ছবি সংগৃহীত

কিতাবুল ইমান : প্রবন্ধ নং- ৩২ : কেয়ামতের আলামত

priyo.Islam
লেখক
প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০১৪, ০২:৪৪
আপডেট: ০৩ মার্চ ২০১৪, ০২:৪৪

কেয়ামতের আলামত

আমাদের এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে কেয়ামতের আগমন অনিবার্য, নিঃসন্দেহ। আর কেয়ামত কবে হবে, তা আল্লাহ ছাড়া অন্যকেউ জানে না। আল্লাহ তাআলা বিষয়টি সকল মানুষ থেকে গোপন রেখেছেন। এমনকি নবি-রাসুলগণ থেকেও। পৃথিবীর জীবন কতকাল প্রলম্বিত হবে, এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা মানুষের সাধ্যের বাইরে। আল্লাহ তাআলা বলেন, يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً يَسْأَلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللَّهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ ‘তারা তোমাকে কেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে’? তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট। তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমানসমূহ ও জমিনের ওপর তা (কেয়ামত) কঠিন হবে। তা তোমাদের নিকট হঠাৎ এসে পড়বে। তারা তোমাকে প্রশ্ন করছে যেন তুমি এ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত। বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট আছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’ - (সূরা আল আরাফ , ১৮৭)। তবে কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন, তাতে আমাদের ঈমান আনতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেয়ামতের দু’ধরনের আলামত বয়ান করেছেন। প্রথম ধরনের আলামত হলো ছোট আলামত যার অধিকাংশই শেষ জামানায় মানুষের নীতিনৈতিকতা নষ্ট হয়ে যাওয়া, নানা ধরনের ফেতনা প্রকাশ পাওয়া, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া ইত্যাদিকে ঘিরে আবর্তিত। আর দ্বিতীয় ধরনের আলামত হলো বড় আলামত। ছোট আলামতগুলো বেশ কিছু সহিহ হাদিসে উল্লিখিত হয়েছে। যেমন, ক- বুখারি ও মুসলিমে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি প্রেরিত হয়েছি এবং কেয়ামত এ দুটির মতো’ এই বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন। [বুখারি, মুসলিম ও তিরমিযি] এ হাদিস থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরিত হওয়া- নবুওত ও রিসালতের সমাপ্তি ঘটা এবং কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার আলামত। হাদিস থেকে এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর কেয়ামত পর্যন্ত অন্যকোনো নবি আসবে না। বরং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেরণের পর যা বাকি থাকবে তা হলো কেয়ামত আসা। অতএব এ হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সংবাদ দিয়ে দিয়েছেন। [সাইয়েদ সাবেক, আল আকায়েদ আল ইসলামীয়্যাহ পৃ. ২৪৫; ফাতহুল বারী ১১/২৯৩] খ-হাদিসে জিবরিলে রয়েছে, জিবরিল আলাইহিস সালাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন। উত্তরে তিনি বলেছেন,‘যাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে প্রশ্নকারীর চেয়ে অধিক জানে না। জিবরিল আলাইহিস সালাম বললেন,‘তা হলে আমাকে তার আলামত সম্পর্কে বলুন? উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘দাসী তার প্রভুকে জন্ম দেবে। [এ কথার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে হাজার র. বলেছেন,‘অর্থাৎ সন্তানদের দ্বারা মাতা-পিতাকে কষ্ট দেয়া বেড়ে যাবে। অতঃপর সন্তান তার মায়ের সঙ্গে - গালাগাল, তাচ্ছিল্য, মারধর, কাজে খাটানো ইত্যাদির ক্ষেত্রে দাসীর সঙ্গে মনিবের আচরণের ন্যায় আচরণ করবে। অথবা হাদিসে যে ‘রব’ শব্দটি এসেছে (أن تلد الأمة ربتها ) এখানে রব শব্দটির অর্থ অভিভাবক। [অর্থাৎ মা তার সন্তানের ওপর অভিভাবকত্ব হারিয়ে ফেলবে, এর উল্টো বরং সন্তানই মায়ের অভিভাবক বনে যাবে] খোলাসা কথা হলো, সব কিছু যখন উলটপালট হয়ে যাবে- অভিভাবক পোষ্য বনে যাবে, নিচু ব্যক্তি উঁচু হয়ে যাবে, তখন মনে করতে হবে যে কেয়ামত সন্নিকটে। আর এ ব্যাখ্যাটি অন্য-একটি আলামতের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ। অর্থাৎ নগ্নপদ ব্যক্তিরা পৃথিবীর রাজা-বাদশা হয়ে যাবে। দেখুন: ফাতহুল বারী : ১/] আর দরিদ্র-নগ্নপদ বকরীর রাখালদের দেখবে উঁচু বিল্ডিং নির্মাণে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। [বুখারি ও মুসলিম- এখানে বকরীর রাখালদের উঁচু উঁচু বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী বলেছেন যে, এর অর্থ হলো- অবস্থা এমনভাবে পাল্টে যাওয়া যে, মরুবাসী বেদুঈনরা নেতৃত্বে চলে আসবে। তারা জবরদস্তিমূলক বিভিন্ন দেশের কর্তা বনে যাবে। অতঃপর তাদের সম্পদ বেড়ে যাবে। আর সেসময় তাদের গুরুত্বের বিষয় হবে বিল্ডিং নির্মাণ করা এবং এ ক্ষেত্রে পরস্পরে প্রতিযোগিতা করা। আমরা আমাদের যুগেই এ অবস্থা দেখেছি।- ইমাম ইবনে হাজার ইমাম কুরতুবী থেকে এ ব্যাখ্যাটি উল্লেখ করেছেন। দেখুন: ফাতহুল বারী ১/১০১।] গ-সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা (রাযি.) এর বর্ণনায় এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘কেয়ামত ঘটবে না, যতক্ষণ না দুটি বিশাল দল পরস্পরে যুদ্ধ করবে, [এর দ্বারা উদ্দেশ্য আলী রাযি. ও তাঁর দল এবং মাআবিয়া রাযি. ও তাঁর দল। দেখুন: ফাতহুল বারী ১২/৭২ ] এদের মধ্যে প্রচুর হতাহত হবে তবে উভয় দলের আহবান হবে অভিন্ন; যতক্ষণ না ত্রিশের কাছাকাছি মিথ্যাবাদী দাজ্জাল প্রকাশ পাবে, যাদের প্রত্যেকেই দাবি করবে যে, সে আল্লাহর রাসুল [যেমন, সানআ এলাকার আল আসওয়াদ আল আনাসী, ইয়ামামা এলাকার মুসায়লামাতুল কাযযাব। আরও যারা নবুওত দাবি করেছিল তাদের মধ্যে হলো তুলাইহা ইবনে খুআইলিদ এবং সাজাহ। শেষোক্ত এই দু’জন তাদের দাবি থেকে ফিরে এসেছিল। আর শেষযুগের নবুওত দাবিদারদের মধ্যে হলো কাদিয়ানী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাহাই মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা। দেখুন: ফাতহুল বারী ১২/৭৩; আল আকায়েদ আল ইসলামীয়্যাহ পৃ.২৪৬] ; যতক্ষণ না ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে, [অর্থাৎ দ্বীনের আলেম ও দাঈদের উঠিয়ে নেয়া হবে। ] অধিক হারে ভূমিকম্প হবে, কাল নিকটবর্তী হবে, [অর্থাৎ সব কিছু থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়া হবে। এমনকি কাল ও সময়ের বরকতও উঠিয়ে নেয়া হবে। আর তখন বরকত ও উপকৃত হওয়ার বিচারে এক বছর হবে এক মাসের সমান। এক মাস হবে এক সপ্তাহের সমান। এক সপ্তাহ হবে এক দিনের সমান। এক দিন হবে এক ঘন্টার সমান। দেখুন: ফাতহুল বারী ১৩/১২] ফেতনা