সেই বিকল্প ধারা আর অবশিষ্ট থাকেনি। গত এক দশকে বিকল্প ধারার নামে যা নির্মিত হয়েছে তার কোনোটাই আসলে সত্যিকার বিকল্প পন্থার নির্মাণ নয়।বেশীর ভাগই মূলধারার শিল্পী, কলাকুশলী নিয়ে মূলধারায় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই নির্মিত। তবে সেসব চলচ্চিত্র শেষাবধি মুলধারার সিনেমা হলে প্রদর্শিত হওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়েছে বিকল্প পন্থায়। মূলধারার বাইরে মুনাফার কথা না ভেবে যেসকল জীবন ঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তার সবগুলোকেই বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে পরবর্তিতে সারা বিশ্বেই বিকল্প ধারার ছবিকে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম’ হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়। আমাদের এখানেও এখন তাই হচ্ছে। বাংলায় আমরা এটিকে বলছি স্বাধীন ধারা। মূলত স্টুডিওর বাইরে অপেক্ষাকৃত কম বাজেটে জীবনঘনিষ্ঠ যে সকল চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে সেসব চলচ্চিত্রকেই স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।
তবে সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্রকে স্বাধীন ধারার নির্মাণ বলা হবে কি না এ নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করে থাকেন। বাস্তবতা হচ্ছে প্রক্রিয়ার দিকে থেকে এগুলো একধরনের স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র অবশ্যই। তবে যেহেতু শুধুমাত্র অনুদানের টাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়না এবং বেশীরভাগ নির্মাতাকেই সহপ্রযোজক নিতে হয়, তাই শেষাবধি হাতবদল হয়ে এর সবগুলো আর স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র হিসেবে অবশিষ্ট থাকছেনা। সরকারি অনুদানের নীতিমালা বরখেলাপ করে অনেকইে স্বত্ব হস্তান্তর করে দিচ্ছেন টিভি চ্যানেল কিংবা সহপ্রযোজকের কাছে।

মোটা দাগে বললে আমরা আসলে দুটি ধারার চলচ্চিত্র পাই- একটি শিল্পমানহীন ফর্মুলা গল্পের উচ্চকিত ভঙ্গীর চলচ্চিত্র, আরেকটি জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র। আমরা এই জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের চলচ্চিত্রকে বিকল্পধারা বা স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র বলে থাকি। তবে এই ধারাকে একটু আদর করে কেউ কেউ ‘সৃজনশীল ধারা’ বা ‘সুস্থধারা’র চলচ্চিত্রও বলে থাকেন। এ বিষয়ে প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের একটি মতামত ছিল। উনি বলতেন- চূড়ান্ত বিচারে চলচ্চিত্র আসলে ২ রকম, ভালো চলচ্চিত্র এবং মন্দ চলচ্চিত্র।

এছাড়া ‘প্রায় জীবনঘনিষ্ঠ’ গল্পের কিছু চলচ্চিত্র এখানে টেলিভিশন ও প্রযোজনা করে থাকে। তবে এর বেশিরভাগ একটি কিংবা দুটি প্রেক্ষাগৃহে প্রতীকি মুক্তি পায় এবং মুক্তির দিনেই টেলিভিশনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়ে যায়, তারপর হয়ে পড়ে বাক্সবন্দী। সে অর্থে টেলিভিশন প্রযোজিত চলচ্চিত্রগুলোর আসল পরিচয় নিয়ে খানিকটা গবেষণা হতে পারে। যেহেতু স্পন্সরের কাছে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক কারণেই সেগুলো নির্মিত হয়- সে অনুযায়ী সেসব চলচ্চিত্র প্রথম ধারা এবং দ্বিতীয় ধারার মাঝামাঝি আরেকটি উপধারা তৈরি করছে কি না এ ব্যাপারটি বিশ্লেষণের দাবী রাখে। কারণ মানের বিচারেও সেসবের বেশীরভাগই শিল্পোত্তীর্ণ হতে পারছেনা।

তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যেতে পারে, জীবন ঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রের নির্মাতাগণ ফর্মুলা গল্পের নির্মাতাদের চেয়ে খানিকটা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করেন। কিন্তু শেষাবধি চলচ্চিত্রটি নিজে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারলো কি না সে প্রশ্নটা সবসময় অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে। 

এখানে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের জন্যে প্রথম সংকটটি তৈরি করেছে টেলিভিশন। বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে টেলিভিশনে নাটক বলে একটি ব্যাপার আছে। তার আবার দৈর্ঘ্যর র্পাথক্যের কারণে নানাবিধ নাম। ৪০ মিনিট হলে নাটক, ৫০ মিনিট হলে টেলিফিল্ম, ৬০ মিনিট হলে- টেলিছবি, ৭০ মিনিট হলে- টেলিম্যুভি, এরকম নানা পরিচয়ে টেলিভিশনে যা প্রচারিত হচ্ছে- তার প্রতিটিই আসলে এককেটি পূর্ণাঙ্গ কাহিনিচিত্র। অথবা টেলিভিশনের জন্যে নির্মিত চলচ্চিত্র। টেলিভিশনে যেহেতু জীবনঘনিষ্ঠ গল্প বলবার চেষ্টা থাকে তাই চলচ্চিত্রে জীবন ঘনিষ্ঠ গল্প হলেই অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন সেটি বড় দৈর্ঘের টেলিফিল্ম হয়ে উঠলো কিনা। সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকের বিবেচনায় এদেশে এখনো চলচ্চিত্র মানেই ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ কিছু। চলচ্চিত্র মানেই নাচে-গানে ভরপুর ফ্যান্টাসী, উচ্চকিত অভিনয় এবং অযৌক্তিক অ্যাকশন দৃশ্যের সমাহার। 

এই সংকটে পড়ে জীবন ঘনিষ্ঠ বা শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রগুলো মূলধারার প্রেক্ষাগৃহে কখনোই প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেনা। পোস্টারে বন্দুক-পিস্তল হাতে হিংস্র ভঙ্গীতে নায়ক দাঁড়িয়ে না থাকলে সেটিকে তারা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনযোগ্য চলচ্চিত্র বলেই গণ্য করছেন না। কেবলমাত্র সিনেপ্লেক্স এবং রাজধানীর হাতে গোনা দুয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ ছাড়া শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রগুলো আর কোথাও প্রদর্শক পায় না। তবে একসময় এই সকল প্রেক্ষাগৃহেই ‘প্রায় জীবন ঘনিষ্ঠ’ গল্পের অনেক চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র হিসেবে বাণিজ্যিক ভাবেই মুক্তি পেতো, বাণিজ্যিক ভাবেই প্রদর্শিত হতো।

এক্ষেত্রে আমাদের নির্মাতাদের সৃজনশীল মেধা, প্রযুক্তিজ্ঞান এবং ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে গল্প বলবার দুর্বলতাও অনেকাংশে দায়ী। আমাদের মেধার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি অনেকেই মানতে চান না। প্রযুক্তির সুবিধাটা সবখানেই একই সমান হলেও প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা অনেক পিছিয়ে। শুধুমাত্র আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে তুলনা করে কোনো লাভ নেই। তুলনা আসলে পৃথিবীর সবদেশের সাথেই হতে পারে। স্যাটেলাইটের কল্যাণে আমরা ঘরে বসে এখন সবদেশের চলচ্চিত্রই দেখতে পারি অনায়াসে। কিন্তু আমাদের চিত্রনাট্য লেখকের যেমন সংকট আছে, তেমনি দক্ষ কলাকুশলীরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। প্রশ্ন আসতে পারে- যে দেশে একটিও সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র ইনষ্টিটিউট নেই সে দেশে ২৬টি টিভি চ্যানেল চলে কী করে? ঠিক কতজন কর্মী যথাযথ প্রযুক্তিজ্ঞান নিয়ে সেখানে কাজ করছেন? ছোটো পর্দার দিকে তাকালে সে প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যায় সহজেই।

এদেশে একসময় মূলধারার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখতেন সৈয়দ শামসুল হকের মতো লেখকেরা। এখানে এখন একা একজনেই লেখেন (অথবা কপি করেন) ৮০ ভাগ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। আর স্বাধীন ধারার নির্মাতাগণ যারা আছেন, তারা নিজেদের দূর্বল গল্পটা নিয়েই এতো অবসেস্ড থাকেন যে তারা সাহিত্যের দিকেও চোখ ফেরানোর সময় পান না। আমাদের অগ্রজ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রায় কেউই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্যে ধ্রুপদী সাহিত্যের দিকে এগিয়ে যাননি।

ব্যক্তিগত গবেষণা থেকে বলছি- রবীন্দ্রনাথের এক ‘নৌকাডুবি’ উপন্যাস নিয়ে মোট ৪বার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। প্রথমবার নরেশচন্দ্র মিত্র নির্মাণ করেছিলেন ১৯৩২ সালে, শেষবার নির্মাণ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ ২০১১ সালে। আর এই বাংলায় সর্বপ্রথম রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ২০০৪ সালে। চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেছিলেন- শাস্তি। এই তথ্যটি বোধহয় আমাদের নির্মাতাদের সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি অনাগ্রহ অথবা অযোগ্যতার কথাই প্রমাণ করে। তবে টেলিভিশনে এই পরিসংখ্যান আবার পুরোপুরি উল্টো। 

