শরত্ বর্ষার বিদায়ের বার্তা নিয়ে এলেও যেন পুরোপুরি বিদায় দেয় না! ফলে দেখা যায় শরতের প্রথমদিকে বর্ষা আর শরতের মৌসুমি সংমিশ্রণে এক অন্যরকম প্রাকৃতিক রূপ বিরাজ করে। বৃষ্টিধোয়া, মেঘ কেটে যাওয়া আকাশের রূপ, কাশফুলের দোলা, শিউলির গন্ধ - এ সবই শরত্কালের সৌন্দর্যের অংশ। শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ! নীল আকাশ, সুশোভিত পরিবেশ, ফুলের গন্ধ, ফসলে আগত যৌবনে কচি সবুজের খেলা, কাশফুলের সাথে সাদা মেঘের মিতালি এসবই দেখা যায় এই মৌসুমজুড়ে। শরত্ হচ্ছে আকাশ ও মাটির মিলন রঙের ঋতু। মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় চারপাশ, তখন শুধু সবুজের সমারোহ। কাশফুলের শুভ্রতাও যেন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
অনুপম রূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত শরত্ ঋতু শারদ লক্ষ্মী নামে পরিচিত। কারণ সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের স্নিগ্ধতা যখন প্রকৃতিজুড়ে ঠিক তখনই শুভ্র প্রকৃতির মাঝে সিঁদুররাঙা আমেজ নিয়ে আসে শারদীয় উত্সব - দুর্গাপূজা। শরতকালের দুর্গোত্সব শুধু উত্সব নয়, মহোত্সব। বিশ্বজননীর পূজা বাঙালি হিন্দুর হৃদয়কে প্রসারিত করে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে, সব দেশের মানুষকে আপন করে নিতে শিখিয়ে উত্সবকে বিশ্বজনীন উত্সবে পরিণত করেছে।

দুর্গাপূজার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, সৃষ্টির আদিতে কৃষ্ণ সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা করেন। দ্বিতীয়বার দুর্গার আরাধনা করেন ব্রহ্মা। মধু ও কৈটভ নামক দৈত্যদের নিধনের জন্য তিনি শরণাপন্ন হন দুর্গাদেবীর। তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন মহাদেব স্বয়ং, যখন তিনি ত্রিপুরাসুরের সাথে যুদ্ধকালে সংকটে পড়েন। এরপর চতুর্থ দুর্গোত্সবটি করেন দেবরাজ ইন্দ্র, যখন তিনি দুর্বাসা মুনির অভিশাপে শ্রীভষ্ট হন। দেবী ভগবত অনুসারে ব্রহ্মা ও ইন্দ্রের মতো ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসনভার পেয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে মাটির মূর্তি নির্মাণ করে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। জাগতিক মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে ঋষি মাণ্ডব্য, হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে সুরথ রাজা ও বৈরাগ্য লাভের জন্য সামাধি বৈশ্য, কার্তাবির্জাজুন বধের জন্য বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম দুর্গার আরাধনা করেন।
কৃত্তিবাসের রামায়ণে পাওয়া যায়, রাক্ষসরাজ রাবণকে বিনাশের সময় দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হয়েছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। তখন ছিল শরত্কাল। বৃহদ্ধর্মপুরাণে রামের এই অকালবোধনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণের মতে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পর রামচন্দ্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় দেবতারা শঙ্কিত হলেন। তখন সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা জানালেন, দুর্গাপূজা ছাড়া কোনো উপায় নেই। ব্রহ্মা স্বয়ং যজমানী করলেন রামের পক্ষে। তখন শরত্কাল, দক্ষিণায়ন। দেবতাদের নিদ্রার সময়। ব্রহ্মার স্তব-স্তুতিতে জাগ্রত হলেন দেবী দুর্গা। তিনি উগ্রচণ্ডী রূপে জাগ্রত হলে ব্রহ্মা বললেন, 'রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগ্রত করেছি। যত দিন না রাবণ বধ হয়, তত দিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আমরা আজ তোমার বোধন করে পূজা করলাম, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে তুমিও পূজা পাবে এভাবেই'।
এ কথা শুনে চণ্ডিকা বললেন, 'সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে রাম-রাবণে মহাযুদ্ধ হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড বিচ্ছিন্ন হবে। সেই দশমুণ্ড আবার জোড়া লাগবে। কিন্তু নবমীতে রাবণ নিহত হবে। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োত্সব'। রামচন্দ্রের অকালবোধনই পরে বঙ্গদেশে প্রচার পায়, বর্তমানে যা শারদীয় দুর্গোত্সবে রূপ নিয়েছে।

দুর্গা ও দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত কাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও লোকমান্য হলো দেবীমাহাত্ম্যমে বর্ণিত কাহিনীটি। দেবীমাহাত্ম্যম হলো 'মার্কণ্ডেয় পুরাণ'-এর একটি নির্বাচিত অংশ। সাতশ শ্লোকবিশিষ্ট এই দেবীমাহাত্ম্যমই হলো শ্রীশ্রী চণ্ডী গ্রন্থ। একারণেই দুর্গাপূজায় চণ্ডীপাঠ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেবীমাহাত্ম্যমের কাহিনী অনুসারে পুরাকালে অসুর মহিষাসুর দেবতাগণকে একশ বছরব্যাপী একটি যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গ কেড়ে নিয়েছিল। সেই সাথে অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবীবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। দেবতাগণ স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রথমে ব্রহ্মা এবং পরে তাঁকে সাথে করে নিয়ে শিব ও নারায়ণের কাছে উপস্থিত হন। মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনী শুনে তাঁরা দুজনেই অত্যন্ত রাগান্বিত হন। সেই ক্রোধে তাঁদের মুখমণ্ডল মহাতেজ নির্গত হতে শুরু করে। ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সাথে মিলিত হয়। হিমালয় পর্বতে অবস্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করে। ইনিই দুর্গা।
দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে দেবতাদের স্বর্গ ফিরিয়ে দেন এবং পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। তাই তাঁকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
আবার মার্কণ্ডেয় পুরাণমতে, দুর্গম নামের অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয় দুর্গা। বাঙালিরা এঁকে দশভুজারূপে পূজা করে থাকেন। দুর্গাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী, দশভুজা, মঙ্গলময়ী, শক্তিদায়িনী, পরমাপ্রকৃতি, আদ্যশক্তি ও স্নেহময়ী মা।