ছবি সংগৃহীত

জিলাপির আড়াই প্যাঁচে

রুমানা বৈশাখী
বিভাগীয় প্রধান (প্রিয় লাইফ)
প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০১৩, ১৬:১১
আপডেট: ১০ মার্চ ২০১৩, ১৬:১১

গরম গরম জিলাপি থেকে ভালো খেতে আর কি আছে? কিচ্ছু না! এটা কেবল আমার মনের কথা নয়, আমার মতন আরও বহু বাঙ্গালির মনের কথা। রমজান মাসে ইফতারির আয়োজনে তো আছেই। এছাড়াও কিন্তু সারা বছরই এই দেশের পথে ঘাটে রেস্তোরাঁয় মেলে জিলাপির সন্ধান। মেলে সকাল- সন্ধ্যা সারাক্ষণই। বিদেশি যে খাবারগুলো বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, জিলাপি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও জনপ্রিয়তা রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটির। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান, ইরাক, জর্দান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, মিসর, তিউনিসিয়া ও মরক্কোতে জিলাপির সুনাম রয়েছে। মরক্কো,আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া আর লেবাননে একে ডাকা হয় জালাবিয়া নামে। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে জিলাপি পাওয়া যায় না। পশ্চিম বঙ্গে ডাকা হয় "জিলিপি" নামে। জিলাপির উৎপত্তি পশ্চিম এশিয়ায়। পরে মুসলিমদের বাণিজ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশে জিলাপির আগমন। প্রাচীন ভারতে একে কুণ্ডলিকা বা জলবল্লিকা বলা হতো। পরে জলবল্লিকা থেকে এটি জিলাবি বা জালেবি নামে পরিচিতি পায়, বাঙালিদের কাছে এসে হয় জিলাপি।

