ছবি সংগৃহীত

কুমার চক্রবর্তীর একগুচ্ছ নির্বাচিত কবিতা

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০১৬, ১১:৩৫
আপডেট: ১৮ জুন ২০১৬, ১১:৩৫

গ্রাফিক্স : আকরাম হোসেন।
(প্রিয়.কম) নব্বই দশকের অন্যতম কবি কুমার চক্রবর্তীর ৫২তম জন্মদিনে প্রিয়.কম পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো কবি কর্তৃক নির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা।

সমুদ্র
বিষাদাক্রান্ত হলে তুমি এখানে এসো এই মৌন নদীর ধারে, দেখবে তোমার রক্তের ভেতর নিহত নিদ্রারা আবার নড়াচড়া শুরু করে, আর তুমি শুনতে পাবে সেই আধিবিদ্যক ধ্বনির গুপ্তকথকতা।
নদীও  ধরে রাখে সমুদ্রের ছবি। একাগ্র মনোপথ, এবং অদৃশ্য মনস্তত্ত্ব।
আমরা মূলত পরিযায়ী পাখি, ঠোঁটে করে আনি হিমঋতু আর অদৃশ্য ভুবনের গান। যখন ত্বক হয়ে ওঠে ভরপুর তখন মৃত্যু আমাদের ডেকে নিয়ে যায়। আমরা ফিরি কিন্তু দৃশ্যকে বিন্যস্ত করি না। ফলে যে দ্বন্দ্বসূত্র এখন আবর্তনশীল, তার অস্পষ্ট সীমারেখা ধরে বার্তাহত হই বারবার।
বেদনাহত হলে তুমি পুনরায় ফিরে এসো এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন নদীর কাছে, যে-নদী তোমাকে গোপনে সমুদ্রের কথা বলবে, আর সমুদ্র দৃশ্যত উপস্থিতি ছাড়াই মনস্তাত্ত্বিক হয়ে উঠবে আবার।




স্যা না টো রি য়া ম

যে অশ্রু বিন্দুগুলো ঝরে তার সমবেত যোগফলগুলোকে একত্র করে আমি একটি রেখা বানাতে চাই। রেখা বানাতে চাই, তারপর রেখাকে ভেঙে বাঁকা করে তোমার পোর্ট্রটে আঁকতে চাই। রেখার শরীর থাকে না, থাকে শুধু উপস্থিতি ও সময়। সময় দিয়েই আমি যাপনের মুগ্ধ অবাস্তবতাকে ছবি বানাতে চাই। তারপরই ঠিক স্যানাটোরিয়ামে চলে যাব।
দেখতে দেখতে জীবন কেমন হয়ে গেল! যখন ছিলাম উত্তরায়ণে তখন মৃত্যু এসে রং ছাপিয়ে দিত সমস্ত শরীরেজ্জগোপনে। যখন আছি দক্ষিণায়নে তখনও সে নরম সবুজ স্পঞ্জ দিয়ে লেপে যাওয়া রংগুলোকে মুছে নিতে শুরু করল। এই ছাপাছাপি আর মোছামুছির মধ্যে আমি আছি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে- অন্তর্ঘাতময় ও ভাবলেশহীন। অর্ধনারীশ্বর হয়ে জেগে জেগে রাত কাটাই আর স্যানাটোরিয়ামে যাওয়ার প্রস্তুতিস্বরূপ বোনের জন্যে ব্যক্তিগত লিরিক লিখে রেখে যাই সীমাহীন পথরেখায়।
স্যানাটোরিয়ামে সুখ আছে। যে-মানুষেরা জগৎছাড়া, যে-মানুষেরা প্রতিবন্ধীদের মতো জীবনকে পর পর ভাবে, তারা এখানে এসে শেকড় খুঁজে পায়। তারা আকুলিবিকুলি করে। স্যানাটোরিয়ামে-যেখানে আলোরা আলেয়া হয়ে ওঠে, যেখানে হিমাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক মিলে তৈরি হয় জীবনের অন্য এক উপস্থাপনা। উপস্থাপনা, কেননা একদিন আকাশে সব তারা এক হয়ে যায়, সব মিলেমিশে আগুনের নির্জনতা তৈরি হয়ে যায়।

