ছবি সংগৃহীত

কোরআন-হাদিসের আলোকে হজরত লুকমান আ.-এর পরিচয়

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
লেখক
প্রকাশিত: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:৪৭
আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:৪৭

লুকমান বা লুকমান হাকিম আরববাসীর কাছে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ঘটনাবলি, তাঁর সম্প্রদায় ও তাঁর বংশপরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন মত ও বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথামালা ‘সহিফায়ে লুকমান’ নামে আরবদের মধ্যে বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ ছিলো—এ-ব্যাপারে সবার ঐকমত্য থাকলেও তাঁর সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ে মতবিরোধপূর্ণ বক্তব্য বিদ্যমান। তা এ-কারণে যে, প্রাচীনকালের ইতিহাসে লুকমান নামের আরও একজন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি দ্বিতীয় আদ (কওমে ইয়াহুদ আ.)-এর সম্প্রদায়ে একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন। তিনি ছিলেন খাঁটি আরব বংশোদ্ভূত। মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি রহ., ইমামদুদ্দিন বিন কাসির রহ. ও আবুল কাসেম আস-সুহাইলি রহ. প্রমুখ বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তার মত এই যে, বিখ্যাত লুকমান হাকিম আফ্রিকি বংশের লোক ছিলেন এবং একজন ক্রীতদাসরূপে আরবে এসেছিলেন। তাঁরা লুকমানের বংশপরিচয় এবং শারীরিক গঠনপরিচিতি বর্ণনা করেছেন এভাবে— “তিনি হলেন লুকমান বিন আনকা বিন সাদুন বা লুকমান বিন সার বিন সাদুন কিংবা লুকমান বিন আনকা বিন সারুন অথবা লুকমান বিন আনকা বিন সারুর ।” তাঁরা বলেন, লুকমান সুদানের নাওবি বংশোদ্ভূত ছিলেন। খর্বাকৃতি, স্থূলকায় ও কৃষ্ণবর্ণের লোক ছিলেন তিনি। তাঁর ঠোঁট দুটি ছিলো মোটা, হাত-পাগুলো ছিলো বিশ্রী। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সৎকর্মপরায়ণ, আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা, সংসারবিরাগী এবং প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে হেকমত ও জ্ঞানের এক পর্যাপ্ত অংশ দান করেছিলেন। আরো একটা কথা বলা হয় যে, তিনি হজরত দাউদ আ.-এর যুগে বিচারকের পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। “হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লুকমান নিগ্রো ক্রীতদাস ছিলেন। পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। কাতাদা রা. আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি জাবেন বিন আবদুল্লাহকে বললাম, লুকমানের ব্যাপারে আপনাদের কাছে কী সংবাদ পৌঁছেছে? জাবের বললেন, লুকমান ছিলেন খর্বাকৃতির, ঠোঁট দুটি ছিলো মোটা এবং তিনি নাওবা গোত্রের লোক ছিলেন।” “সাঈদ বিন মুসাইয়িব রা. বলেন, লুকমান ছিলেন সুদান-মিসরীয় বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ। ছিলেন প্রজ্ঞাবান। ওষ্ঠাধর ছিলো অত্যন্ত পুরু। এবং তিনি নবী ছিলেন না।” “সাঈদ বিন মুসাইয়িব রা. বলেন, লুকমান সুদানি-মিসরীয় কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন। ওষ্ঠাধর ছিলো অত্যন্ত পুরু। আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন; কিন্তু নবুওত দান করেননি।” “আওযায়ি বলেন, আবদুর রহমান বিন হারমালা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন : জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ সাঈদ বিন মুসাইয়িব রা.-এর কাছে এসে কিছু প্রশ্ন করলেন। সাঈদ রা. কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে বললেন, তুমি যে কৃষ্ণাঙ্গ (নিগ্রো) এজন্য কোনো দুঃখ করো না। কারণ, তিনজন সুদানি (কৃষ্ণাঙ্গ) দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন : ১. হজরত বেলাল রা.; ২. হজরত উমর রা.-এর আযাদকৃত গোলাম মাহ্জা এবং ৩. লুকমান আল-হাকিম। লুকমান ছিলেন (সুদানি) কৃষ্ণাঙ্গ; নাওবি বংশোদ্ভূত এবং তাঁর ওষ্ঠাধর ছিলো অত্যন্ত ভারী।” বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা, ইসলামের জিহাদসমূহের ইতিহাসলেখক মুহাম্মদ বিন ইসহাক রহ. বলেন, লুকমান হাকিম আরবের প্রসিদ্ধ আদ গোত্রের লোক ছিলেন। অর্থাৎ, বহিরাগত আরবদের বংশধর ছিলেন। তা ছাড়া তিনি ক্রীতদাস ছিলেন না; বরং বাদশাহ ছিলেন। “ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, শাদ্দাদ বিন আদের মৃত্যু হলে শাসনক্ষমতা তার ভাই লুকমান বিন আদের হস্তগত হয়। আল্লাহ তাআলা লুকমানকে এমনসব বিষয় দান করেছিলেন যা তাঁর যুগে আর কোনো মানুষকে দান করেন নি। আল্লাহ তাঁকে একশো মানুষের সমান জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। তিনি তাঁর যুগের লোকদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘকায় ছিলেন।” “ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেছেন, লুকমান বিন আদের বংশপরম্পরা এই : লুকমান বিন আদ বিন মুলতাত বিস সালাত বিন ওয়ায়েল বিন হামির। তিনি নবী ছিলেন; কিন্তু রাসুল ছিলেন না।” এখানে মজার ব্যাপার এই যে, ইবনে জারির ও ইবনে কাসিরও তাঁদের মতের সমর্থনে হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর উক্তিই উদ্ধৃত করেছেন। আবার মুহাম্মদ বিন ইসহাকও তাঁর উক্তিকেই তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে উপস্থাপিত করেছেন। আর আমাদের সমসাময়িক ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে ‘আরদুল কুরআন’ রচয়িতা দাবি করেন যে, হজরত লুকমান হাকিম ও বাদশাহ লুকমান একই ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায়ের সততাপরায়ণ বাদশাহগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। আরব জাতির মধ্যে ‘সহিফায়ে লুকমান’ নামে যে-পুস্তিকাটি লুকমানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো তা দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায়ের লুকমানেরই ছিলো। তিনি তাঁর এই দাবির সপক্ষে অনেক প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। তার মধ্যে এই যে, অন্ধকার যুগের কবি সালমা বিন রবিয়ার নিম্নবর্ণিত পঙ্ক্তিগুলো তাঁর দাবিকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ করছে— “কালের বিবর্তন তামস গোত্রকে ধ্বংস করেছে, ধ্বংস করেছে চতুষ্পদ জন্তুকে এবং জু-জুদুনকে; ধ্বংস করেছে জাশ ও মা’রিবের অধিবাসীদেরকে এবং লুকমানও তাকুন গোত্রকে। তিনি বলেন, “এই কবিতা থেকে লুকমান যে আরব ছিলেন কেবল তা-ই প্রকাশ পায় না, বরং তিনি একটি গোত্রের অধিপতি, ইয়ামানের বাসিন্দা এবং মর্যাদা ও প্রতাপে সাবা সম্প্রদায়ের প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন তাও বুঝা যায়। আর এসব বিষয় দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায়ের যে-লুকমান ছিলেন তাঁর ওপরই প্রযোজ্য হতে পারে। ১৮ হিজরি সালে দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায়ের একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। তাতে নিম্নলিখিত বাক্যগুলো খোদিত আছে : যে-বাদশাহ আমাদের ওপর রাজত্ব করতেন তিনি হীনমন্যতা থেকে পবিত্র ছিলেন। দুষ্কৃতিকারীদের শাস্তি দিতেন। তিনি হুদের শরিয়ত অনুযায়ী আমাদের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর উত্তম মীমাংসাসমূহ একটি কিতাবে লিখিত হতো।” কুরআনুল কারিমে হজরত লুকমান কুরআনুল কারিমও হজরত লুকমানের আলোচনা করেছে। এ-সম্পর্কের কারণে কুরআনুল কারিমের একটি সুরার নামও লুকমান রাখা হয়েছে। কুরআন তার উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে লুকমানের সম্প্রদায় ও তাঁর বংশপরিচয়ের আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে পছন্দ করে নি; তবে তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কথামালা যেভাবে উল্লেখ করেছে তাতে লুকমানের ব্যক্তিত্ব নিয়ে একটি পর্যায় পর্যন্ত অবশ্যই আলোকপাত করা হয়েছে। সুতরাং, আমাদের কাছে সঙ্গত মনে হয় লুকমান-সম্পর্কিত কুরআনের বর্ণনা উল্লেখ করার পর এই সিদ্ধান্তে আসা যে, উপরিউক্ত অভিমত দুটির মধ্যে কোনটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। লুকমান সম্পর্কে কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে— وَلَقَدْ آَتَيْنَا لُقْمَانَ الْحِكْمَةَ أَنِ اشْكُرْ لِلَّهِ وَمَنْ يَشْكُرْ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ * وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ * وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ * وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ * يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ * يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ * وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ * وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ “আর আমি লুকমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তা করে নিজেরই জন্য এবং কেউ অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ। স্মরণ করো, (সেই সময়ের কথা,) যখন লুকমান উপদেশ দিতে তার পুত্রকে বলেছিলো, ‘হে বৎস, আল্লাহর সঙ্গে কোনো শকির করো না। নিশ্চয় শিরক ভয়াবহ জুলুম।’ আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে যে-বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি তাদের কথা মেনো না। তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে বসবাস করবে সদ্ভাবে এবং যে-বিশুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অবলম্বন করো, এরপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে এবং তোমরা যা করতে সে-বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করবো। ‘হে বৎস, ক্ষুদ্র বস্তুটি (পুণ্য বা পাপ) যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মাটির নিচে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। হে বৎস, সালাত কায়েম করো, সৎকাজের নির্দেশ দিও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো। এটাই তো দৃঢ়সংকল্পের কাজ। অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করো সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো; নিশ্চয় সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।’ [সুরা লুকমান : আয়াত ১২-১৯] সূত্র : কাসাসুল কুরআন, তাফসিরে ইবনে কাসির হাফেজ মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর