ছবি সংগৃহীত
আশারায়ে মুবাশশিরিন-৫ : হজরত জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)
আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৭:১৬
প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে হজরত জুবাইর (রা.) অন্যতম। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রথম পর্বে যাঁরা ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাঁদের সবার মতো হজরত জুবাইর (রা.)ও কাফির ও মুশরিকদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। তাঁর চাচা তাঁকে ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত করতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। অবশেষে দ্বীন ও ঈমান রক্ষার তাগিদে জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে তিনি হাবশায় হিজরত করেন। হাবশায় কিছুকাল অবস্থানের পর তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর তিনিও মদিনায় হিজরত করেন। মক্কায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত জুবাইর (রা.) ও তালহা (রা.)-এর মধ্যে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দিয়েছিলেন। হজরত জুবাইর (রা.) অল্প বয়সে ইসলাম গ্রহণ করলেও ইসলামের জন্য নিজ জীবনকে বাজি রাখতে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। একদিন খোদার দুশমনদের কেউ রটিয়ে দিল, হজরত মোহাম্মদকে (সা.) হত্যা অথবা বন্দি করা হয়েছে। খবর শোনামাত্র রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসায় বিদগ্ধ তাঁর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়ল। তিনি কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে ছুটে চললেন। মানুষের ভিড় ঠেলে তিনি রাসুলের দরবারে উপস্থিত হলেন। রাসুল (সা.) তাঁর উত্তেজিত অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে জুবাইর? তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, শুনলাম আপনি বন্দি অথবা নিহত হয়েছেন। শুনে আল্লাহর রাসুল এতই খুশি হলেন যে তিনি তাঁর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। জীবনীকারদের মতে এটাই হলো প্রথম সেই তলোয়ার, যা রাসুলের ভালোবাসায় বিগলিত হৃদয়ে আত্দোৎসর্গের বাসনায় একজন বালক কর্তৃক কোষমুক্ত হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনে হজরত জুবাইর (রা.) ছিলেন সততা ও আমানতদারির প্রতীক। হজরত উমর ফারুক (রা.) তাঁর সম্পর্কে বলতেন, 'জুবাইর হলেন দ্বীনের একটি রুকন বা স্তম্ভ।' হজরত উসমান, মিকদাদ, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মৃত্যুকালে তাঁকে অসি নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল। স্ত্রী ও সন্তানদের তিনি খুবই ভালোবাসতেন। সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই সচেতন। ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সী পুত্র আবদুল্লাহকে রণাঙ্গনে নিয়ে যান। যাতে সে যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্য অবলোকন করে বীরত্ব ও সাহসিকতার তালিম পায়। দুঃসাহসী যোদ্ধা হলেও হজরত জুবাইরের হৃদয় ছিল অত্যন্ত কোমল। রাসুলে করিম (সা.)-এর জীবদ্দশায় হজরত জুবাইর (রা.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের আঞ্জাম দিয়েছেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় নারীদের অবস্থানের জন্য একটি বিশেষ এলাকা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। আর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন হজরত জুবাইর। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও মুসলমানরা মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি গ্রহণকালে হজরত হাতিব ইবনে আবি বালতায়া অভিযান প্রস্তুতির বিষয়ে বিস্তারিত লিখে মক্কাবাসীর উদ্দেশে একজন মহিলাকে প্রেরণ করেন। ওহি মারফত বিষয়টি জ্ঞাত হয়ে রাসুল (সা.) চিঠিসহ ওই মহিলাকে গ্রেপ্তারের জন্য যে দলটিকে প্রেরণ করেছিলেন হজরত জুবাইর ছিলেন তাঁদেরই একজন। মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম বাহিনীকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েকটি দলে ভাগ করে অভিযান পরিচালনা করেন। রাসুল (সা.) নিজে যে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হজরত জুবাইর (রা.) ছিলেন সে দলের পতাকাবাহী। হজরত জুবাইর (রা.)