সব স্যানাটোরিয়ামগুলোই অভিব্যক্তিময় জাদুপাহাড়। যখন বিস্তারিত আকাশ অদৃশ্যভাবে পৃথিবীতে শেকড় ছড়ায়, যখন অনুষঙ্গপ্রধান পাহাড়গুলো খুব মৃদুভাবে ওড়াউড়ি শুরু করে- তখন  সরলতাগুলো ফরফর করে আমার চারপাশে শব্দ করতে থাকে। আমি জাদুবাস্তবতাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এবং মনোভাবনার সন্ধিগুলোকে ব্যাপ্তার্থে সাদামাটা করে রাখতে সচেষ্ট হই আরবার।
বৃক্ষরা একদিন মানুষ ছিল, মানুষেরা একদিন বৃক্ষ ছিল- এ জাতীয় উৎকেন্দ্রিক ভাবনায় আমি স্যানাটোরিয়ামে এক বছর শুয়ে থাকব আর অধিকতর মনোযোগ দিয়ে আঁকব সময়ের ত্রিমাত্রিক ডানার কাঁপন। কমপ্লিমেন্টারি রং দিয়ে আরও আঁকতে পারি অজানা হৃদয়ের ছবি যেখানে ধরা দেবে রহস্য, চিরন্তন। এভাবেই নির্জনতা ও নৈঃশব্দ্যের পরিসর বেড়ে যায়। এইভাবে রক্তের ক্লোরোফিলগুলো হলুদ হয় অতঃপর।

জানালা খুলে দেখি বাতাসের ফিসফিসানি। যে নির্জন হলুদ পাহাড়ে কেটেছে ঈশ্বরের শৈশব তার দৃশ্যাবয়বও দেখি। প্রতিধ্বনিরা আসছে দিগন্তের প্রতীকগুলোকে নিয়ে। এ বছর অসুখ থেকে আরোগ্যলাভ করব। বুক-পকেটে পুরব উড়ন্ত প্রতীকগুলো আর সাদা প্রজাপতিরা বসবে চুলগুলোর ডগায়। তারপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াব পুরো একটি দিন। সকালে পাতাগুলো ঝরে পড়বে শরীরে, এবং বিকেলে নিটশে আর বিনয় মজুমদারের দুটো বিশাল পোর্ট্রেট নিয়ে ফিরে আসব আবার তোমাদের স্তন্যপায়ী জীবনে! আর টাঙিয়ে দেবো বৃক্ষদের হ্যাঙারে। এ-ই আমার গাছপাথর মনোবাসনা।
কখনো কখনো হলুদ বনের ভেতর আমি এক সাদা কাঠের গুঁড়ি। কুঠারের ধ্বনিগুলো আমাকে শাসন করে দীর্ঘকাল। অদ্ভুত নির্জনতার ভেতরে আমি পড়ে থাকি, গায়ে জমে আছে মন্ত্রকুশল শ্যাওলা। যখন রাত বাড়ে আমি গড়াই, শ্যাওলারা চিৎকার করে ওঠে ব্যথায়। আমি গড়িয়ে গিয়ে পাথরের চাইয়ের ওপর পড়ি আর রক্তাক্ত হই। এইভাবে মনোজগতের রহস্য বেড়ে গেল। ব্যথারা পাহাড় হলো। এইভাবে জীবনের গভীরতর কৃষ্ণগহ্বরেরও জন্ম হলো। 

জন্মের ভেতর বেঁচে থাকা মানে ঠাসাঠাসি করে থাকা- ছায়ার পিঠে ছায়া, জীবনের সাথে লেপ্টে থাকা জীবন। এভাবে গ্রীষ্ম বেড়ে যায়, এভাবে শীত এসে যায়, আর রক্তের বাদাম গাছের ছায়ায় জমে ওঠে ধ্রুপদি বিষণ্ন তারা। পাখিরা বড়ো হলে বাসা ছাড়ে কিন্তু বৃক্ষ ছাড়ে না। ব্যাধিরাও দেহ ছাড়ে কিন্তু জীবন ছাড়ে না। এভাবেই জন্মসূত্র, এভাবেই ব্যক্তিবৃত্তগুলো ভেঙে টারানটেলা। ব্যথাদের রং থাকে, ব্যথাদের দিশেহারাবোধ থাকে। এই-যা। আমার মন উত্তর আকাশের টিমটিমে নক্ষত্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

