মানসিক স্বাস্থ্য: জুয়া ও মাদকে আসক্তিতে শাস্তি, নাকি শিকড়হীন চিকিৎসা

প্রথম আলো ইমদাদুল হক তালুকদার প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য যত এগোচ্ছে, মানুষের আবেগ, আচরণ আর মনের জটিল সমীকরণগুলো ততই নতুন আলোয় ধরা পড়ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ‘ডিএসএম-ফাইভ-টিআর’ কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘আইসিডি-ইলেভেন’-এর মতো আধুনিক রোগতাত্ত্বিক নির্দেশিকাগুলো মনের নানা জটিলতাকে সুনির্দিষ্ট জৈব-মনঃসামাজিক মানদণ্ডে রোগ বা ডিজঅর্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে (আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন, ২০২২; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০১৯)।


অথচ আমাদের দেশে আমরা এখনো আঁকড়ে ধরে আছি ঔপনিবেশিক যুগের কিছু সেকেলে আইন আর সামাজিক অন্ধবিশ্বাস। এর নিদারুণ পরিণতিতে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যা স্পষ্ট রোগ বা চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসংকট, আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা ও সমাজে তাকে দেগে দেওয়া হচ্ছে অপরাধ হিসেবে। ফলে সহমর্মিতাপূর্ণ চিকিৎসার বদলে জোটে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যা ব্যক্তির জীবন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম এক বিপর্যয় ডেকে আনছে।


আমাদের আইন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত সবচেয়ে প্রকটভাবে চোখে পড়ে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে। ‘ডিএসএম-ফাইভ-টিআর’ কিংবা ‘আইসিডি-ইলেভেন’ স্পষ্ট ভাষায় বলছে, আত্মহত্যার আচরণ কোনো স্বেচ্ছাচারিতা নয়; এটি গভীর মানসিক যন্ত্রণা, বিষণ্নতা কিংবা মানসিক সংকটের এক চরম বহিঃপ্রকাশ (আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন, ২০২২; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০১৯)।


অথচ বাংলাদেশে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। যে মানুষটি নিদারুণ যন্ত্রণার ভার বইতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করতে চেয়েছিলেন, তাঁকে সংকটকালীন মনঃসামাজিক সহায়তা না দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয় পুলিশি হয়রানি ও জেলহাজতের মুখে। এর ফলে পরিবারগুলো ঘটনা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় এবং ভুক্তভোগী যথাসময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন (খান, ২০০৫)।


একই অন্ধত্ব দেখা যায় মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে মাদকাসক্তি বা ‘সাবস্ট্যান্স ইউজ ডিজঅর্ডার’ মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বারবার ফিরে আসা জৈবিক ব্যাধি (ভলকো ও অন্যান্য, ২০১৬)। এটি মূলত একটি জটিল জনস্বাস্থ্য সংকট।


কিন্তু আমাদের ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সরবরাহকারীদের পাশাপাশি ব্যবহারকারীকেও কঠোর অপরাধী বানিয়ে কাঠগড়ায় তোলে। আদালতের নির্দেশে একজন মাদকাসক্ত মানুষকে যখন কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, তখন সেখানে বিজ্ঞানসম্মত ডিটক্সিফিকেশন, কার্যকর সাইকোথেরাপি কিংবা ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ পাওয়ার সুযোগ থাকে নামমাত্র।


আচরণগত আসক্তির ক্ষেত্রে বর্তমান বাংলাদেশের আরেকটি নীরব ও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো ‘প্রবলেম গ্যাম্বলিং’ বা জুয়ার প্যাথলজিক্যাল আসক্তি (আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন, ২০২২)। বিশেষ করে স্মার্টফোনে ছড়িয়ে পড়া অবৈধ অনলাইন বেটিং অ্যাপসের মাধ্যমে তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সংকট মহামারি আকার নিয়েছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কোনো সাধারণ লোভ বা নিছক আর্থিক অপরাধ নয়; বরং মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের একটি মারাত্মক বৈকল্য। আক্রান্ত ব্যক্তি সমস্ত ক্ষতি জেনেও বাজি ধরার তীব্র তাগিদ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।


কিন্তু আমাদের ১৮৬৭ সালের প্রকাশ্য জুয়া আইন বা সাম্প্রতিক সাইবার নিরাপত্তাকাঠামো এই মানসিক সমস্যাকে কেবল বেআইনি জুয়া খেলা ও সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখে। ফলে ভুক্তভোগী যখন দেনার দায়ে নিঃস্ব হয়ে অপরাধ কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তখনো রাষ্ট্র তাকে কেবল অপরাধী বানায়; অথচ তার প্রয়োজন ছিল জরুরি মনস্তাত্ত্বিক সাইকোথেরাপি।


আইনি এই অচলাবস্থার পাশাপাশি সমাজে চেপে বসে আছে গভীর সামাজিক কুসংস্কার। আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে দেখা হয় পাপ বা নৈতিক স্খলন হিসেবে, মাদকাসক্তিকে বিচার করা হয় নিছক চরিত্রহীনতা দিয়ে, আর প্রবলেম গ্যাম্বলিংয়ের মতো আচরণকে তকমা দেওয়া হয় অসৎ প্রবৃত্তি হিসেবে।


সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা অনেকেই অজ্ঞাত যে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি, মোটিভেশনাল ইন্টারভিউ কিংবা আধুনিক ফার্মাকোথেরাপির মাধ্যমে এসব সংকটের দীর্ঘস্থায়ী নিরাময় সম্ভব (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২২)। অপরাধের ভয় দেখিয়ে চিকিৎসা আটকে দেওয়ার সংস্কৃতি পরিবারগুলোকেও ঠেলে দেয় নীরবতার খাঁচায়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও