ব্যর্থতায় শিশুমৃত্যু, দায় কার!
হামে শিশু মারা যাচ্ছে। ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য শিশু। মৃত্যুর কারণ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই-প্রতিরোধযোগ্য সংকটে মৃত্যু থেকে শিশুকে বাঁচানো যাচ্ছে না কেন? এই প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর দায় কি কেউ নেবে, নাকি প্রত্যেকটি মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে পরবর্তী মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করবে রাষ্ট্র?
শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অথচ সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, সিদ্ধান্তে বিলম্ব কিংবা নিষ্ক্রিয়তার মূল্য দিচ্ছে শিশুরা নিজেদের জীবন দিয়ে। এই মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যা আড়ালে পড়ে যাবে। দেখতে হবে, কোথায় প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে, সেই ব্যর্থতা কেন ঘটছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কিনা।
নীতিগত অবহেলা ও শিশুদের অগ্রাধিকারহীনতা
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিশুরা সর্বদা অগ্রাধিকার তালিকার নিচে থাকে। শিশুরা ভোট দেয় না। তারা সম্পত্তির মালিক নয়, তাদের রাজনৈতিক প্রভাব নেই, নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত চাপ তৈরির ক্ষমতাও নেই। তাতেই রাষ্ট্রের কাছে তাদের জীবনের মূল্য কম হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক শিশুর জীবনধারণের সহজাত অধিকার এবং তার বেঁচে থাকা ও বিকাশ নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। ২৪ অনুচ্ছেদে সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য স্বাস্থ্যমান ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। বাংলাদেশ এই সনদের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। (সূত্র: UNICEF, Convention on the Rights of the Child, অনুচ্ছেদ ৬ ও ২৪)
শিশুর জীবন রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটা মৌলিক অধিকার। অথচ নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে শিশুরা বারবার মৃত্যুর মুখে পড়ছে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান ব্যবস্থার ব্যর্থতা
২০২৬ সালে হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ১৬৬টি সন্দেহভাজন হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। (সূত্র: WHO, Measles- Bangladesh, ২৩ এপ্রিল ২০২৬)
পরিস্থিতি পরবর্তী সময়েও একইরকম ভয়াবহ থেকেছে। প্রথম আলোর ১৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৭৭-তে পৌঁছেছে। (সূত্র: প্রথম আলো, ‘শিশুদের হামের টিকাদানে ব্যর্থতা, দুর্বলতা কোথায়’, ১৫ অক্টোবর ২০২৬)
হাম প্রতিরোধের কার্যকর টিকা আছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও আছে। তারপরও এত শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হলো কীভাবে? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে প্রয়োজন ছিল ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডোজ হাম-রুবেলার টিকা। কেনা হয়েছিল মাত্র ২ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার ডোজ। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ৪২ শতাংশ কম টিকা কেনা হয়েছিল। যৌথ স্বাধীন মূল্যায়নে আরও উঠে এসেছে, নিয়মিত টিকাদানে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু বাদ পড়ে যাচ্ছে। (সূত্র: প্রথম আলো, ‘গাফিলতিতে বেড়েছে হাম, কার দায় কতটা’; ‘শিশুদের হামের টিকাদানে ব্যর্থতা, দুর্বলতা কোথায়’)
এই তথ্যগুলো শুধু টিকার ঘাটতির হিসাব নয়, এগুলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন সামনে এনেছে। টিকার প্রয়োজন জানা থাকার পরও পর্যাপ্ত টিকা কেনা হয়নি। সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিয়মিত টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে তাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না।
WHO, UNICEF, Gavi ও বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) অংশগ্রহণে পরিচালিত যৌথ স্বাধীন মূল্যায়নেও টিকার ঘাটতি, ২০২৫ সালে মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে বিলম্ব, জনবল সংকট এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত পদক্ষেপের কথা উঠে এসেছে। (সূত্র: প্রথম আলো, ১৫ অক্টোবর ২০২৬)
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- হাম রোগ