স্যানাটোরিয়ামে এক মুঠো ঘুমের বড়ি আমি খাব এবার। তারপর মোমের পাখা নিয়ে ঘুমের দেশে উড়ব। উড়ব আর উড়ব, আর ধ্বনিবিপর্যয় রোধ করে বৃক্ষ আর পাখিগণের সাথে আলাপ চালিয়ে যাব মৃত্যুপর্যন্ত, জন্মপর্যন্ত।

এ বা রে র  শী ত কা ল

আমি যেদিকেই যাই সেদিকেই শীতকাল রহস্য নিয়ে ছাপাছাপি করে। যে-পথে নিদ্রারেখা বেঁকে যায় সেই পথসূত্র গোপনীয় করে ত্বকের নীচে জমা হতে থাকে তুষারসকাল।

ঘাস-পাথরে গড়ানো মানুষেরা, শোনো-জীবনের ওপর তির্যকভাবে পড়ে আছে সূর্যাস্তের হরেকরকম প্রতীকতাবোধ। উদ্যোগ ছিল গ্রীষ্মের অন্তর্বিশ্ব। বিচ্ছিন্ন হতে হতে যতটুকু অন্তরঙ্গতা গৌরবের সফলতাকে ম্লান করে, সেই দ্রষ্টব্য-পরিস্থিতির ঢেউগুলো বিলীন হয়ে যাওয়ার  অদৃশ্যতা নিয়ে উদ্ভাসিত এই ছায়াসংগীতকাল। উপলব্ধি করি মাটির নীচে অন্ধকারের বঙ্কিমতা, আর মূক শীতকাল এখন শরীরের লোমগুলো ঝরিয়ে দিয়ে যায়। এ-ই রহস্য, এ-ই আবহমান সুচতুর মায়াজাল।
যেতে যেতে পেরিয়ে গেলাম পাখিদের নির্মিত সাঁকো, শস্যগ্রাম ও বাসনালব্ধ ধ্বনিময় মাঠ। কুয়াশার স্তন আর পাখিদের উজ্জ্বল ধাতুগুলো অনন্তের ইচ্ছাগুলোকে অবলুপ্ত করতে প্রস্তুত। বৃক্ষের খবরাদি নিতে গিয়ে অতঃপর আবিষ্কার করলাম মৌমাছিদের হা��ানো বেদনা, যারা সকল আবশ্যকতা থেকে আকাশকে ঘোষণা করেছিল যারপরনাই মুক্ত।

বস্তু ও ফলনের মুহূর্ত, যথার্থই তারা আমাকে দেখায় পুরাতনের জন্যে শুভকামনা আর হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ববোধ। শৈশবের দোলনায় হারানো সুগন্ধ থেকে পরাজিত মাঠের এই মুগ্ধস্তব্ধতা-এইসবই পর্যটকদের সুদৃঢ় প্রকাশভঙ্গির মহিমা যা স্বপ্নের ঐশ্বর্যকে চমৎকৃত করে।
বর্ণমাছ আর কাঁকড়া-ভরতি খালের ধারে পেয়ে গেলাম সরল রহস্যময় কিছু লঘু-বাস্তবতা এবং প্রত্যাবর্তনপ্রিয় সময়ের শব্দ ও সুর। এইভাবে আমি বললাম, কারণ অজানার দিকে সরে যাওয়া যাবতীয় বিকাশধারাকে এখন পাখিরা কিছুক্ষণের জন্যে থামিয়ে রেেেখছে নিবিড় মুহূর্তজীবিতায়।
এই কুয়াশাকালে ভূমির চিহ্ন হতে মুক্ত হতে হয়েছে আমাকে। সূত্র ও পরিব্যাপ্তিকে এখন আর দৃশ্যমান করতে পারি না। আধিক্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছে মহাপ্রকৃতি। হাড়ের ভেতর কুয়াশার কান্না। এবারের শীতকাল আশ্চর্য ইঙ্গিত দিয়ে আমাকে একা করে যায়।


