২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। পাসের হার নিয়ে দেশ জুড়ে আলোচনা চলছে৷ সেই আলোচনায় বারবার ফিরে আসছে ২০-২২ বছর আগের ফলাফল। পরিসংখ্যানগত পার্থক্য বোঝানোর জন্য আসতেই পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে একটি সবিশেষ টীকা দেওয়া প্রয়োজন।
সাধারণত বলা হয় যে মিথ্যা তিন প্রকার। এক, মিথ্যা; দুই, ডাহা মিথ্যা এবং তিন, পরিসংখ্যান। এ কারণেই শুধু পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে দুটি ভিন্ন সময়ের মান যাচাই করতে যাওয়াটা বেশ বিভ্রান্তিকর। পরিসংখ্যান কখনই নম্বরের কচকচানি ব্যতীত বাকি যতসব সম্ভাব্য পরিস্থিতি থাকতে পারে, সেগুলোকে বিবেচনায় রাখে না—এটাই পরিসংখ্যানের প্রধান সীমাবদ্ধতা।
সেজন্যই পরিসংখ্যান দিয়ে যারা ২০-২২ বছর আগের পরিস্থিতি মাপতে চাইবেন, তাদের বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে লেখাটা এভাবে শুরু করতে হলো। আমার আপত্তি বা বলার জায়গাটা হলো, আজ থেকে দুই দশক বা সিঁকি শতাব্দী আগে বাংলাদেশে যে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ছিল, তা আজকের সঙ্গে কোনোভাবেই তুল্য নয়।
২.
আর্থসামাজিক পরিস্থিতিকে যদিবা দূরেও রাখি (রাখা যদিও মুশকিল), তবুও শুধু শিক্ষাসহায়ক সূচকগুলো বিবেচনা নিলে আজকের বাংলাদেশ তখনকার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। একটি মাত্র উদাহরণ বলি: দুই যুগ আগে এদেশে এক শিক্ষাস্তর থেকে আরেকটিতে উত্তরণের পথে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত, তা বহু বছর হলো আর সে জায়গায় নেই।
কোভিড-১৯-এর প্রভাবে ঝরে পড়ার এমন কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছিল। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল, বিশেষত মেয়েদের সংখ্যায় বেশ ভালো পরিবর্তন ঘটেছিল। কিন্তু এরপর আবারও বাংলাদেশে স্তরান্তরের পরিণতি হিসেবে ঝরে পড়ার প্রবণতা কমেছে। পরিসংখ্যানের ভারে ভারাক্রান্ত হতে চাইছি না বলে তথ্যগুলো এড়িয়ে গেলাম। তবে, যেকোনো তথ্য বাতায়নে খোঁজ নিলেই আপনি এগুলো যাচাই করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, যে সময়ের কথা আমরা বলছি, সে সময়টা ছিল তৃতীয় বিএনপি তথা বেগম খালেদা জিয়া সরকারের শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাল। আজকের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তখনকার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তাকে নিয়ে মন্ত্রী হিসেবে যত 'মিথ' প্রচলিত আছে, সেগুলো তার সে সময়েরই অর্জন। বলা ভালো সে সময়ের সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার অর্জন এই মিথগুলো। যে প্রজন্ম সেসব চাক্ষুষ করেছে, তাদের জন্য এগুলো মোটেও মিথ নয়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
কেমন ছিল সে অভিজ্ঞতা? অভিজ্ঞতা হলো, সে সময়েই দেশে প্রথমবার এসেছিল জিপিএ পদ্ধতির ফলাফল এবং এই পদ্ধতি আদতে কীভাবে কাজ করত তা নিয়ে সবার মধ্যেই একটা সংশয় এবং ততোধিক আতঙ্ক বিরাজ করত। অন্তত ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তারা খুব ভালো করে জানেন কী তুমুল ঝড় বয়ে গেছে তাদের জীবনে। না শিক্ষার্থীরা জানতেন ফল কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, না শিক্ষকরাও পরিষ্কার ধারণা করতে পেরেছিলেন কী হচ্ছিল। এই পাঁচ বছরে ফি-বছর যেভাবে জিপিএর মানদণ্ড পরিবর্তন করা হয়েছিল, তার দৃষ্টান্ত বোধকরি বাংলাদেশে আগে ও পরে আর কখনো সৃষ্টি হয়নি। শুধু এটা নিয়েই একটা আলাদা লেখা দাবি করে। ঘটনাচক্রে আমি সেই প্রজন্মেরই প্রতিনিধি!
তৃতীয়ত, শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) ও পাঠ্যক্রম (সিলেবাস) পরিবর্তন ছিল আরেকটি বিষয়। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে আর শিক্ষাক্রম-পাঠ্যক্রমের ওপর তার প্রভাব পড়েনি, তা বোধহয় কোনো সরকারের চরম মিত্রও বিশ্বাস করবেন না৷ ফলে, প্রত্যেক প্রজন্মকেই এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলি, ২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষে অর্থাৎ ২০০৪ সালে যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাদের ইংরেজি বই হুট করেই বদলে গিয়েছিল, বদলে গিয়েছিল প্রশ্নের ধরণও। শিক্ষার্থীরা যদি ছিলেন কুয়াশাচ্ছন্ন তো শিক্ষকরা বোধহয় ছিলেন মেঘাচ্ছন্ন। আর পরীক্ষকদের অবস্থা তো তথৈবচ হয়েছিল বলেই মনে হয়! ইংরেজির মতো বিষয়ের আমূল পরিবর্তন ফলাফলের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা কি চোখ বন্ধ করে একবার ভাবতে পারছেন?
চতুর্থত, তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর হেলিকপ্টার যোগে নকলাভিযান। সেই অভিযান কতটা ফলদায়ী ছিল তা আজ বলতে পারি না। কিন্তু এটাই এতো বছর পর মিথ হিসেবে ফিরে এসেছে—পড়ালেখা না করলে আর রেহাই নেই! সত্য যে, বাংলাদেশকে নকলমুক্ত করার যে অঙ্গীকার অন্তত তৎকালীন সরকারের তরফে ছিল, তাতে তারা বেশ সফল হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশে নকলের প্রভাব আসলেই কমে গিয়েছিল। কিন্তু, এতো বছর পর এ প্রশ্নটিও মনে উঁকি দেয় যে, আদতে যেসব শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থীর জন্য পড়ালেখা বা ফলাফলটা কখনোই নকল-নির্ভর নয়, তাদের জন্য পরীক্ষার হলে একজন মন্ত্রীর ওই ধরনের অভিযান কতটা ট্রমা তৈরি করেছিল?
আতঙ্ক তৈরি করে মন্দদের বিরত রাখা যায় অবশ্যই। কিন্তু আগাগোড়া যারা ভালো, তাদের জন্য সেই আতঙ্ক কতটা ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে, সেটাও আমলে আনার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ সত্যই নকলরোধের দুই যুগোধিক পূর্বের বাস্তবতায় আছে কি না, সেটা ভেবে দেখা জরুরি। এ বাবদ কথা হলো এই যে, বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করেই পরীক্ষায় বসেন—এ বাস্তবতাকে আমাদের স্মরণে রাখতে হবে।