প্রকাশ পাবে, হত্যা বেড়ে যাবে, তোমাদের মাঝে সম্পদ বেড়ে গিয়ে তা উপচে পড়বে, এমনকি সম্পদশালী ব্যক্তি এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাবে যে, তার সদকা কে গ্রহণ করে? সে তার সদকা পেশ করবে, অতঃপর যার সামনে তা পেশ করবে, সে বলবে, এতে আমার প্রয়োজন নেই; যতক্ষণ না উঁচু বিল্ডিং তৈরির ক্ষেত্রে মানুষ প্রতিযোগিতা করবে, যতক্ষণ না একব্যক্তি অন্যব্যক্তির কবরের পাশ দিয়ে যাবে এবং বলবে, আমি যদি এই কবরবাসীর জায়গায় হতাম!; যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম আকাশ থেকে উদিত হবে। [এ আলামতটি হলো কেয়ামতের বড় আলামত। আর বাকি আলামতগুলো হলো ছোট আলামত। ] আর মানুষ যখন তা দেখবে, তখন সবাই ঈমান আনবে। আর এটাই হবে সে সময় যখনকার ঈমান ব্যক্তির কোনো উপকারে আসবে না, যদি না সে ইতোপূর্বে ঈমান এনে থাকে অথবা তার ঈমানে কল্যাণ অর্জন করে থাকে। কেয়ামত অবশ্যই ঘটবে, আর তখন অবস্থা এমন হবে যে, দু’ব্যক্তি তাদের মাঝে ক্রয়-বিক্রয়ের কাপড় ছড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা না ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করবে, না তা ভাঁজ করে রাখবে। কেয়ামত অবশ্যই ঘটবে, আর তখন অবস্থা এমন হবে যে, একব্যক্তি দোহন করা দুধ নিয়ে আসবে, কিন্তু সে তা খাবে না। কেয়ামত অবশ্যই ঘটবে, আর তখন অবস্থা এমন হবে যে, একব্যক্তি তার পানির হাউজকে সংস্কার করছে, কিন্তু সে তা থেকে পানি পান করবে না। কেয়ামত অবশ্যই ঘটবে, আর তখন অবস্থা এমন হবে যে, এক ব্যক্তি খাবারের লোকমা তার মুখের কাছে নিয়েছে, কিন্তু সে তা খাবে না।’ [বুখারি, আস-সহিহ (ফাতহুল বারীসহ) ১৩/৭০-৭৬] ঘ- আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে কয়েকটি হলো এই যে, ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে, মূর্খতা প্রকাশ পাবে, ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়বে, মদ পান করা হবে, নারী বেড়ে যাবে, পুরুষ কমে যাবে- এমনকি একজন পুরুষ পঞ্চাশ জন নারীর অভিভাবক হবে। ঙ - আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, কেয়ামত কবে হবে? তিনি বললেন,‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।’ লোকটি প্রশ্ন করে বলল, আমানত কীভাবে নষ্ট করা হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘যখন অযোগ্যকে দায়িত্ব দেয়া হবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো। চ - আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যতদিন না মুসলমানরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, ততদিন কেয়ামত কায়েম হবে না। মুসলমানরা তাদের হত্যা করবে। পরিশেষে ইহুদিরা পাথর ও গাছের পেছনে আত্মগোপন করবে। অতঃপর পাথর ও গাছ বলবে, হে মুসলিম, হে আল্লাহর বান্দা, এই তো ইহুদি আমার পেছনে। এসো তাকে হত্যা করো। তবে ফারকাদ গাছ ছাড়া; কেননা তা ইহুদিদের গাছ।’ [মুসলিম, আস-সহিহ ( নববীর ব্যাখ্যাসহ) ১৮/৪৪] এ ছাড়াও সহিহ হাদিসে কেয়ামতের আরও অন্যান্য ছোট-ছোট আলামতের কথা উল্লেখ রয়েছে, যা কেয়ামতের পূর্বে প্রকাশ পাবে। এ বিষয়ে আরও পড়াশোনার জন্য হাদিস গ্রন্থসমূহের ফেতনা ও কেয়ামতের আলামত অধ্যায় দেখা যেতে পারে। মূল : ড. মুহাম্মাদ নাঈম ইয়াসিন বাংলা অনুবাদ : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক