(প্রিয়.কম) বাংলাদেশের তাবলীগের একজন প্রবীণ গুরুত্বপূর্ণ মজলিসে শূরার সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ অাত্মসাত ও রাজনীতিকরণের অভিযোগ উঠেছে। মজলিসে শূরার ঐ সদস্যে নাম সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, বর্তমানে সংগঠনের ফায়সাল বা অামির তিনি। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাবলিগি সাথীদের মারপিট করার অভিযোগ ওঠেছে, হয়েছে ফৌজদারি মামলাও। বাংলাট্রিবিউনের অনুসন্ধানীমূলক রিপোর্টে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।
জানা যায়, ইতিমধ্যে এসব ঘটনাকে অামলে নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দাসংস্থা গত দুইমাস অাগে থেকেই জোর তদন্ত চালাচ্ছে।
সাধারণত তাবলীগ জামাতে আনুষ্ঠানিকভাবে আর্থিক লেনদেন করার কোনও নিয়ম নেই। অভিযোগ রয়েছে সৈয়দ ওয়াসিফ তাবলীগ জামাতের কথা বলে দেশে ও দেশের বাইরের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন যা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখেন। যদিও সর্বশেষ ইজতেমার মাঠে নসিহতের সময় দিল্লীর নিজামুদ্দীনের মুরুব্বী মাওলানা সা‘অাদ অার্থিক সহায়তা গ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
ওয়াসিফ ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ৯৪ কোটি টাকার সরকারি অনুদান গ্রহণকে কেন্দ্র করে। এরপর কাকরাইলের মসজিদ নির্মাণের নামে সংগৃহীত প্রায় ২০০ কোটি টাকা অাত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তাবলীগ জামাতের ভেতরেই। গত দুই বছরে কাকরাইল মসজিদ থেকেই তাবলীগের নামে সংগৃহিত টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ ২০১৩ সালে ইজতেমা প্রাঙ্গণে সৈয়দ ওয়াসিফের কামরা থেকে বিশাল অংকের টাকা পাওয়ার ঘটনাকে মেনে নিতে পারেননি তাবলীগের অনেকেই। এসব অর্থসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে তার কাছে অসংখ্যবার ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তিনি পাত্তা দেননি বলে অভিযোগ করেছেন তাবলীগের একজন প্রবীণ দায়িত্বশীল মুরুব্বি অধ্যাপক মুশফিক অাহমেদ।
অধ্যাপক মুশফিক অাহমেদ আরও বলেন, অর্থ অাত্মসাৎ হয়তো টাকার অংকে ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু এটিও কম। এই অর্থে যে, তিনি তাবলীগের সঙ্গে রাজনীতিকে যুক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, যেখানে টাকার গুরুত্বও কমে অাসে। সৈয়দ ওয়াসিফ একটি ইংরেজি পত্রিকায় স্বনামে হেফাজতকে সমর্থন দিয়ে, সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বক্তব্য হাজির করছেন। এগুলো তিনি সামাজিক যোগাযোগ সাইটেও প্রচার করছেন। এছাড়া সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে তাবলীগের উসূলে যেখানে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনও অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। সেখানে তিনি কী করে সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকায় লিখতে পারেন? দেশের তিন কোটি মানুষ তাবলীগের সঙ্গে যুক্ত। এই তাবলীগের সাথীদের তিনি যদি কোনও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন, তাহলে এটি ঠেকাবে কে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে কিছু বলতে নারাজ সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম। সৈয়দ ওয়াসিফ শুধু বললেন, মুরুব্বীদের নিষেধ রয়েছে।
অর্থ বিষয়ে সৈয়দ ওয়াসিফের অস্পষ্ট ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলায় গত বছর কয়েকজন সাথীকে মারধর করার অভিযোগ করেছেন মাওলানা আশরাফ আলী ও মেহেদি হাসান। এই দুজন তাবলিগি সাথী রমনা ও টঙ্গী থানায় পৃথক মামলা করেছিলেন।
গত বছরের শেষ দিকে মাওলানা অাশরাফ অালীকে টঙ্গী ময়দানে জঙ্গি বলে ও কাকরাইলে মেহেদি হাসানকে মারধরে করা হয়। এ কারণে রমনা থানায় সৈয়দ ওয়াসিফ ও তার ছেলে ওসামার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন মেহেদি হাসান। এ মামলায় আসামি হিসেবে মাহফুজুল হান্নান নামে একজন প্রকৌশলীর নামও রয়েছে। যিনি সৈয়দ ওয়াসিফের খুব কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত। বিজ্ঞ অাদালত মামলা গ্রহণ করে রমনা থানায় তদন্তের নির্দেশ দেন। চলতি সপ্তাহে মামলাটির বিষয়ে অাদালত সিদ্ধান্ত দেবেন বলে জানা গেছে।
তবে, সৈয়দ ওয়াসিফ ও অধ্যাপক মুশফিকের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিশেষ করে সৈয়দ ওয়াসিফ কর্তৃক ‘অর্থ অাত্মসাত‘ প্রসঙ্গে তাবলীগের মজলিসে শূরার প্রথম সারির সদস্য ও ফায়সাল, মাওলানা জুবায়ের বলেন, সৈয়দ ওয়াসিফের অর্থ অাত্মসাতের বিষয়ে কোনও প্রমাণ নেই। এগুলো মিথ্যে কথা। অামাদের জানা নেই। প্রফেসর মুশফিক অামার কাছে কিছুই বলেননি। ৫/৬ বছর ধরে তিনি তো দেখাই করেননি। উনি মিথ্যে কথা বলছেন।
তবে মাওলানা জুবায়ের অস্বীকার করলেও অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে অনুসন্ধানে সুনির্দিষ্ট তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সর্বশেষ জুন ২০১৪-এর প্রাপ্তি-প্রদান হিসাব মোতাবেক বাংলাদেশ তাবলীগ মার্কাজ ট্রাস্ট ফান্ডের (প্রারম্ভিক) হাতে নগদ ১৩ লাখ ৮০ হাজার ১২২ টাকা, ব্যাংকে জমা ২৯ লাখ ১৭ হাজার ৮২১ টাকা এবং হাদিয়া হিসাব ১ কোটি ২৮ হাজার টাকা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯ জানুয়ারি, ২০১৪ সৈয়দ ওয়াসিফের বিরুদ্ধে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছিলেন তাবলীগকর্মী মো. মামুনুর রশিদ।
লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, ধানমণ্ডি এলাকার ওয়াসিফুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল দেশ-বিদেশ থেকে তাবলীগ এবং কাকরাইল মসজিদ নির্মাণের নামে চাঁদা তুলে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই টাকা আত্মসাৎ করতে তাকে সাহায্য করেছে তারই স্ত্রী মিনু ইসলাম, ছেলে ওসামা ইসলাম এবং ড. ইফতেজা হাসান নামের একজন। ঐ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মেহেদি হাসান, শরিফুল ইসলাম, আবু নাইম জাকারিয়া, আতিকুল বারী, ড. আব্দুস সালাম প্রমুখ।
সূত্রঃ বাংলাট্রিবিউন, শীর্ষনিউজ