আ য়ু র  স মা ন  জী ব ন

ধরো, এসব কিছুই আমার লগ্নরাশিহীন গূঢ় আত্মজীবনী
অনেক যাবতীয় অর্থহীনতার এক ধরনের বাচাল নিহিতার্থ।

জেনো, জীবনের ভেতরে ব্যর্থ সুরের রেকুয়েম আছে
যেমন আছে বিনম্র চামড়ার অভ্যন্তরে অজানা হাড়ের কান্না,

উৎস ও বিশ্লেষণের দিকে গিয়ে দেখবে
নানাবিধ উপস্থাপনার মধ্যে তারা অনেক ফানুসের নীরবতা তৈরি করেছে
সাদা দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে নৈঃশব্দ্যের চৌখুপি ফ্রেম,
তারই মধ্যে নানা ও অনেক ধরনের অন্ত্যমিলের বিন্যাস
দৃশ্যের বিচিত্র বিভঙ্গ আর কিছু তাৎক্ষণিক অমনোযোগী মুহূর্তের ডাগর আঁখিপাত
---যখন জীবনের ভূমিকাগুলি অনুগত অস্তিত্বের দিকে প্রসারিত হয়

অনেক বিপর্যস্ত গম্বুজের মতো
দেখো, অভিপ্রায়ও  প্রকাশিত হয় আর
কবিতাগুলি বর্জন করতে শিখে কণ্ঠস্বরের জাঁকালো চতুর্দশপদী

আমার অনুসন্ধান আর স্থিতির মর্মরাশি
স্মৃতি দর্পণ হয়ে তার প্রতিবিম্ব সাজায়
বিরহ জীবনকে অশেষ খেলায় জিতিয়ে দেয় শেষাবধি
আমরা জন্মহীন হই
আমাদের ডগমগে মনস্তাপগুলো নিশ্চুপ হয়ে রাতের ভারসাম্য খোঁজে

জেনো জেনো, এ আর কিছু নয় আমার আয়ুর সমান জীবন
আমার জীবনের সমান আয়ুর অস্পষ্ট কালহীনতার বিস্তার


লি থো গ্রা ফ

ব্যাধিগ্রস্ত হলে একজন তোমার প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে, তোমার ফুসফুস ভরে যায় অমল শুদ্ধতায় আর নিজের সময় ভেঙে ভেঙে সে শোধন করে তোমার আধিব্যাধিময় শারীরভূমি।
জ্ঞানভারে যখন তুমি চিন্তাগ্রস্ত আর মনোভারে স্কিটজোফ্রেনিক, তখন এভাবেই এসে দাঁড়াবে, দেখবে- বিস্তারিত মহিমা রচনা করবে চিন্তা ও অচিন্তার শেষ সমাধিলব্ধি। তুমি সুস্থ হতে থাকবে যেভাবে পাখিরা নিমিষ নীলিমার দিকে তাকিয়ে গৌরবান্বিত করে নিজ আত্মার সকাল।

বৃক্ষদের নামগুলো এক-তারা সবাই সবুজ। তুমিও নিজেকে ভাবো এক ভ্রাম্যমাণ বৃক্ষ যার শিকড় প্রোথিত আকাশের অনন্তে-গভীরতার বিচিত্রবিন্যাসে। ভাবনা থেকে মুক্ত হও তুমি। প্রস্থানের পথ চেয়ে হাহাকার কোরো না, কেননা তোমার প্রয়োজন দ্রাঘিমা ও উচ্চতার।
চোখ দিয়ে যা কিছু দেখেছ তা দৃষ্টিগত, ত্বক দিয়ে যা কিছুই ছুঁয়েছ তা স্পর্শগত। চিন্তা ও অনুশীলনের মাঝখানে যা ছিল-সব ধ্বনিগত সমগ্রতাবোধ; দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুর মাঝখানে যা ছিল সবই হারাকিরি বিস্ময়বোধ। যেখানে মানবিক কেন্দ্রের মুখে তুমি সেখানেই অবসাদ ও সমর্পণের অনুসন্ধিৎসায় ভরপুর হয়ে ওঠে জীবন সরল ফুলপাখির রীতিমুগ্ধতায়।

সুস্থ হও তুমি, সুস্থ হও। যখন বাহুল্যে ভরে ওঠে ফুলের মন, যখন অভিজাত বেদনারা খুঁজে পায় দর্পণের নীরবতা, ঠিক তখনই তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো। কেননা সমর্পিত জীবনে তুমি রচনা করেছ এই লিথোগ্রাফ— মেঘশরীরের মতো যা অস্পষ্ট অথচ অনিবার্য।
তোমার তো রয়েছে সেই মন ও মুহূর্ত যাকে নিয়ে তুমি সকল জীবিত ও মৃতদের রহস্যকে ভেদ করতে পারো দীর্ঘ সীমারেখায়।





অ ন্ধ রা ত

অন্ধরাত মুগ্ধতা ছড়াও পূর্বাপর
মায়াময় তোমার স্বত্বাধিকারে।
দেখো,-এই পাতালপ্রবাহ যেন
রীতিবহির্ভূতভাবে আমি স্থূল হতে পারি
পবিত্র আত্মার ফলাফলে। অপ্রত্যক্ষে
চলেছি অনেককাল-ভুলে যাওয়া ক্রমাগত
আর ভুল পথে চলা, স্থির চোখে
যাবতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জাগতিক
মুগ্ধতাবোধের কাছে মুহূর্তকে করেছি
বিবেচিত বস্তু ও প্রাণের
অন্তর্ধানে, সে কখনো বারিত করেনি
 স্খলিত মনের প্রতিধ্বনি।

কেন যে শেখাও একা হতে? অন্ধকারে
কী-আছে আমার করণীয়- ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যবর্তী
একাকিত্ব ছাড়া? বস্তুজগতের সুরে
এখন তো রয়েছি শুধু অনুষঙ্গে ভরপুর
প্রান্তিকতা আমাকে করেছে লুব্ধ
বিস্মৃতির অস্থিহীন দেহে, যেন আমি
রাশিহীন, কেউ-বা দিয়েছে জন্ম
হলুদ পাতার পর, যার ফলে রক্তও
হয়েছে কিঞ্চিতাধিক হলুদ অন্তঃকরণীয়।

দিয়ো না মুহূর্তকাল-স্তব্ধতা ও স্থির অবয়বে
অন্ধকারে চোখ খুলে দেখি পৃথিবীর
ঘুম, নক্ষত্রের পাতানো সংসার; দেখি
মেঘ অকস্মাৎ দৃষ্টিগ্রাহ্যতায় উদ্বেল হয়েছে,

আমাদের শেষ বোঝাপড়াগুলো
আমি সেরে নেব অতঃপর একা হতে হতে।






আ মি  কো থা ও  নে ই

প্রতিটি মুহূর্তের মাঝে আমি আছি কালপুরুষ
এমনকী জন্মমৃত্যুর দুটি দাঁড়ির মাঝেও একাকী মেরুজ্যোতি, যখন ভাবনার পরিপন্থী হয়ে
হেঁটে যাই বেশ্যাপাড়ার নিস্তব্ধ কোলাহলের অবকাশে , তখনও...

ফুটিফাটা রৌদ্রের ভেতর, ছায়াবিছানো কোনো বৃক্ষের ভেতর,
প্রতারণার কোনো অন্ধকার মৌচাকের ভেতর অথবা ধরো অরণ্যের বৈঠকখানায়
জড়ো হওয়া যাবতীয় স্টিললাইফ রহস্যের ভেতর
জমানো জীবনগুলোকে যখন পেরিয়ে যাই তখন প্রশ্ন আসে—
ফুল না শেকড়—কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ !

ভাবিনি দৃষ্টিহীন বস্তুর অবস্থান ও গুরুত্ব, যা কিছু
পূর্বনির্ধারিত তার প্রায়ান্ধকার থেকে অভিযানে বের হয়ে আসা
আত্মচেতনাগুলো আমাকে ক্লান্ত করে, কেননা
জীবনের পাশ দিয়ে যারা হেঁটে যায় তাদের পদচিহ্ন
ভারী হয়ে সেঁটে আছে এখন প্রশ্নতোলা মনের অন্তরালে।

বেঁকে যাওয়া দুপুর, ছায়াবৃত্তগুলো অধিক গোল হয়ে ওঠে
আর দেহের ভেতর বন্দি ছায়াশরীর ক্রমাগত নিশ্বাস ছাড়ে,
নিগূঢ় ছদ্মবেশে বরফমাছের মতো
এখন ভালোলাগে-না মরশুমি পাখিদের রংবাজি।
আমি হবো-না কবি কেননা চিলেকোঠায় থাকতে পারিনি আমি,
ছন্দের ভেতর গাঁথতে পারিনি শব্দ ভাঙার গান।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এখন পা থেকে শিকড় ছড়াচ্ছে, হে ভূমি
শুয়ে থাকতে থাকতে এখন পিঠ থেকে পিরামিড গজাচ্ছে, হে পাথর
রক্তের ভেতর জন্ম নিচ্ছে হলুদ শৈবাল, হে সমুদ্র

তোমরা বলো তোমরা জানো না
কিন্তু আমি জানি আমি আছি, কেননা
আমি যে কোথাও নেই !






অ সু স্থ তা

তোমাকে বলছি গোপনে, এ আর এমন কী
অন্য কিছু নয়, -এ-ই আমার আপন জীবন-সংকেত
যখন হয়েছি প্রতিহত, সে আমাকে
বলেছে নিজের কথা আত্মগত অবলুপ্ততায়।

যখন গিয়েছি অকুস্থলে বায়ুবদলের ছলে, নদীদের নিকটস্থ
পাখি-পর্যটনে, তখনও দেখেছি-আমাকে
কে যেন জল ও জীবনের দিকে রেখে চলে যায়
খেলা করে সকালের আবডালে, মুখ্যত
প্রকৃতিবিজ্ঞান আর নির্জনতার নিজস্ব বোঝাপড়ায়
যথার্থই দুরাকাঙ্ক্ষা সূর্য ঘোরে জাগতিক
চিন্তাশীলতায়- যখন ভ্রাম্যমাণ পাখিরাও
মৃদু পায়ে চলাফেরা করে
নৈঃশব্দ্যদূরত্বশাসিত প্রতীক্ষায়

এভাবেই অসুস্থ হয়েছি আমি-কিছু
অবিশ্বাস আর অবলুপ্তিভার নিয়ে
সন্ধ্যা হলে স্থির পায়ে ছোটাছুটি করি
আত্মময় বিস্মিত আবেগে। অন্ধনদীপারে
এই জানাশোনা- কে যেন ফলাফলগুলো
একসাথে করে নিলামে হাঁকায় এ জীবন।

আমি বলি প্রয়োজনে আমাকেও মুক্ত করো,
জীবনউদ্যানে, অসুস্থতা, আলো ও পাতার
গোপনে, অবশিষ্ট অবান্তর তখন!

 



স্তব্ধতার সংকেত
ধরো এই আমার গান, স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আচ্ছন্ন সুরের ধারা।
রাতে, পৃথিবী যখন দিনের বিরহে ভোগে, তখন
কে যেন নালির রক্তগুলোকে ময়ান দিয়ে অদ্ভুত চাকা বানায়
আমি সেই চাকায় চড়ে অজানার দিকে যাই।

বিস্মৃতিও  মাঝে মাঝে শৈলীযুক্ত হয়,
স্নায়ুর মর্যাদাপূর্ণ এলাকায়
পিরামিডের মতো শীতস্তম্ভ  গড়ে তোলে।

