ছবি সংগৃহীত
কিতাবুল ইমান : প্রবন্ধ নং- ৬৬ : কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং তাদের ধর্মের প্রতি সম্মতিজ্ঞাপন
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০১৪, ০৪:৪২
আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৪, ০৪:৪২
আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৪, ০৪:৪২
কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং তাদের ধর্মের প্রতি সম্মতিজ্ঞাপন
আমরা জেনেছি যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কোনোরূপ ইবাদত অর্পণ করব না, এ কথার স্বীকারোক্তি প্রদান। ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহ’র এ অর্থনির্দেশের তাগিদ আমরা অন্য একটি আয়াতেও পাই। তা হলো আল্লাহ তাআলার বাণী- أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ‘যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে’-(সূরা আন্-নাহল, ৩৬)। এ আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’ - এ সাক্ষ্য ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি অন্যান্যদের ইবাদত পরিহার করা হবে, অন্যকোনো মাখলুক কোনো প্রকার ইবাদত পেতে পারে তা অস্বীকার করা হবে। এ বিষয়টি স্বতসিদ্ধ, তর্কাতীত। এ ক্ষেত্রের আরেকটি তর্কাতীত বিষয় হলো, কাফেরদের প্রকাশ্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- তারা আল্লাহ তাআলাকে যেভাবে ইবাদত করা উচিত সেভাবে ইবাদত করে না। অথবা তারা আল্লাহর ইবাদত করার ক্ষেত্রে, আল্লাহর সঙ্গে অন্যদের ইবাদতকেও শরীক করে। এর ওপর তারা রিসালাতকেও অস্বীকার করতে পারে, রাসূলের ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে এমন কথা ও আচরণ প্রকাশ করতে পারে, যা ইসলামের বিপরীত, শহাদাতাইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ দুটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় সামনে রেখে, শাহাদাতাইনের দাবি মোতাবেক, যারা আল্লাহর শত্রু, আল্লাহর দ্বীনের শত্রু- যেমন কাফের, মুশরিক ও মুরতাদ - এদের সঙ্গে একজন মুসলিম কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, এদের সঙ্গে সম্পর্ক চর্চার সর্বশেষ সীমানা কী, যা অতিক্রম করলে একজন মুসলমানের ঈমান বিপর্যস্ত হয়ে যাবে, কুফরের ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হবে, তা নির্ণয় করা যাবে। আর যে সীমানার মধ্যে অবস্থান করলে ব্যক্তি যে কুফরের সন্তুষ্টচিত্ত নয়, তা বোঝা যাবে। আর যদি মুসলমান, এ সীমানা অতিক্রম করে কাফেরদের আনুগত্যের বলয়ে ঢুকে যায়, তাদের বাতিল দ্বীনের ওপর সম্মতি প্রকাশ করে, তাদের বাতিল দ্বীনের ব্যাপারে অর্থ, সমর্থন ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করে, তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের সম্পর্ক কায়েম করে, মুসলমানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছেড়ে দেয়, কাফেরদের সঙ্গে সম্পর্ককে মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্কের চাইতে অধিক মর্যাদা দেয়, কাফেরদের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য মুসলমানদের সঙ্গে থাকা সম্পর্ককে জলাঞ্জলি দেয়, তাহলে সে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে, মুরতাদ বনে তাদের দলভুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে ঘোর শত্রুতাকারী কাফেরে পরিণত হয়। ব্যতিক্রম শুধু ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যে এরূপ করতে বাধ্য হয়েছে, অর্থাৎ যে কাফেরদের আধিপত্যের আওতায় বসবাস করে, যারা তাকে তাদের বাতিলের আনুগত্য করার নির্দেশ দেয়, আনুগত্যে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয় অথবা তাকে নানারূপ শাস্তিতে নিপতিত করে। যদি অবস্থা এই হয়, তাহলে অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা বজায় রেখে কেবল ওপরে ওপরে সম্মতি প্রকাশ করা বৈধ রয়েছে। কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব না রাখার বিষয়টি শাহাদাতাইনের অর্থভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি এ ব্যাপারে বহু আয়াত রয়েছে, যা কাফেরদের সঙ্গে এ জাতীয় সম্পর্ক চর্চা না-করাকে ফরজ করে, তাদের ধর্মে সম্মতিজ্ঞাপনমূলক যে কোনো পদক্ষেপ থেকে শতক্রোশ দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়। শুধু তাই নয়, বরং কিছু আয়াতের আপাত-অর্থ কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব চর্চাকারী ব্যক্তি কাফের ও মুরতাদ হয়ে যাওয়ার কথা বলে। যদি শাহাদাতাইনের অর্থ ও এ আয়াতসমূহের ভাষ্য একত্র করা হয়, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এরূপ ব্যক্তি কাফের-মুরতাদ হয়ে যাওয়া প্রকৃত অর্থেই, এ ক্ষেত্রে কোনো তাবিল বা দূর ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। নিচে, এ সংক্রান্ত আল-কোরানের কয়েকটি আয়াত ব্যাখ্যাসহ উল্লেখ করছি, ক-আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً ‘মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোন ভয়ের আশঙ্কা থাকে’-(সূরা আলে ইমরান, ২৮)। মুমিনদের ছাড়া কাফেরদের অন্তরঙ্গ বন্ধু, সঙ্গী-সাথী না-বানানোর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। যারা এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু, সঙ্গী-সাথী হিসেবে গ্রহণ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না বলে এ আয়াতে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। ইমাম তাবারী র. ‘মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদের বন্ধু না বানায়’-এর ব্যাখ্যায় বলেন,‘এর অর্থ হলো, হে মুমিন সকল, তোমরা কাফেরদের সাহায্য-সহযোগিতাকারীরূপে গ্রহণ করো না, যাদের সঙ্গে তাদের দ্বীনের ইস্যুতে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রাখবে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যাদের সাহায্য করবে, যাদের কাছে মুসলমানদের গোপন বিষয়গুলো বলে দেবে। যে এরূপ করবে আল্লাহর সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এ ব্যক্তির দায়দায়িত্ব থেকে পবিত্রতা ঘোষণা করলেন এবং এ ব্যক্তিও আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলল, সে ইসলাম পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গেল এবং কুফরিতে প্রবেশ করল।’ [তাফসিরে তাবারী ৬/৩১৩ [ অনুবাদকের টিকা)- ইমাম তাবারীর ব্যাখ্যা থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যে প্রকৃতির বন্ধুত্ব নিষেধ করা হয়েছে, তা হলো অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব যাতে থাকে ইসলামের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও বন্ধুর মর্জিকে প্রাধান্য দেয়া, বন্ধুর কাছে মুসলমানদের গোপন বিষয়গুলো বলে দেয়া। এ প্রকৃতির সম্পর্কেকেই ‘ওয়ালা’ বলা হয়। এর বিপরীতে যারা ইসলাম বিদ্বেষী বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত নয় এমন অমুসলিমদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করার অনুমতি রয়েছে যাকে আল কুরআনে ‘বির’ বলা হয়ছে। ইরশাদ হয়েছে: لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ . إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ‘দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করছেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ও তোমাদেরকে বের করে দেয়ার ব্যাপারে সহায়তা করেছে। আর যারা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, তারাই তো যালিম’-(সূরা আল মুমতাহিনা:৮-৯)। অমুসলিমদের সঙ্গে আরেক প্রকার সম্পর্ক হলো দাওয়াত ও নসীহতকেন্দ্রিক সম্পর্ক, যার উদ্দেশ্য তাবলীগে দ্বীন ও মানুষের ওপর আল্লাহর হুজ্জত(প্রমাণ) প্রতিষ্ঠা করা, যা সকল নবি রাসূলের দায়িত্ব ছিল এবং প্রত্যেকেই যার যার কাওমকে বলেছেন- أُبَلِّغُكُمْ رِسَالَاتِ رَبِّي وَأَنَا لَكُمْ نَاصِحٌ أَمِينٌ ‘আমি তোমাদের নিকট পৌঁছাচ্ছি আমার রবের রিসালাতসমূহ এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করছি। (সূরা আল আরাফ:৬২)। (অনুবাদক)] আর আল্লাহ তাআলার বাণী,‘তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ভয়ের আশঙ্কা থাকে’- এর ব্যাখ্যা আমরা অন্য একটি আয়াতাংশ থেকে আরও স্পষ্টরূপে বুঝতে পারি। আর তা হলো إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ -‘তবে যাকে বাধ্য করা হয় (কুফরি করতে) অথচ তার অন্তর থাকে ঈমানে পরিতৃপ্ত।’ [সূরা আন্-নাহল: ১০৬ ] অর্থাৎ মুসলমান যদি তাদের দ্বারা দমিত থাকে এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদে অপারগ থাকে, তাহলে তাদের সঙ্গে আপাত-আচরণে বৈরিতা প্রকাশ করবে না, তবে হৃদয়ের গভীরে জাগ্রত রাখবে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান আর কুফরি ও আল্লাহর শত্রুদের জন্য পরিপূর্ণ ঘৃণা ও বৈরিতা। ইমাম ইবনে জারীর আত্-তাবারী বলেন, ‘তবে যদি তোমরা ভয় কর এবং অন্তরে তাদের জন্য বৈরিতা রাখ, তারা যে কুফরিতে আছে, তার সঙ্গে তাল না-মিলাও, এবং তারা যদি মুসলমানের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করে তবে তাদের সাহায্য না কর।’ [তাফসিরে তাবারী ৬/৩১৩] কি পরিমাণ বাধ্য হলে তাদের সঙ্গে তাল মেলানো যাবে, এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পরে আসছে, ইনশাআল্লাহ। খ-আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ. فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ ‘ হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও নাসারাদেরকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের অন্তরঙ্গ বন্ধু, আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ জালেম কাওমকে হিদায়েত দেন না। সুতরাং তুমি দেখতে পাবে, যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তারা কাফেরদের মধ্যে (বন্ধুত্বের জন্য ) ছুটছে। তারা বলে,‘আমরা আশঙ্কা করছি যে, কোনো বিপদ আমাদেরকে আক্রান্ত করবে। অতঃপর হতে পারে আল্লাহ দান করবেন বিজয় কিংবা তাঁর পক্ষ থেকে এমন কিছু, যার ফলে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছে, তাতে লজ্জিত হবে’-(সূরা আল মায়েদা, ৫১-৫২)। এখানে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন যে, আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান রাখা, কাফেরদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করার সঙ্গে জড়িত। অতএব, যদি কাফেরদের সঙ্গে কারও অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব প্রমাণিত হয়, তবে তা ঈমানকে অবশ্যই নস্যাৎ করে দেবে; কেননা কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব না-রাখা ঈমানের একটি আবশ্যিক দাবি। যদি এ দাবি অনুযায়ী আমল না করা হয় তবে মূল ঈমানই নস্যাৎ হয়ে যায়। উপরন্তু, যে ব্যক্তি কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রাখে, সে আল্লাহ তাআলার রাগ-রোষের পাত্র এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামি বনে যায় বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো মুমিন থেকে এ ধরনের আচরণ প্রকাশ পেতে পারে না, মুমিন ব্যক্তি বরং আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে শত্রুতা রাখে, বন্ধুত্ব রাখে না। এরপর দেখুন, আল্লাহ তাআলা কীভবে কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব না-রাখাকে শাহাদাতাইনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তিনি এটাকে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর ওপর যা নাজিল করা হয়েছে তার প্রতি ঈমান বলে আখ্যায়িত করেছেন। কাফেরদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রাখা ও তাদের দ্বীনে সম্মতি জ্ঞাপন বিষয়ক যে নীতিমালা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, তা আল-কোরানের এ বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করে। গ-আল্লাহ তাআলা বলেন, بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا . الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا ‘মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে, নিশ্চয় তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। যারা মুমিনদের পরিবর্তে কাফিরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কি তাদের কাছে সম্মান চায়? অথচ যাবতীয় সম্মান আল্লাহর’-(সূরা আন্-নিসা, ১৩৮-১৩৯)। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, এমন কোনো মুমিন থাকতে পারে না, যে কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, যদি করে তবে সে কাফের, মুমিন নয়। আল্লাহ তাআলা যদি ইসলামদ্রোহী কাফের পিতা, ভাই, ও স্বগোত্রের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বে জড়িত ব্যক্তির ঈমানকে নাকচ করে দেন, তাহলে দূরবর্তী কাফেরদের সঙ্গে এরূপ সম্পর্কে জড়িত ব্যক্তির ঈমান নাকচ হওয়ার ব্যাপারে আদৌ সন্দেহ থাকতে পারে না। ঘ-আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ . ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ. فَكَيْفَ إِذَا تَوَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ. ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ ‘নিশ্চয় যারা হিদায়েতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পৃষ্ঠপ্রদর্শনপূর্বক মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তাদের কাজকে চমৎকৃত করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দিয়ে থাকে। এটি এ জন্য যে, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা তারা অপছন্দ করে। তাদের উদ্দেশে, তারা বলে, ‘অচিরেই আমরা কতিপয় বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করব’। আল্লাহ তাদের গোপনীয়তা সম্পর্কে অবহিত রয়েছেন’-(সূরা মুহাম্মাদ, ২৫-২৬)। এ আয়াতে আল্লাহ তালা যাদের মুরতাদ হওয়ার ঘোষণা করেছেন, তাদের মুরতাদ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাদের এ কথা যে, ‘অচিরেই আমরা কতিপয় বিষয়ে তোমাদের আনুগত্য করব’। অতএব এরূপ কথা যে বলল এবং কিছু বিষয়ে কাফেরদের আনুগত্যের ওয়াদা দিল, হিদায়েত ও সত্য ধারণ করে থাকার দাবি সত্ত্বেও তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল। ঙ-আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آَيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ ‘আর তিনি তো কিতাবে তোমাদের প্রতি নাজিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে এবং সেগুলো নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে, তাহলে তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় নিবিষ্ট হয়, তা না হলে তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ মুনাফেক ও কাফেরদের সকলকে জাহান্নামে একত্রকারী।’-(সূরা আন্-নিসা, ১৪০)। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন, মুমিনরা যখন শোনে- আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে, তখন তারা তাদের সঙ্গে বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় নিবিষ্ট হয়। আর যদি বসে, তাহলে তারা তাদের মতোই হয়ে যাবে। অতএব একজন মুমিনকে এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে, যেসব মজলিসে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করার কার্যক্রম চলে, আল্লাহর আয়াতসমূহ উপহাসের লক্ষবস্ত্ত বানানো হয়, সে সব মজলিসে একজন মুমিন কখনো বসবে না, যতক্ষণ না তারা অন্য প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় নিবিষ্ট হয়। মূল : ড. মুহাম্মাদ নাঈম ইয়াসিন বাংলা অনুবাদ : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক
৪১ মিনিট আগে