জিলাপির সর্বাধিক পুরনো লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় মুহম্মদ বিন হাসান আল-বোগদাদীর লিখিত ১৩'শ শতাব্দীর রান্নার বইতে, যদিও মিসরের ইহুদিরা এর আগেই খাবারটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিল। ইরানে এই মিষ্টান্ন জেলেবিয়া নামে পরিচিত, যা সাধারণর রমযান মাসে গরীব-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া নেপালে জিলাপিকে জেরি বলা হয়। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম থেকে জেরি শব্দটি এসেছে। আফগানিস্তানে শীতের সময়ে মাছের সঙ্গে জিলাপি খাওয়ার চল রয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে খাওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটি, ডাকাও হয় ভিন্ন নামে। এবং অবশ্যই তৈরি প্রক্রিয়াতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। তবে এর জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই এক বিন্দুও। সব দেশেই জিলাপি সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল এবং আছে। জিলাপি বলতে কি বোঝায়, সেটা অবশ্য বাঙালিকে বুঝিয়ে বলার কোনও প্রয়োজন নেই। তবুও একটু বলা যাক। জিলাপি মূলত ময়দা, বেসন ও চিনির মিশ্রণে তৈরি গরম তেলে ভাজা এক ধরনের খাবার। তেলে ভাজার পর, খাওয়ার আগে চিনির রসে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখতে হয়। জিলাপির একটি বড় আকর্ষণ এর প্যাঁচ। ময়দা, বেসন ও চিনির মিশ্রণ গরম তেলে এমনভাবে ছাড়া হয় যাতে এর আকৃতি যথেষ্ট প্যাঁচানো হয়। চিনির রসে অনেক ক্ষেত্রে সাইট্রিক অ্যাসিড বা লেবুর রস ব্যবহার করতে দেখা যায়। জিলাপি গরম বা ঠাণ্ডা দুভাবেই খাওয়া যায়।
জিলাপির আড়াই প্যাঁচ নামের একটি প্রবাদ বেশ প্রচলিত। সাধারণত আড়াই প্যাঁচে তৈরি ছোট ছোট জিলাপি পাওয়া যায়। কিন্তু পুরান ঢাকার চকবাজারে গেলে সে ধারণা পাল্টে যাবে। কেননা চকবাজারের ইফতারির প্রায় সব দোকানেই এই শাহি জিলাপি পাওয়া যায়। একেকটা জিলাপির ওজন দুই থেকে আড়াই কেজি। সাধারণ জিলাপির খামিরেই তৈরি হয় শাহি জিলাপি। পাথর্ক্য শুধু এটুকুই, এটা আকারে তার কয়েক গুণ বড়। এ কারণে চকবাজারের শাহি জিলাপি অনেকেই শখ করে কিনতে আসেন। বিক্রেতারা জানালেন, অনেকেই বাড়ির মানুষকে অবাক করে দিতে এই জিলাপি কিনে নিয়ে যান। শাহি মসজিদের পাশেই ছোট দোকান হাজী মইনুদ্দিন মিষ্টান্ন ঘর। সেখানে পাওয়া যায় ১২ জাতের জিলাপি। এর একটির নাম রসবড়ি। এ দোকানের জিলাপি কিনতে ভিড় জমে বিকাল থেকেই। এ এলাকায় এ রকম আরো অনেক দোকানে জিলাপি তৈরি হয়। হরেক রকম নাম। আকৃতিতেও আছে ভিন্নতা, স্বাদে আছে বৈচিত্র্য। শাহি জিলাপি, মখমলি জিলাপি, রেশমি জিলাপি, ছানার জিলাপি, চালের জিলাপি ইত্যাদি ইত্যাদি কত রকম যে আমাদের দেশেই পাওয়া যায় গুনে শেষ করতে পারবেন না। সুতরাং এসব বাদ দিয়ে আসুন জেনে নেই ঘরেই রেশমি জিলাপি বানাবার সহজ উপায়। উপকরণ- ময়দা- ১ কাপ চিনি- ১ কাপ সয়াবিন তেল- পরিমাণ মত বেসন- ১ চা চামচ জাফরান- এক চিলতে গোলাপ জল বা কেওড়া পানি- অল্প জিলাপি তৈরির মূল উপাদান এই কটি-ই। তেলের মাঝে জিলাপি তৈরির জন্য মূলত পাতলা কাপড় ব্যবহার করা হয়। তবে আপনাদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারেন সরু মুখ ওয়ালা সসের বোতল। বাজারে ১০/১৫ টাকায় কিনতে পাবেন অনায়াসতান। প্রণালী - ময়দা ও বেসন আধা কাপ পানিতে ঘন করে করে গুলে শীতের দিনে দুইদিন এবং গরমের দিনে দেড় দিন ঢেকে রাখুন। জিলাপি তৈরি করার আগে চিনিতে আধা কাপ পানি ও এক চা চামচ দুধ দিয়ে চুলায় দিন। ফুটে উঠলে ময়লা কেটে ছেঁকে নিন। গোলাপজল বা কেওড়া মিশিয়ে রাখুন।
ময়দার উপরে দু-একটা বুদবুদ উঠলে বুঝবেন জিলাপি তৈরির উপযোগী হয়েছে। উপরের জমানো পানি ফেলে ময়দা ফেটে নিন। জাফরান মিশিয়ে আবার ফেটান। রুমালের মতো চার কোণা মোটা কাপড়ের মাঝখানে ছোট ছিদ্র করুন। কাপড় ভিজিয়ে নিংড়ে নিন। কড়াইয়ে সয়াবিন তেল গরম করুন, ডুবো তেলে জিলাপি ভাজতে পারবেন সেই হিশাবে । কাপড়ে ময়দার গোলা নিয়ে গরম তেলের ওপর জিলাপি ছাড়ুন। প্রথমে একবার ঘুরান, যে প্যাঁচ কড়াইয়ে পড়বে তার চারপাশে লাগিয়ে আর একবার ঘুরান এবং তৃতীয়বারে জিলাপির মাঝখানে হাত সামনের দিকে নিয়ে আসুন। হাত না তুলে আর একটা জিলাপির প্যাঁচ আরম্ভ করুন। এভাবে আড়াই প্যাঁচের জিলাপি দিন ও মচমচে করে ভাজুন। কম আঁচে ভালোভাবে হালকা বাদামি রঙ করে ভেজে সিরায় ছাড়ুন। সিরায় জিলাপি ডুবিয়ে দিন। জিলাপি ৮ থেকে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে সিরা থেকে তুলে পরিবেশন করুন গরম গরম। অনেকে দেশেই গরম জিলাপির সাথে পরিবেশিত হয় ঠাণ্ডা খিরসা জাতীয় খাদ্য। চাইলে আপনিও চেখে দেখতে পারেন সেই স্বাদ। তৈরিতে ভিন্নতা থাকুক, কিংবা ভিন্নতা থাকুক পরিবেশনে... শত শত বছরেও যে জিপালির জৌলুস অক্ষুণ্ণ আছে, সেটাই মোদ্দা কথা। আর থাকবেও আরও বহু বহুকাল, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।