আমি শুশ্রষা পেয়েছিলাম ওইসব বাগানের অবসন্নতায়
ফুল যেখানে তার অশ্রু ঝরায়
গাছেরা গড়ে তোলে স্তব্ধতার উপনিবেশ।

পাখি আর  আকাশের হাহাকার
অজ্ঞাত এবং বিষণ্ন
অবলম্বনের মতো গুনগুন
আর এই নিঃসঙ্গ চিহ্ন
ইচ্ছাহীন অস্তিত্বের ভেতর এখন
স্তব্ধতার সংকেত সাজায়।




জার্নাল : ১৪১৮

বেলাশেষের কোনো আলপথ ধরে চলতে শুরু করলে আর ফিরে আসার ইচ্ছে হয়  না। অস্তহীন পথ, অনস্তকাল ধরে হাঁটার মোহটান। তবে চারপাশে ঘাপটি-মেরে-থাকা  নির্জনতা চাই যেন হাঁটতে হাঁটতে সে স্পর্শ করবে আমাকে, আমিও ছোঁব তার কানের  শীতল স্নায়ুলতা।
কতকাল হলো শব্দদের রেখে অর্থরা চলে গেছে দূরের নির্জনে। আজ তাদের সাথে দেখা হতে পারে। দেখা হতে পারে ঝরাপাতাদের সাথে। পাতাদের ভাষা আমি শিখেছি নিঃসঙ্গ পাকুড়ের কাছে। কতকাল নগ্ন পায়ে ঘাসেদের কাছে যাওয়া হয়নি। জলমগ্ন হিজলের কাছে গিয়ে ঘটাতে পারিনি আত্মজীবনের নিমজ্জন।

হাঁটছি আমি উড়ে ও জোরে, বাতাসে ভর করে। খুলে দিয়েছি সঙ্গোপনে-রাখা  প্রেমের সুগন্ধি বয়ামগুলো। প্রেম, টানেলে আমাদের শেষ দেখাদেখি, তারপর সুড়ঙ্গ ধরে অস্তর্হিত হওয়ার আনচান। প্রেম শিখিয়েছে, নগ্ন হলে নিজের শরীর আয়না হয়ে ওঠে,  গোপন সমুদ্ররা শঙ্খের বেদনাকে প্রকাশ করতে থাকে। বিচ্ছিন্ন হতে গেলে একত্র হতে হয়, রেখে যেতে হয় ম্যাটাডোরের স্বপ্ন। পুনশ্চ প্রেমের কথা  হতেই মনে পড়ল বেহাগ রাগে সেই বন্দিশটির কথা: লাটা উলঝি সুলাঝা যারে বালমা। কেন যেন আরও মনে পড়ল বেন জনসনের সেই গান: ড্রিঙ্ক টু মি ওনলি উইথ দাইন আইস।

এসে গেছি বনপ্রান্তের সন্ধিমাহাত্ম্যে। গোধূলির তোরঙ্গে দেখব অন্ধকারের থইথই ভাব। আহা গোধূলি, আমাদের ত্রিকালধন্য যৌথ মনোভার! দেহের লুকোনো অন্ধকারেরা এখন বেদনাময় হবে, রং ফলাবে অন্য জীবনের।
এখন নভশ্চর আমি, যাচ্ছি আকাশের উড়ালপ্রান্তিকে। কতকাল ওড়াউড়ি হয়নি। দেখা হয়নি নৈঃশব্দ্যের সাথে একা অন্ধকার রাতে।আজ উড়ব পাখা ছেড়ে দিয়ে, মন খুলে দিয়ে। আর যে-নক্ষত্রদের হারিয়ে ফেলেছিলাম অযুত বছর আগে, তাঁদের সাথে দেখা হবে আজ, কথাও হবে শ্রুতিহীন আকাশভাষার অবকাশে।


রহস্য

প্রতিটি মানুষের কিছু নিস্তব্ধ রহস্য থাকে
নিদ্রাঘোরে  রহস্যরা তাকে ঘিরে অধিবৃত্ত রচনা করে।