এবার আসা যাক প্রদর্শন প্রসঙ্গে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার পর নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা সেই প্রযুক্তিকে ধারণ করবার চেষ্টা করলেও প্রেক্ষাগৃহের আধুনিকায়ন হয়নি একই সাথে। ফলে সিনেমাহল বন্ধ হতে থাকে একের পর এক। মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত দর্শকের কাহিনিচিত্র দেখবার প্রয়োজনীয়তা যেমন অনেকটাই মিটিয়ে দিচ্ছে এইচবিও, স্টার মুভিজ, জি স্টুডিওসহ অন্যান্য স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং ডিভিডি, তেমনি নিম্নবিত্ত দর্শকের জন্যেও সিনেমা হলের পাশেই প্রতিটি চায়ের দোকানে রয়েছে জি বাংলা, স্টার জলসার ফ্রি বিনোদন। ১০০ চ্যানেল সমৃদ্ধ স্যাটেলাইট কানেকশন, আর ইউটিউব ডিভিডি’র কালে ৮০০ থেকে ১০০০ দর্শকের সিঙ্গেল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহ ভরবার আর কোনো কারণ নেই। এই সিনেমা হল বন্ধের পেছনে প্রাসঙ্গিক আরো নানা কারণ থাকলেও- মূল বাস্তবতা হচ্ছে সময়টা আসলে সিনেপ্লেক্স অথবা মাল্টিপ্লেক্স এর। যেখানে দর্শকের জন্যে অপশন থাকে। থাকে পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেয়ার সুযোগ।

একসময় শুধুমাত্র স্বল্পদের্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র বিকল্প পন্থায় প্রদর্শিত হতো। তারেক মাসুদ বিকল্প পন্থায় দর্শনীর বিনিময়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু করেন ২০১০ সালে। এটি তিনি করেন বাধ্য হয়ে। যেহেতু দৈর্ঘ্য কম হওয়া ও ফর্মুলার বাইরে জীবন ঘনিষ্ঠ গল্প বলবার কারণে তার চলচ্চিত্রগুলো প্রায় কোনোটাই প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করতে পারেননি। মাটির ময়না পৃথিবীর ৩৬টি দেশে বাণিজ্যিক ভাবে প্রদর্শিত হলেও নিজ দেশে মাত্র ১টি হলে মুক্তি পেয়েছিল। অর্ন্তযাত্রা এবং রানওয়ে কোনো হলেই মুক্তি পায়নি। তার নির্মিত মুক্তির গান দেশের নানা অঞ্চলে খোলা জায়গায় প্রদর্শিত হলেও- রানওয়ে তিনি দর্শনীর বিনিময়ে বিভিন্ন জেলায় প্রদর্শন শুরু করেন স্থানীয় ফিল্ম সোসাইটি অথবা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহযোগিতা নিয়ে। যেখানে কোনো সংগঠন ছিলনা, সেখানে নিজে গিয়ে প্রদর্শনযোগ্য হল ভাড়া করে নিজ উদ্যোগে লিফলেট বিলি করে, টিকেট বিক্রি করে প্রদর্শনী করেছেন। পরে তার দেখানো পথে ধরে অনেকেই হাঁটবার চেষ্টা করেছেন, হেঁটেছেন। সেই চেষ্টা এখনো চলছে। এটা সম্ভব হচ্ছে ডিজিটাল প্রজেক্টর নির্ভর সহজতর প্রদর্শন ব্যবস্থার কারণেই। তবে সৃজনশীল চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রদর্শনের সংকট সবসময়েই ছিল। সরকারি অনুদান সহায়তায় নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সুর্যদীঘল বাড়ি’ও কোনো প্রদর্শক পায়নি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জমা দেওয়ার শর্ত পূরণের জন্যে ১৯৭৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর নাটোরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সিনেমা হলে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেওয়া হয়। ৩৫ মিলিমিটারে নির্মিত চলচ্চিত্র বিকল্প পন্থায় প্রর্দশন সম্ভব নয় বলে, সে সময় কেউই সে পথে হাঁটতে পারেননি। 
তবে এই মুহুর্তের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। এর মাঝে একটি আশংকার বিষয় যেমন আছে, তেমনি আছে আশার কথাও। আশংকার বিষয় হচ্ছে- কিছু কিছু জায়গায় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলো বিকল্প প্রদর্শনীর জায়গাগুলোকেও দখল করবার চেষ্টা করছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা জারী হচ্ছে সকল প্রদর্শনীর প্রতি। সীমিত হয়ে আসছে- জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র প্রর্দশনের স্থান। বিভিন্ন জেলার শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এবং শিক্ষাঙ্গনে কেবলমাত্র সুস্থধারার জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতো। দুয়েকজন বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নির্মাতা নিজেদের অবস্থান উন্নীত করবার প্রয়াসে তাদের উচ্চকিত নির্মাণগুলো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ফলাফল- সকল চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর উপর নিষেধাজ্ঞা। জানা গেছে, এমন ঘটনা ঘটেছে মোট ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আর আশার কথা হচ্ছে- বিকল্প প্রদর্শনীরও একটা গঠনমূলক আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং প্রদর্শন ব্যবস্থাকে নিয়মিত করবার চেষ্টা করছেন বেশকিছু নিবেদিতপ্রাণ চলচ্চিত্রকর্মী। তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন সৃজনশীল নির্মাতার সময় বাঁচিয়ে তার নির্মিত চলচ্চিত্রটি দেশব্যাপী প্রর্দশনের। জানিনা তারা কবে সফল হয়ে উঠবেন।