-এর জীবনের গুণাবলিকে ছাপিয়ে তাঁর সীমাহীন সাহস, রণনিপুণতা ও যোদ্ধাসত্তা সবচেয়ে বেশি ঔজ্জ্বল্য লাভ করেছে ইতিহাসের পাতায়। বদর, অহুদসহ রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে প্রায় সব যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। বদরের ময়দানে তাঁর সীমাহীন বীরত্ব ও রণকৌশল কোরাইশদের সুদৃঢ় বূ্যহ ছত্রখান করে দিয়েছিল। সেদিন উবাইদা ইবনে সাঈদ আপাদমস্তক বর্মাচ্ছাদিত হয়ে রণাঙ্গনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ছিল। তাঁর পুরো শরীরের মাত্র দুটি চোখই দেখা যাচ্ছিল। হজরত জুবাইর তাঁর মুখোমুখি হন। তিনি তাঁর চোখ নিশানা করে তীর ছুড়লেন। অব্যর্থ হাতে নিক্ষিত তীর বিদ্ধ হয়ে রাসুলের দুশমন উবাইদা নিহত হলো। তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসলিম সাম্রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। মুসলমানদের পারস্পরিক বিশ্বাস বিদূরিত হয়ে যখন অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ প্রকাশ্য রূপ নেয়, তখন হজরত জুবাইর (রা.) অবসর জীবন বেছে নেন। রাষ্ট্রীয় যাবতীয় দায়িত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেন। তখন তার শরীরে বার্ধক্যের ছাপও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সে কারণেও নিরিবিলি জীবন তার কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হজরত আলীর শাসনামলে যখন সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্য পারস্পরিক দ্বন্দ্ব আর সংঘাতে অগি্নগর্ভ হয়ে উঠল, ইসলামের মহান আদর্শে যাঁরা পুরো পৃথিবীতে নির্মল শান্তির স্বর্গীয় আদল তৈরি করেছিলেন, সেই মুসলমানগণ যখন ভ্রাতৃঘাতীরূপে আবির্ভূত হলো, আত্দঘাতী যুদ্ধ যখন সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছিল_তখন হজরত জুবাইর আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বার্ধক্যে শারীরিক দুর্বলতার কথাও তিনি ভুলে গেলেন। ইসলামী জীবনে প্রথম পর্বে স্থাপিত দ্বীনি ভ্রাতৃ সম্পর্কের সূত্র ধরে হজরত তালহা (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি মক্কায় রাসুলে করিম (সা.)-এর প্রিয়তমা সহধর্মিণী উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সঙ্গে মিলিত হলেন। তাঁরা উসমান হত্যাকারীদের বিচার দ্রুত নিষ্পন্ন করাকে সময়ের সবচেয়ে বড় করণীয় বলে স্থির করলেন। তাঁরা এতদুদ্দেশ্যে বসরার দিকে যাত্রা করলেন। বিপুলসংখ্যক সাধারণ মুসলমানও তাঁদের অনুগামী হলেন। সংবাদ পেয়ে হজরত আলী (রা.) তাঁদের গতিরোধ করতে সেনাবাহিনীসহ অগ্রসর হন। ৩৬ হিজরির ১০ জমাদিউস সানি, ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বসরার অনতিদূরে জিকার নামক স্থানে দুই মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হলো। এই প্রথম দুটি মুসলিম বাহিনী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের চূড়ান্ত পর্যায়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রোশে ফুঁসছিল। পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি আর স্বার্থান্বেষী, কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে সংঘর্ষ অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। উভয় বাহিনী যখন চূড়ান্ত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখনও আপস মীমাংসার শেষ চেষ্টা চলছিল দূত মারফত। এরই এক ফাঁকে হজরত আলী (রা.) একাকী ঘোড়ায় চড়ে রণক্ষেত্রের মাঝে এসে আহ্বান করলেন_হজরত যুবাইর (রা.)-কে। বললেন, জুবাইর তোমার কি সেদিনটির কথা মনে পড়ে না, যেদিন আমি আর তুমি হাত ধরাধরি করে রাসুলের (সা.) সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাসুল (সা.) তোমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, জুবাইর তুমি কি আলীকে ভালোবাস? বলেছিলে : হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ। তখন রাসুল (সা.) তোমাকে বলেছিলেন, তুমি একদিন অন্যায়ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তোমার কি সেদিনটির কথা স্মরণ হয় না। হজরত জুবাইর বললেন, হ্যাঁ, এখন স্মরণ হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে জুবাইর (রা.)-এ সব আক্রোশ কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। তিনি তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং হজরত আয়েশা (রা.)-কে বললেন, আলী আজ আমাকে রাসুলের একটি বাণী শুনিয়েছে। এ অন্যায় যুদ্ধে আমি আর অংশ নিতে পারি না। তিনি একাকী বসরার দিকে রওনা হলেন। আমর ইবনে জারমুখ অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হন। দুজন একসঙ্গে চলছিলেন। বসরা থেকে সামান্য দূরত্বে জোহরের নামাজের ওয়াক্ত হলে হজরত জুবাইর (রা.) থামলেন। ইবনে জুরাইজ বললেন, আমিও আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করব। দুজন নামাজে দাঁড়ালেন। হজরত জুবাইর (রা.) মহান রবের দরবারে সেজদাবনত, বিশ্বাসঘাতক ইবনে জুরাইজ তখন তরবারির এক আঘাতে রাসুলের হাওয়ারির দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিল। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। শাহাদাতকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ পেশ ইমাম ও খতিব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