দ্যাখো,  জানাশোনার বাইরে তোমাদের বাগানের মুক্তাঝুরি
আর জীবন থেকে ঝরে পড়া দু-চারটি রহস্যপাতার গান―
করোটিজুড়ে স্তব্ধ ক্ষতচিহ্নের ওপর রেখে যায় আগুনের সংকেত
আর বিচলিত নিদাঘের প্রাণ।

বন্দরের দিকে আদলহীন তুমি অকস্মাৎ বায়ু আক্রমণে
হয়েছিলে জীবনতাড়িত, তোমার বিকেল আর অন্তর্বৃত সকালেরা
খেয়ালের মতো দীর্ঘ হতে থাকে
 ভরে ওঠে ডাকাবুকো রেশমখেলায়, এইবেলা

সংগীতহীনের গান, শব্দনিয়ন্ত্রিত এই জলীয় সন্ত্রাস
এইসব জেনেশুনে
ভুল দিকে চলে গেছে সাদা নাবিকের দল
মেসমারিজম, আমরাও পতঙ্গের অনুকূলে সংঘবদ্ধ
জাহাজের গতি দেখে দেখে, বুঝি ছায়া আর রহস্য-অতল

প্রতিটি মানুষের এক চান্দ্ররহস্য থাকে
মৃত্যু হলে  রহস্যরা
বিবাগি জাহাজের মতো পোতাশ্রয় ছেড়ে চলে যায়
তোমাকে যাত্রীর মতো একা রেখে
অবেলায়...



তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ

তোমার ভেতরে ঝরাপাতাদের এক জগৎ আছে
মাঝে মাঝে অন্য কোনো সুপ্রকাশে এই সব পাতারা সরসর শব্দ করে ওঠে।
কোনো এক সহজবেলায় কী-জানি-কী শব্দ করে
চলে যায় অনিত্য কালের উপস্থিতি
ঝরাপাতা অন্তর্ভাবে, একা, চুপ করে থাকে।
মৃদুভাবে টের পাই পাখিদের হেঁটে চলা
আর বুঝি অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে মৃদুপথে
মনের গোপনগৃহে হাহাকারময় নিুচাপ
সে যে জানে একা হতে, একা হয়ে একা চলে যেতে
যে পথে পাতারা একা উড়ে যায় স্মৃতিচিহ্নহীন
যে পথে পাহাড় একা অজানায়  যায়
যে পথে জীবন একা দৌড়ে যায়
সহজবেলার গান বেঁধে, শব্দহীন অজানায়
একা হতে
সবকিছু থেকে একা হতে হতে
স্বপ্ন থেকে পিছলিয়ে সে যে জানে
দূরত্ব বেড়েছে শব্দমনে, জমে থাকা জীবনপাতায়
ত্রিকালজ্ঞ ছত্রাকেরা হাস্য করে অলসভঙ্গিতে
অজানার অশ্বখুরধ্বনি চৌকাঠ পেরিয়ে
দ্রুতলয়ে দূরে চলে যায়
কায়াহীন কোনাভাঙা পতঙ্গের ছায়া
পড়ে থাকে―একে অন্যের ওপর
যেন সময়ের রাজা আপন খেয়ালে বাতাসে ওড়ায় শূন্য বুদ্বুদ
জীবন তো সেই সকালে পান করে বসে আছে হলুদ পাতার  হেমলক।

তবে চলো হে চিহ্ন, হে আকরণ, গুপ্তপথ ধরে চলো যাই কোনো এক
সীমাহীনতায়, অনিবার্য চরাচর নিজস্ব নিয়মে গড়ে মেঘমৃদুলতা।
স্তব্ধতার এই বোধ, তুমি জানো তোমার ভেতর 
শুকনো পাতার এক গোপন আড়ত আছে
নিস্তব্ধ দুপুরে তারা নড়ে ওঠে, কথা বলে, অতঃপর নির্মেঘ রাতের দিকে উড়ে যায় 
একা একা, মৃত দেবতার সাথে কথা বলে স্তরমেঘ, হাওয়ায় হাওয়ায়।