রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দূরত্ব ঘোচানো জরুরি
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট দরকারের মুহূর্তে। জাতীয় পরিচয়পত্র করতে গিয়ে একজন নাগরিক কতবার অফিসে যান, জমির কাগজের জন্য কতজনের কাছে ধরনা দেন, হাসপাতালে একটি শয্যা পেতে তাকে কারও পরিচয় ব্যবহার করতে হয় কি না, থানায় অভিযোগ জানালে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কি না, সরকারি ভাতা পেতে তাকে স্থানীয় প্রভাবশালীর দ্বারস্থ হতে হয় কি না-প্রতিদিনের এসব অভিজ্ঞতাই নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা তৈরি করে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হলো সেবা। নাগরিক কর দেন, আইন মানেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর অর্থ ও বৈধতা দেন। বিনিময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপত্তা, বিচার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা দেওয়া। আর এ নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হলেই মূলত নাগরিক আর রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়ে। রাষ্ট্রের সংবিধান বা আইন যত সুন্দরই হোক, নাগরিক যদি রাষ্ট্রীয় সেবা পেতে গিয়ে অপমান, অনিশ্চয়তা, ঘুষ, দালাল কিংবা রাজনৈতিক সুপারিশের মুখোমুখি হন, তাহলে রাষ্ট্র তার কাছে দূরের একটি ক্ষমতাকেন্দ্র হয়ে থাকে।
লি কুয়ান ইউয়ের সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লি কুয়ান ইউয়ের সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রগঠনের মূল স্তম্ভ ছিল কার্যকর সরকার, মেধাভিত্তিক প্রশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ মানবসম্পদ। তার দৃষ্টিতে উন্নয়ন মানে শুধু বড় প্রকল্প বা জিডিপি বৃদ্ধি নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের কাজ কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬০-এর দশকে সিঙ্গাপুরে আবাসন সংকট ছিল তীব্র। ১৯৬০ সালে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বাস করত। ১৯৮৫ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সরকারি আবাসনের আওতায় আসে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ সিঙ্গাপুরির নিজস্ব বাড়ির মালিক এবং প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি আবাসনে বসবাস করেন।
লি কুয়ান ইউয়ের কাছে আবাসন ছিল অর্থনৈতিক প্রকল্পের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মাধ্যম। মানুষ যখন নিজের বাড়িকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যতের অংশ হিসাবে দেখতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র আর শুধু কর আদায়কারী বা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকে না। রাষ্ট্র হয়ে ওঠে নাগরিকের প্রতিদিনকার জীবনের অংশ।
লি কুয়ান ইউয়ের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো মেরিটোক্রেসি ও দক্ষ প্রশাসন। সরকারি নিয়োগ, পদোন্নতি ও নেতৃত্ব তৈরিতে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। দক্ষ মানুষকে সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগও রাখা হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতায় সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সুযোগকে রাষ্ট্রের সক্ষমতার কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
এস্তোনিয়ার উদাহরণ এখানে আরও প্রাসঙ্গিক। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সেবার ১০০ শতাংশ অনলাইনে পাওয়া যায়। ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন নাগরিককে বারবার সরকারি দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী এতে বছরে গড়ে পাঁচ কর্মদিবস সময় সাশ্রয় হয়।