তবে এই মুহুর্তের বাস্তবতায়- দেশব্যাপী কমপক্ষে ২০টি মাল্টিপ্লেক্স হওয়ার আগপর্যন্ত এখানে সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাণের আসলে কোনো মানে হয় না। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগীতা দরকার। সরকারের বিশেষ উদ্যোগ দরকার। মননশীলতার চর্চা যদি না থাকে, একটি জাতি মননশীল হয়ে উঠবে কী করে? সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় শিল্পকর্ম প্রদর্শনের স্থান যদি না থাকে একটি জাতি সংস্কৃতিবান হয়ে উঠবে কী করে?

প্রযুক্তির উৎকর্ষতা দিয়ে আমরা কাওকে অতিক্রম করতে পারবো না, সমকক্ষও হতে পারবো না। আমাদের কোনো কমপ্লিট ইনষ্টিটিউট নেই, হাফ-ইনষ্টিটিউট যেগুলো হচ্ছে- সেখানে যথার্থ রিসোর্স পার্সন নেই। আমাদের অগ্রগতি তাই একটু শ্লথগতির। কিন্তু তবুও যাত্রাটা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের আসলে গল্পবলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নিজেদের গল্পগুলো নিজেদের মতো করে বলতে হবে। শুধুমাত্র গল্প ও বক্তব্যের শক্তিমত্তা দিয়ে ইরানি চলচ্চিত্র যে অর্থে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে, আমাদেরকে সেভাবে চেষ্টা করতে হবে। বৈশ্বিক বাজার ধরতে হবে। চলচ্চিত্র রপ্তানী করতে শিখতে হবে।

সব ইন্ডাষ্ট্রির কিছু সংকট থাকে, কিছু সমাধান হয়, আবার নতুন সংকট তৈরি হয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের সমস্যা অনেক, সে অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা এবং উদ্যোগ খুব কম। তারেক মাসুদ বলতেন- আমাদের সময়টা চলে গেলো গ্রাউন্ডওয়ার্ক করতে করতেই, বীজতলা রেডি করতে করতেই- তোমরা হয়তো চারাগাছটা দেখে যেতে পারবে। আমার পরের প্রজন্ম হয়তো দেখবে চারাগাছটা আরো খানিকটা বড় হয়েছে। রাতারাতি কোনো কিছুই পরিপক্ক হয়ে ওঠে না।

এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নটাকে এগিয়ে নিতে হবে।


প্রসূন রহমান: লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে দেশের বাইরে পড়াশোনা করেছেন চলচ্চিত্র ও সৃজনশীল মাধ্যমের নানা বিষয়ে।এ পর্যন্ত তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন ৪টি। সর্বশেষ তথ্যচিত্র তারেক মাসুদকে নিয়ে নির্মিত ‘ফেরা’। ‘সুতপার ঠিকানা’ তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩টি। প্রথমটি- রাজনৈতিক উপন্যাস ‘ধূলার অক্ষর’, দ্বিতীয়টি কাব্যগল্পের সংকলন ‘ঈশ্বরের ইচ্ছে নেই বলে’, তৃতীয়টি গণমাধ্যম বিষয়ে লেখা নির্বাচিত কলামের সংকলন ‘সৃজনশীলতার সংকটে স্যাটেলাইট চ্যানেল’। বর্তমানে কাজ করছেন নদীভাঙনে গৃহহারা মানুষের জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র এবং দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঢাকা ড্রিম’ নিয়ে।